প্রথম দিনে কেন ব্যথা বেশি হয়, তা বোঝা জরুরি, শুধু মানসিক আশ্বাসের জন্য নয়, সঠিক সময়ে সঠিক চিকিৎসা নেওয়ার জন্যও।

প্রতীকী ছবি
শেষ আপডেট: 26 February 2026 16:00
দ্য ওয়াল ব্যুরো: পিরিয়ড শুরু মানেই তীব্র পেটব্যথা, সঙ্গে কোমরব্যথা, বমিভাব, ক্লান্তি - এমনকি কারও কারও ক্ষেত্রে ডায়রিয়াও। বিশেষ করে প্রথম দিনটাই সবচেয়ে বেশি কষ্টকর বলে মনে হয়। অনেকের কাছেই 'পিরিয়ডের ফার্স্ট ডে' মানেই যেন কাজ, পড়াশোনা বা দৈনন্দিন জীবন সবই লাটে ওঠার জোগাড়। অফিস বা স্কুল-কলেজে মাঝে মাঝেই অনুপস্থিত থাকার অন্যতম প্রধান কারণও এটি (Why period pain is worse first day)।
চিকিৎসা বিজ্ঞানের ভাষায় এই অবস্থাকে বলা হয় ডিসমেনোরিয়া (dysmenorrhea)। বিশ্ব জুড়ে মহিলাদের অর্ধেকেরও বেশি এই সমস্যায় (menstrual health) ভোগেন। অনেকেই এটিকে “স্বাভাবিক” বলে মেনে নিলেও, সবসময় সেই যন্ত্রণা স্বাভাবিক নাও হতে পারে (how to know period pain is not normal)।
প্রথম দিনে কেন ব্যথা বেশি হয় (menstrual cramps causes), তা বোঝা জরুরি, শুধু মানসিক আশ্বাসের জন্য নয়, সঠিক সময়ে সঠিক চিকিৎসা নেওয়ার জন্যও। গবেষণায় দেখা যাচ্ছে, কখন থেরাপি শুরু করা হচ্ছে, এমনকি পিরিয়ড শুরু হওয়ার আগেও, তা উপসর্গ নিয়ন্ত্রণে বড় ভূমিকা রাখে।
আগে জানতে হবে কেন পিরিয়ডের প্রথম দিন ব্যথা সবচেয়ে বেশি হয় -
১) প্রোস্টাগ্ল্যান্ডিন হঠাৎ বেড়ে যায়
প্রথম দিনের তীব্র ক্র্যাম্পের প্রধান কারণ প্রোস্টাগ্ল্যান্ডিনের হঠাৎ বৃদ্ধি। যাঁদের ব্যথা বেশি হয়, তাঁদের পিরিয়ড ব্লাডে এর মাত্রাও বেশি থাকে। ফলে ইউটেরাসের কনট্র্যাকশন আরও বেশি এবং ঘন ঘন হতে থাকে।
এই কনট্র্যাকশন বা সংকোচন ইউটেরাসের আস্তরণ পিরিয়ডের মাধ্যমে বার করতে সাহায্য করলেও আশপাশের রক্তনালীগুলিকে চাপ দেয়। ফলে সাময়িক অক্সিজেনের ঘাটতি তৈরি হয়, অনেকটা শরীরের অন্য পেশির ক্র্যাম্পের মতো। সাধারণত প্রথম ২৪ ঘণ্টাতেই ব্যথা সবচেয়ে বেশি থাকে।
২) ইউটেরাসের বেশি কনট্র্যাকশনে রক্তপ্রবাহ কমে
পিরিয়ডের সময় ইউটেরাস বারবার সংকুচিত ও শিথিল হয়। সংকোচন বেশি হলে পেশিতে রক্ত সরবরাহ কমে গিয়ে প্রদাহ ও স্নায়ুজনিত ব্যথা তৈরি হয়।
হরমোনের মাত্রা কমতে শুরু করলে, সাধারণত দ্বিতীয় বা তৃতীয় দিনের পর, ব্যথা ধীরে ধীরে কমে যায়।
