পিএমএস বা প্রি-মেনস্ট্রুয়াল সিনড্রোম সাধারণত মাসিক শুরুর এক-দুই সপ্তাহ আগে দেখা দেয়। এর সঙ্গে আসে মুড সুইং, খিটখিটে ভাব, ক্লান্তি, ফোলাভাব, স্তনে যন্ত্রণা, খিদে খিদে ভাব আর ঘুমের পরিবর্তন।

ছবি- এআই
শেষ আপডেট: 7 September 2025 14:43
দ্য ওয়াল ব্যুরো: এক মুহূর্তে সব ঠিক আছে, পরের মুহূর্তেই কারও ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ছেন রাগে, আর তার কিছু পরেই হঠাৎ কোনও কিউট কুকুরছানার ভিডিও দেখে চোখে জল। এমন অবস্থায় প্রশ্ন জাগে, এটা কি মানসিক চাপের ফল, নাকি পিএমএস?
পিএমএস (PMS) হলে মনে হয় যেন শরীর-মন নানা ধরনের মিশ্র অনুভূতির ককটেল খেল। আজকাল অনেক মহিলাই এই পরিবর্তন স্পষ্টভাবে টের পাচ্ছেন। কিন্তু বড় প্রশ্ন হল, স্ট্রেস আর ডিজিটাল জীবনযাপন (Digitally driven lifestyle) যেমন প্রজনন ও গর্ভধারণকে প্রভাবিত করছে, তা কি পিএমএসকেও (PMS) আরও কঠিন করে তুলছে?
পিএমএস কী?
পিএমএস বা প্রি-মেনস্ট্রুয়াল সিনড্রোম সাধারণত মাসিক শুরুর এক-দুই সপ্তাহ আগে দেখা দেয়। এর সঙ্গে আসে মুড সুইং, খিটখিটে ভাব, ক্লান্তি, ফোলাভাব, স্তনে যন্ত্রণা, খিদে খিদে ভাব আর ঘুমের পরিবর্তন। কিছু সময় নিয়ন্ত্রণে থাকে, আবার কখনও তা এতটাই তীব্র হয় যে দৈনন্দিন জীবনকেও ব্যাহত করে।
আগে এটিকে ‘শুধু মুডি হওয়া’ বলে এড়িয়ে যাওয়া হতো। কিন্তু সমীক্ষা বলছে, প্রজননক্ষম বয়সের প্রায় ৭৫ শতাংশ মহিলা পিএমএসের অভিজ্ঞতা পান, আর পাঁচজনের মধ্যে একজনের ক্ষেত্রে এর তীব্রতা এতটাই বেশি যে তা জীবনে সরাসরি প্রভাব ফেলে।
হরমোন আর হস্টেল কালচার
‘হস্টেল কালচার’ মানেই নিরন্তর দৌড়- কফির নেশা, রাত জাগা, ‘গ্রাইন্ড অ্যান্ড রাইজ’-এর মন্ত্র, ডেডলাইনের চাপ। এই সংস্কৃতি সবার জন্যই ক্ষতিকর, তবে মহিলাদের ক্ষেত্রে এর প্রভাব পড়ে আরও গভীরভাবে।
চিকিৎসক মুসকান ছাবড়া (ফার্টিলিটি স্পেশালিস্ট, দিল্লি) বলছেন, 'শরীর স্বাভাবিক ছন্দে চালু-বন্ধ হয় না বরং চিরকালীন ওভারড্রাইভে থেকে যায়। এতে কর্টিসল বাড়ে, যা স্নায়ুতন্ত্রে প্রভাব ফেলে, প্রদাহ তৈরি করে। এর ফলেই পিএমএস আরও তীব্র হয়।' চিকিৎসক তৃপ্তি রাহেজা (সিকে বীরলা হাসপাতাল, দিল্লি) বলেন, 'কর্টিসল বেড়ে গেলে ইস্ট্রোজেন ও প্রোজেস্টেরনের ভারসাম্য নষ্ট হয়। তাই উপসর্গ আরও স্পষ্ট হয়।'
কর্মক্ষেত্রের চাপ
চাকরিরত মহিলাদের ক্ষেত্রে পিএমএসকে অনেক সময়ই গুরুত্ব দেওয়া হয় না। চিকিৎসক সোনালি চতুর্বেদী (মনোবিজ্ঞানী, হায়দরাবাদ) বলছেন, 'একদিন ছুটি নেওয়া দুর্বলতা মনে করা হয়, আর পিএমএস নিয়ে খোলাখুলি বলা অনেকের কাছেই এখনও ট্যাবু।'
সময়ে শরীরের কথা না শুনলে পরে সমস্যা বাড়ে। হরমোনের ওঠা-নামা বাড়ে, মানসিক স্বাস্থ্যে প্রভাব পড়ে, এমনকি পিএমএস থেকে পিএমডিডি (Premenstrual Dysphoric Disorder)-তে পরিণত হওয়ার ঝুঁকি থাকে।
জীবনযাত্রার প্রভাব
স্ট্রেস ছাড়াও রাত জাগা, বসে থাকা, স্ক্রিনে দীর্ঘক্ষণ চোখ রাখা, অস্বাস্থ্যকর খাবার। সব মিলিয়েই পিএমএসকে আরও কঠিন করে তোলে। যারা পিসিওএস বা পিসিওডি-তে ভোগেন, তাদের জন্য পরিস্থিতি আরও জটিল।
প্রজননক্ষমতা
শুধু পিএমএসের কারণে প্রজননক্ষমতা কমে না। কিন্তু মানসিক চাপ ও অস্বাস্থ্যকর অভ্যাসের কারণে ডিম্বস্ফোটনে ব্যাঘাত ঘটতে পারে, যা দীর্ঘমেয়াদে সন্তানধারণে প্রভাব ফেলে।
ডা. পার্নমিতা ভট্টাচার্য (গাইনোকলজিস্ট, কলকাতা) বলছেন, 'তীব্র পিএমএসে অনেক সময় অ্যান্টিডিপ্রেসেন্ট বা হরমোনাল পিল দেওয়া হয়। সে সময় গর্ভধারণ এড়াতে হয়। তাই চিকিৎসার মাধ্যমে পরোক্ষভাবে প্রজননে প্রভাব পড়তে পারে।'
সমাধান লুকিয়ে আছে মৌলিক নিয়মে—
শুধু বিজ্ঞান নয়, সমাজের দৃষ্টিভঙ্গিরও পরিবর্তন দরকার। অফিসে ফ্লেক্সিবল সময়, রিমোট ওয়ার্ক, সচেতনতা সেশন, এসব উদ্যোগ নিলে পরিস্থিতি অনেকটা বদলাতে পারে।
অবশেষে বার্তাটি স্পষ্ট, পিএমএস সত্যি, এর জৈবিক ভিত্তি রয়েছে। কিন্তু আজকের হস্টেল-চালিত জীবনযাত্রা ও মানসিক চাপ একে আরও দুর্বিষহ করে তুলছে। তাই প্রয়োজন শরীরের কথা শোনা, আর সমাজের উচিত এই বিষয়টিকে দুর্বলতা নয়, বাস্তব স্বাস্থ্য সমস্যা হিসেবে গ্রহণ করা।