
বাচ্চা একগুঁয়ে, জেদি, অহংকারী হয়ে উঠছে, কী করণীয়?
শেষ আপডেট: 10 May 2024 16:57
দ্য ওয়াল ব্যুরো: মায়ের হাত ধরে যেতে যেতেই দোকানে সারি সারি খেলনা দেখেই জেদ ধরে বসল বাচ্চা। যতক্ষণ না খেলনা হাতে পেল ততক্ষণই চিৎকার করে কান্না, শেষে রাস্তায় শুয়ে গড়াগড়ি। পরিস্থিতি সামলাতে শেষে দামি খেলনা কিনে দিয়েই হাঁফ ছাড়লেন মা।
বাচ্চা কিছুতেই পড়তে বসবে না। বকা খাওয়ার পরে গলার স্বর সপ্তমে উঠল। কচি মুখেই এমন কথা শুনিয়ে দিল যা সচরাচর বাচ্চাদের ধ্যান-ধারণায় আসে না।
রাগ, ক্ষোভ, ঈর্ষা, আত্ম অহংকার, স্বার্থপরতা, একগুঁয়েমি এখনকার প্রজন্মে বেড়ে চলেছে। কঠিন সময়ের চাপ নেওয়ার ক্ষমতাটুকুই যেন নেই। অল্পেই ভেঙে পড়া, নিজের মতামতকে জোর দেওয়া, অপরের প্রতি ঈর্ষার মনোভাব এবং আমিত্ব—এখনকার ছেলেমেয়েদের ব্যবহারে এসবের প্রতিফলনই বেশি। রাগ ও আত্ম অহংকার কিন্তু ভয়ঙ্কর পরিণতির দিকে ঠেলে দিতে পারে, যদি তা সঠিক সময় নিয়ন্ত্রণ করা না যায়। এখনকার বাচ্চাদের রাগের পারদ চড়ছে। কিছু বললেই মুখে মুখে তর্ক করে, কটূ কথা বলে, জিনিসপত্র ছুড়ে ফেলে। সবসময়েই অবাধ্য আচরণ। ব্যতিব্যস্ত হয়ে উঠেছেন বাবা-মায়েরা। কেন এখনকার বাচ্চাদের এত ইগো? কীভাবে এই সমস্যার সমাধান হবে সে নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করলেন মনোসিজের ক্লিনিকাল সাইকোলজিস্ট ডা. অপরূপা ওঝা।
কেন এত আত্ম অহং বাচ্চাদের?
মনোবিদ বলছেন, অনেকগুলো ফ্যাক্টর দায়ী। প্রথমত, পরিবেশ। মা-বাবার দেখাদেখি বাচ্চারা অনেক কিছু শিখে থাকে। তারা যদি মা-বাবাকে কারও সঙ্গে কঠোর ভাবে কথা বলতে দেখে অথবা নিজেদের মধ্যে ঝগড়া করতে দেখে তাহলে চট করে তারা সেটাই রপ্ত করে নেবে। তারপর অজান্তেই তাদের আচরণে এমন ব্যবহারের প্রতিফলন দেখা দেবে। বাইরের কারও সঙ্গে কথা বলার সময় বা পরিবারের কেউ কিছু বললেও অভব্য আচরণ করতে থাকবে। মা-বাবার মুখে মুখেও তর্ক করবে। কারণ সে এমনই ব্যবহার সবসময় দেখে থাকে তার বাবা-মা বা বয়ঃজ্যেষ্ঠদের মধ্যেও।
দ্বিতীয়ত, বাচ্চার সঙ্গে ব্যবহার। অনেক পরিবারেই বাচ্চাদের মধ্যে তুলনা টেনে কথা বলা হয়, এটা তাদের নরম মনে আঘাত করে। বড়রা অনেক সময়েই বোঝে না যে কথা কথায় তুলনা টানা বা অযথা প্রতিযোগিতার মধ্যে বাচ্চাদের ঠেলে দিলে তা তাদের আত্মবিশ্বাসকে চুরমার করে দেবে। তখন বাচ্চা হয় নিজেকে গুটিয়ে নেবে, না হয় নিজের খামতিগুলোকে ঢাকতে অ্যাগ্রেসিভ হয়ে উঠবে। চেঁচিয়ে কথা বলবে, অবাধ্য হবে, মুখে মুখে জবাব দেবে এবং স্বার্থপর হয়ে উঠবে।
তৃতীয়ত, এখনকার নিউক্লিয়ার পরিবারে বাবা-মায়েরা বাচ্চাদের সঙ্গ দিতে পারে না। আগে তাও যৌথ পরিবারে বাড়ির বড়দের কাছে বা ঠাকুমা-দাদুর কাছে বাচ্চা মানুষ হয়ে যেত। কিন্তু এখন কেয়ারগিভারদের দায়িত্বেই বাচ্চাকে রেখে নিজেদের পেশায় মন দিয়েছেন অভিভাবকরা। ফলে না বাচ্চা পারছে তাদের মনের ভাব প্রকাশ করতে, না বাবা-মায়েরা বুঝতে পারছে বাচ্চার মনের মধ্যে কী চলছে। তলে তলে কখন যে অভিমান, ক্ষোভ, একাকীত্ব বাসা বাঁধছে বাচ্চার কচি মনে তার খবর রাখছেন না বাবা-মায়েরাই। এই অভিমানই অবসাদের রূপ নিয়ে অ্যাগ্রেসিভ করে তুলছে বাচ্চাদের। বাবা-মাকে কাছে পেলেই তখন সেই না পাওয়াগুলো একত্র হয়ে প্রচণ্ড রাগ ও ক্ষোভের জন্ম দিচ্ছে। অভব্য আচরণ করছে বাচ্চা, জেদি, একগুঁয়ে হয়ে যাচ্ছে। বাচ্চা অনবরত নিজের সঙ্গে যুঝতে যুঝতে আত্ম অহংকারী হয়ে উঠছে। কিছুক্ষেত্রে এমন বাচ্চাদের ভায়োলেন্ট হয়ে যেতেও দেখা গেছে।
পেরেন্টিং সহজ নয়, বাচ্চার মন বুঝুন
বাচ্চা ‘ইগোয়িস্টিক’ হয়ে যাচ্ছে কিনা তা তার আচরণেই ধরা পড়বে। এমন অনেক ক্ষেত্রেই দেখা গেছে বাচ্চা অত্যন্ত রাগ ও জেদের বশে নিজেকে আঘাত করেছে বা অন্যকে আঘাত করার চেষ্টা করেছে। তাই খুব সাবধানে, সতর্ক হয়ে বাচ্চাকে তার এমন আচরণগত সমস্যা থেকে বের করে আনতে হবে।
ডা. অপরূপা বলছেন, বাচ্চাকে বকবেন ঠিকই কিন্তু কীভাবে বকছেন সেটা আসল। শাসন জরুরি তবে শাসনের পদ্ধতিটা গুরুত্বপূর্ণ। বাচ্চকে গালমন্দ করা, কটূ কথা বলা বা অন্যের সঙ্গে তুলনা টানা আগে বন্ধ করতে হবে। বকলেও বোঝাতে হবে তার এই আচরণ সঠিক নয়। বাচ্চার মন বুঝে তাকে বন্ধুর মতো বোঝাতে হবে। কোনটা ঠিক ও কোনটা বেঠিক, সেটা উদাহরণ দিয়ে বলে বুঝিয়ে দিতে হবে।
বাচ্চার সামনে কখনওই নিজেদের মধ্যে ঝগড়া, অশান্তি করা ঠিক নয়। অনেকেই ভাবেন বাচ্চারা কিছু বোঝে না। কিন্তু বাচ্চারা অনেক বেশি সেলসিটিভ। ছোট ছোট ব্যাপারও তারা ধরে ফেলতে পারে। তাই বাবা-মায়েরা যদি বাচ্চার সামনেই একে অপরের সঙ্গে খারাপ আচরণ করেন বা পরিবারের সদস্যদের মধ্যে ঝামেলা-অশান্তি লেগেই থাকে তাহলে তা বাচ্চার উপর প্রভাব ফেলতে বাধ্য। সেই বাচ্চাই পরবর্তীতে প্রচণ্ড অ্যাগ্রেসিভ হয়ে উঠবে।
বাচ্চার মধ্যে ছোট থেকেই আত্মবিশ্বাস (Confidence) বাড়াতে হবে। কোনও বাচ্চা পড়াশোনা ভাল, কেউ খেলাধূলায়, কেউ বা ভাল আঁকে, কেউ ভাল নাচে। যার যেটা ‘Strength’ সেটা নিয়ে উৎসাগ দিতে হবে। বাচ্চার যে যে দিকে খামতি বা দুর্বলতা, সেই দিকগুলো সামনে না এনে বরং যাতে উৎসাহ বেশি সেই দিকটা তুলে ধরতে হবে। হয়ত কোনও বাচ্চা ভাল ফুটবল খেলে, পড়ায় অত মন নেই। তাকে না বকে বোঝাতে হবে সে কত ভাল ফুটবল খেলে। ভবিষ্যতে এই দিক নিয়ে এগোতে চায় কিনা। নিজের পছন্দের দিকটাতে উন্নতি করতে হলে পড়াশোনাও যে জরুরি সেটা ভালভাবে বোঝাতে হবে।
আত্মবিশ্বাস বাড়ানোর পাশাপাশি, বাচ্চার মতামতকে গুরুত্ব দিতে হবে। পরিবারে তারও যে একটা গুরুত্বপূর্ণ জায়গা আছে সেটা বোঝাতে হবে বাবা-মাকে। অবহেলা বা তুচ্ছতাচ্ছিল্যে জেদ বাড়ে। কিন্তু উল্টোটা করলে, অর্থাৎ বাচ্চাকে স্বাধীনভাবে তার মতামত জানাতে দিলে বা কোনও বিষয়ে নিজে থেকে সিদ্ধান্ত নিতে দিলে তার আত্মবিশ্বাস বাড়বে। ধরা যাক, জামাকাপড় কিনতে গেলেন। সেখানে নিজের পছন্দ না চাপিয়ে বাচ্চাকে নিজের জামা নিজেই পছন্দ করতে দিলেন। কোন রং তার পছন্দ সেটা বেছে নিতে বললেন। তাহলে ছোট থেকেই বাচ্চা বুঝবে তারও স্বাধীন মতামত আছে, কোনও কিছু চাপিয়ে দেওয়া হচ্ছে না। এতে অন্যের প্রতি বিশ্বাস ও ভরসা দুটোই বাড়বে। কোনওদিনই অবসাদ তাকে গ্রাস করবে না।
কমবেশি সব বাচ্চারাই দুষ্টু হয়। কিন্তু চঞ্চলতার জেরে বাচ্চা যদি দুদিন ছাড়া ছাড়াই মাথা ফাটায়, হাত ভাঙে, ঘরের দামী জিনিস তছনছ করে ফেলে, সবেতেই অধৈর্য হয়ে পড়ে, একেবারেই কথা না শোনে— তাহলে ভাববার কারণ আছে বৈকি! এ ক্ষেত্রে দরকার উপযুক্ত চিকিৎসা। প্রয়োজন হতে পারে স্পেশাল এডুকেটরেরও। বাচ্চার এমন বেপরোয়া আচরণ লক্ষ্য করলে তাকে নিয়ে যান সাইকোলজিস্টের কাছে। বাচ্চার বুদ্ধি যদি স্বাভাবিকের তুলনায় কম থাকে, তাহলে মেন্টাল রিটার্ডেশন কনসালটেন্টের প্রয়োজন পড়ে। মনে রাখবেন, বাচ্চার এই অসুখ মূলত আচরণের অস্বাভাবিকতা। তাই বিহেভিরায়াল থেরাপি এ ক্ষেত্রে অবশ্যই কার্যকর।