৩️) প্রথম দিনেই রক্তপাত বেশি শুরু হয়
পিরিয়ড শুরু হওয়ার সময় ইউটেরাসকে সবচেয়ে বেশি কাজ করতে হয়। ফলে ভেতরের চাপ বাড়ে এবং ব্যথা তীব্র হয়। পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, সাধারণত ৪৮–৭২ ঘণ্টা পর্যন্ত ব্যথা থাকে, যার সর্বোচ্চ তীব্রতা প্রথম বা দ্বিতীয় দিনে।
৪️) শরীরে প্রদাহজনিত প্রতিক্রিয়া বাড়ে
এই সময় শরীরজুড়ে প্রদাহজনিত প্রতিক্রিয়া সক্রিয় হয়। এর ফলে শুধু পেটব্যথা নয়, মাথাব্যথা, বমিভাব, ক্লান্তি, এমনকি ফ্লু-এর মতো অস্বস্তিও হতে পারে। অনেকেই প্রথম দিনে শরীর ভেঙে পড়ার অনুভূতি পান, এর পিছনে এই সিস্টেমিক প্রতিক্রিয়াই দায়ী।
কখন পিরিয়ডের ব্যথা ‘স্বাভাবিক’ নয়
মাঝারি ব্যথা সাধারণ হলেও অত্যন্ত তীব্র ব্যথা বা দৈনন্দিন কাজ ব্যাহত হলে তা অন্য সমস্যার লক্ষণ হতে পারে, যেমন -
ব্যথা যদি বারবার বাড়ে বা দীর্ঘস্থায়ী হয়, অবশ্যই চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে।
প্রথম দিনের পিরিয়ড ব্যথা কমানোর কিছু বৈজ্ঞানিক উপায়
NSAIDs জাতীয় ওষুধ (যেমন আইবুপ্রোফেন) প্রোস্টাগ্ল্যান্ডিন কমিয়ে ব্যথার মূল কারণেই কাজ করে। উপসর্গ শুরু হওয়া মাত্র বা পিরিয়ডের আগেই (অবশ্যই চিকিৎসকের পরামর্শে) নিলে ভাল ফল পাওয়া যায়।
পেটের নীচের অংশে গরম সেঁক বা হিটিং প্যাড ব্যবহার করলে পেশি শিথিল হয় এবং রক্ত চলাচল বাড়ে, ফলে ক্র্যাম্প কমে।
এই সময় বিশ্রাম নিতে ইচ্ছে করলেও হালকা হাঁটা, স্ট্রেচিং বা যোগব্যায়াম শরীরে রক্তসঞ্চালন বাড়ায় এবং এন্ডোরফিন নিঃসরণ করে, যা প্রাকৃতিক ব্যথানাশক।
হরমোনাল কন্ট্রাসেপটিভ অনেকের ক্ষেত্রে ওভ্যুলেশন কমিয়ে ইউটেরাসের আস্তরণ পাতলা রাখে, ফলে ব্যথাও কমে।
গবেষণায় দেখা যাচ্ছে, ভিটামিন ই, ওমেগা-৩ ফ্যাটি অ্যাসিড, ম্যাগনেসিয়াম ও আয়রনের সঠিক ব্যালেন্স পেশি শিথিল রাখতে এবং প্রদাহ কমাতে সাহায্য করতে পারে (অবশ্যই চিকিৎসকের পরামর্শে)।
স্ট্রেস হরমোন ব্যথার অনুভূতি বাড়ায়। পর্যাপ্ত ঘুম, শ্বাসব্যায়াম বা মেডিটেশন স্নায়ুতন্ত্রকে শান্ত রাখতে সাহায্য করে।
তবে তীব্র ব্যথা সহ্য করতেই হবে, এমন নয়। সঠিক সময়ে চিকিৎসা, জীবনযাত্রার পরিবর্তন এবং প্রয়োজন হলে চিকিৎসকের পরামর্শ - এই তিন মিলিয়ে পিরিয়ডের কষ্ট অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব।