থাইরয়েডের সমস্যা নীরবে শরীরের বহু অংশে প্রভাব ফেলে। তাই এই সূক্ষ্ম লক্ষণগুলি চিনে সময়মতো পরীক্ষা ও চিকিৎসা করানোই বড় বিপদ এড়ানোর একমাত্র উপায়।

শেষ আপডেট: 29 January 2026 16:45
দ্য ওয়াল ব্যুরো: আজকাল নানা বয়সি মহিলাদের মধ্যেই থাইরয়েডের সমস্যা (Thyroid Disorder) খুব বেশি 'স্বাভাবিক' হয়ে দেখা দিতে শুরু করেছে। এর জন্য আসলে দায়ী কিন্তু শরীরের বিপাকক্রিয়া বা মেটাবলিজম (metabolism)। সেখানে গোলমাল থেকেই থাইরয়েড সংক্রান্ত নানারকম সমস্যার সূত্রপাত (Thyroid disorder in women) লক্ষ্য করা যায়।
থাইরয়েড হরমোন কম তৈরি হওয়া (হাইপোথাইরয়েডিজম) বা বেশি (হাইপারথাইরয়েডিজম) - দুই ক্ষেত্রেই শরীরে স্পষ্ট শারীরিক পরিবর্তন দেখা দেয়। এই পরিবর্তনগুলি চিনতে পারা জরুরি। হঠাৎ ওজন বেড়ে যাওয়া (weight gain), শক্তি কমে যাওয়া - এগুলো প্রাথমিক লক্ষণ হলেও, আরও বেশ কিছু লক্ষণ আছে যা অনেকেই খেয়াল করেন না। বিশেষ করে মহিলাদের ক্ষেত্রে এই পরিবর্তনগুলি আলাদা ভাবে ধরা পড়ে।
জসলোক হাসপাতাল ও রিসার্চ সেন্টারের কনসালট্যান্ট এন্ডোক্রিনোলজিস্ট ও ডায়াবেটোলজিস্ট শৈবল চান্ডালিয়া ব্যাখ্যা করেছেন, মহিলাদের শরীরে থাইরয়েডের গোলমাল প্রথমে কীভাবে প্রকাশ পায় (Thyroid disorder symptoms in women)। শুরুতেই কোথায় সাবধান হতে হবে।
থাইরয়েডের ভারসাম্যহীনতা (thyroid Hormone Imbalance) মূলত দু’ধরনের - হাইপোথাইরয়েডিজম (থাইরয়েড কম কাজ করা) এবং হাইপারথাইরয়েডিজম (থাইরয়েড বেশি কাজ করা)। প্রথম ক্ষেত্রে হরমোন কম তৈরি হয়, দ্বিতীয় ক্ষেত্রে বেশি। দুই অবস্থাই শরীরের বিভিন্ন অঙ্গপ্রত্যঙ্গে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। ডা. চান্ডালিয়া বিশেষ করে হাইপোথাইরয়েডিজমের লক্ষণগুলি ব্যাখ্যা করেছেন।
১) অস্বাভাবিক ক্লান্তি ও ঠান্ডা সহ্য না হওয়া
মহিলাদের ক্ষেত্রে হাইপোথাইরয়েডিজমের প্রথম প্রভাব পড়ে অস্বাভাবিক ক্লান্তির মাধ্যমে। সঙ্গে থাকে ঠান্ডা সহ্য করতে না পারা। ডা. চান্ডালিয়ার সতর্কবার্তা, চিকিৎসা না হলে পরিস্থিতি মারাত্মক হতে পারে। “শরীরের তাপমাত্রা বিপজ্জনকভাবে কমে যেতে পারে এবং রোগী ‘মাইক্সিডিমা কোমা’ (myxedema coma) নামে পরিচিত অবস্থায় পৌঁছতে পারেন, যেখানে হাসপাতালে ভর্তি করা ছাড়া উপায় থাকে না,” বলেন তিনি।
২) পিরিয়ডের সমস্যা এমনকী বন্ধ্যাত্বও দেখা দিতে পারে
থাইরয়েডের গোলমাল সরাসরি পিরিয়ডের সাইকেলে প্রভাব ফেলে। অনিয়মিত পিরিয়ড, এমনকী বন্ধ্যাত্বের সমস্যাও অস্বাভাবিক নয়। কারণ, থাইরয়েডের ভারসাম্যহীনতা ইস্ট্রোজেনের মতো রিপ্রোডাক্টিভ বা প্রজনন হরমোনের স্বাভাবিক ভারসাম্য নষ্ট করে দেয়।
৩) স্লো পালস রেট ও উচ্চ রক্তচাপ
মহিলাদের ক্ষেত্রে একটি সহজে সমস্যা ধরা পড়ার মতো লক্ষণ হল স্লো পালস রেট বা নাড়ির গতি ধীর হয়ে যাওয়া (slow pulse rate) এবং উচ্চ রক্তচাপ। ডা. চান্ডালিয়ার মতে, থাইরয়েড হরমোনের ঘাটতি ‘reversible hypertension’ বা রিভার্স করা যেতে পারে এমন উচ্চ রক্তচাপের কারণ হতে পারে। “থাইরয়েড হরমোন দিয়ে চিকিৎসা শুরু হলে এই উচ্চ রক্তচাপ অনেক ক্ষেত্রেই স্বাভাবিক হয়ে যায়,” জানান তিনি।
৪) পেটের সমস্যা ও কোষ্ঠকাঠিন্য
অনেক সময় কোষ্ঠকাঠিন্য বা পেট পরিষ্কার না হওয়াকে শুধু অন্ত্রের সমস্যা বা আইবিএস (IBS) ভেবে নেওয়া হয়। কিন্তু থাইরয়েডের ভারসাম্যহীনতার কারণে হজমের গতি ধীর হয়ে যায়, যার প্রভাব পড়ে মলত্যাগের স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায়।
৫) ত্বক, চুলে পরিবর্তন এবং মুখে ফোলাভাব
শুষ্ক ত্বক এবং চুল পড়া খুবই সাধারণ লক্ষণ। এর পাশাপাশি পা ফুলে যাওয়া এবং মুখ ফোলা ভাবও দেখা যায়। ডা. চান্ডালিয়া ব্যাখ্যা করেন, “মাইক্সিডিমা বলতে এমন এক ধরনের ফোলা ভাব বোঝায়, যেখানে ত্বকের নীচে সংযোজক কলায় প্রোটিন বা মিউকোপলিস্যাকারাইড জমে নন-পিটিং এডিমা (non-pitting edema) তৈরি হয়, যা মুখ ও পায়ে স্পষ্ট হয়।”
৬) মানসিক স্বাস্থ্যে প্রভাব
হাইপোথাইরয়েডিজম মানসিক স্বাস্থ্যের উপরও প্রভাব ফেলে। ডিপ্রেশন, মুড সুইং, স্মৃতিশক্তি কমে যাওয়া, ঝিমুনি ভাব এবং বিভ্রান্তি - এসব লক্ষণ দেখা দিতে পারে। ডা. চান্ডালিয়ার পরামর্শ, “কোনও রোগীকে মানসিকভাবে অসুস্থ বলে চিহ্নিত করার আগে তাঁর থাইরয়েড পরীক্ষা করে নেওয়া জরুরি।”
সবশেষে তিনি একটি গুরুত্বপূর্ণ সূত্রের কথা বলেন, গলা বসে যাওয়া বা কণ্ঠস্বর ভেঙে যাওয়া (hoarseness of voice)। বহু ক্ষেত্রে এটিই থাইরয়েড সমস্যার প্রথম সংকেত হিসেবে ধরা পড়ে।
থাইরয়েডের সমস্যা নীরবে শরীরের বহু অংশে প্রভাব ফেলে। তাই এই সূক্ষ্ম লক্ষণগুলি চিনে সময়মতো পরীক্ষা ও চিকিৎসা করানোই বড় বিপদ এড়ানোর একমাত্র উপায়।