প্রায় প্রতিদিনই বন্ধু বা প্রিয়জনকে নিয়ে গ্লাসে গ্লাসে চিয়ার্স করে ফেলেন। এতদিন ধরে যেটা 'ডাক্তারি পরামর্শ' বলে মেনে নিয়ে কাজ চালাচ্ছিলেন, সেটাই এবার পড়ল প্রশ্নের মুখে!

প্রতি রাতে সুরায় চুমুক দিচ্ছেন?
শেষ আপডেট: 17 June 2025 19:13
দ্য ওয়াল ব্যুরো: “দিনে এক-দু'পেগ মদ খেলে হার্ট ভাল থাকে”—এই বুলি শুনে অনেকেই রাতে এমনভাবে গ্লাস তুলে নেন, যেন ডাক্তার সাহেব নিজে প্রেসক্রিপশনে লিখে দিয়েছেন! আর প্রায় প্রতিদিনই বন্ধু বা প্রিয়জনকে নিয়ে গ্লাসে গ্লাসে চিয়ার্স করে ফেলেন। এতদিন ধরে যেটা 'ডাক্তারি পরামর্শ' বলে মেনে নিয়ে কাজ চালাচ্ছিলেন, সেটাই এবার পড়ল প্রশ্নের মুখে!
মানে, "Moderate drinking is good"—এই গল্পটা প্রতি রাতে সুরায় চুমুক দেওয়ার সময় আর আওড়াতে পারবেন না।
আসল ব্যাপারটা ঠিক কী? মানে নতুন গবেষণায় ঠিক কী দেখা গিয়েছে?
অনেকেই মনে করেন দিনে এক-দু’পেগ মদ খাওয়া শরীর, বিশেষ করে হার্টের জন্য ভাল। এতদিন ধরে এই ধারণাই চালু ছিল। কিন্তু নতুন এক গবেষণা বলছে— এতদিন ধরে চালু থাকা ধারণাকে পুরোপুরি বিশ্বাস করা যায় না। দিনে অল্প পরিমাণে মদ খাওয়া শরীরের কোনও বড় ক্ষতি না করলেও, সেটাকে স্বাস্থ্যের জন্য উপকারী বলা যাবে, তেমনও কোনও প্রমাণ নেই।
আমেরিকান হার্ট অ্যাসোসিয়েশনের এক বড় পর্যালোচনায় এই তথ্য সামনে এসেছে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের ১০০-র বেশি গবেষণাপত্র খতিয়ে দেখে তারা বলছে, মদ ও হার্টের সম্পর্ক অনেক বেশি জটিল, ক্ষতি না করলেও উপকার যে হবে, তা কিন্তু একেবারেই নয়।
আগের কিছু গবেষণায় দাবি করা হয়েছিল, দিনে এক বা দু’পেগ মদ খেলে হৃদরোগ ও স্ট্রোকের আশঙ্কা কিছুটা কমে। কিন্তু সাম্প্রতিক গবেষণাগুলিতে সেই ধারণা নিয়ে সন্দেহ উঠেছে। বিশেষ করে একটি অসুস্থতা—‘এট্রিয়াল ফিব্রিলেশন’ বা অনিয়মিত হৃদস্পন্দনের ক্ষেত্রে—কম মদ খাওয়ার কোনও উপকারিতার প্রমাণ মেলেনি।
রিপোর্টে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, “দিনে এক থেকে দু’পেগ মদ খাওয়ার ফলে হার্টের কতটা উপকার বা ক্ষতি হয়, তা নিয়ে এখনও নিশ্চিত কিছু বলা যাচ্ছে না।”

প্রতিদিন মদ খাওয়ার অভ্যাস আছে? খেলেও কতটা করে খান?
যেখানে অল্প মদ খাওয়া নিয়ে মতভেদ রয়েছে, সেখানে বেশি মদ খাওয়া যে শরীরের জন্য ক্ষতিকর, তা প্রমাণিত। দিনে তিন গ্লাস বা তার বেশি মদ খেলে স্ট্রোক, হার্ট ফেইলিওর-সহ নানা জটিলতা বাড়ে—এই বিষয়ে একমত সব গবেষণা।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, হার্ট সুস্থ রাখতে বরং সঠিক জীবনযাপন—যেমন নিয়মিত ব্যায়াম, ধূমপান ছাড়া থাকা এবং সঠিক ওজন বজায় রাখার দিকে মন দেওয়া উচিত।
গবেষণায় দেখা গেছে, আমেরিকার প্রায় ৮৫ শতাংশ মানুষ জীবনে কোনও না কোনও সময় মদ্যপান করেছেন। প্রত্যেকে বছরে গড়ে প্রায় ৯.৪ লিটার অ্যালকোহল খান। তবে সেই দেশের সরকারি খাদ্য নির্দেশিকা বলছে, কম পরিমাণ মদ খাওয়ায় যে তাদের শরীরে বিশাল কোনও উপকার হচ্ছে, তা নিশ্চিতভাবে বলা যায় না।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) এবং কানাডার স্বাস্থ্য গাইডলাইনেও স্পষ্ট বলা হয়েছে—‘‘একেবারেই মদ না খাওয়াই সবচেয়ে ভাল।’’
এই গবেষণায় দেখা গেছে, অতিরিক্ত মদ্যপান করলে সব ধরনের স্ট্রোকের ঝুঁকি বাড়ে। কিছু পুরনো গবেষণায় অল্প মদ খাওয়াকে স্ট্রোক প্রতিরোধে সামান্য সহায়ক বলা হলেও, নতুন গবেষণা বলছে—দিনে এক গ্লাস মদ বাড়ালেই স্ট্রোকের আশঙ্কা প্রায় ১৩ শতাংশ বেড়ে যায়।

সব সময় খালি পেটেই মদ খান?
এই বিষয়ে নির্ভুল গবেষণা করাও কঠিন। অনেক সময় মানুষ নিজের মদ খাওয়ার পরিমাণ ঠিকভাবে জানান না। কারও শরীরের গঠন, কতটা খেলেন, খাওয়ার সময় খালি পেটে ছিলেন কি না—এসব কিছুর ওপর নির্ভর করে শরীরে মদের প্রভাব কতটা পড়বে। বিশেষজ্ঞরা সাধারণত বলেন, খালি পেটে মদ খেলে, শরীরে তার ক্ষতি বেশি হয়। অর্থাৎ বহুক্ষণ আপনি কিছু খাননি। অথচ দুম করে এক পেগ মদ খেয়ে ফেললেন। কিন্তু প্রভাব অনেক বেশি পড়বে।
তাই আধুনিক গবেষণায় ব্যবহার করা হচ্ছে নানা নতুন পদ্ধতি—যেমন স্মার্টফোন ট্র্যাকিং, ইউরিন কিট, অ্যালকোহল সেন্সর ইত্যাদি।
অ্যাপোলো হাসপাতালের চিকিৎসক ড. বরুণ বংশল বলেন, “এই ধরনের গবেষণা করতে গেলে অনেক বড় তথ্যভান্ডার দরকার। শুধু মদ নয়, খাবার, শরীরচর্চা, জিনগত বিষয়—সবকিছুকে একসঙ্গে বিবেচনা করতে হয়।”

'হাঁটাচলা করতে করতে মদ খেতে হবে'
তিনি আরও বলেন, “একজন মানুষ বসে বসে মদ খাচ্ছেন, আর একজন হয়তো মদ খেয়ে হাঁটাচলা করছেন—তফাৎটা খুব গুরুত্বপূর্ণ। সাধারণত মানুষ একটা নির্দিষ্ট জায়গায় বসে আড্ডা দিতে দিতে, কখনও নিজের মনে বসে মদ খেতে পছন্দ করেন। কিন্তু গবেষণায় দেখা গেছে যদি কোনও ব্যক্তি মদের গ্লাস নিয়ে হেঁটে হেঁটে খান, তাহলে তাঁর শরীরের প্রভাব কিছুটা কম পড়বে।"
মাথায় রাখবেন, অতিরিক্ত মদ্যপান হৃদরোগ, স্ট্রোক এবং লিভারের জটিল সমস্যার ঝুঁকি বাড়ায়। সুস্থ জীবনযাপনের জন্য মদ্যপান একেবারে এড়িয়ে চলাই শ্রেয়।