গর্ভে থাকা অবস্থায় ভ্রূণের শরীরে একটি বিশেষ রক্তনালী থাকে, যার নাম ডাক্টাস আর্টেরিওসাস (Ductus Arteriosus)। এটি অ্যাওর্টা (মহাধমনি) ও পালমোনারি আর্টারির মধ্যে সংযোগ তৈরি করে এবং ফুসফুস পুরোপুরি তৈরি না হওয়া পর্যন্ত রক্তপ্রবাহ নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করে। সাধারণত জন্মের ২–৩ দিনের মধ্যেই এই পথ বন্ধ হয়ে যায়। কিন্তু যদি তা বন্ধ না হয়, তখনই তাকে বলা হয় পেটেন্ট ডাক্টাস আর্টেরিওসাস (PDA)।

প্রতীকী ছবি, এআই দিয়ে বানানো।
শেষ আপডেট: 9 April 2026 12:21
জন্ম থেকে হার্টের রক্তচলাচলের পথে জটিলতা। কিন্তু দীর্ঘ ১৭ বছর সেই কথা টেরই পায়নি কিশোরী। সাধারণ জীবনযাপন করছিল সে। কিন্তু গত দু'বছর ধরে হঠাৎই শুরু হয় অসহ্য হাঁপানি ও শ্বাসকষ্ট। দক্ষিণ ভারতের নামী হাসপাতালও যখন হাল ছেড়ে দিয়েছিল, তখন আলোকবর্তিকা হয়ে দাঁড়াল কলকাতার পিজি বা এসএসকেএম (SSKM) হাসপাতাল। প্রখ্যাত কার্ডিওলজিস্ট ডা. প্রদীপ ঘোষালের হাত ধরে অসাধ্য সাধন হল সরকারি হাসপাতালে।
ঠিক কী হয়েছিল?
গর্ভে থাকা অবস্থায় ভ্রূণের শরীরে একটি বিশেষ রক্তনালী থাকে, যার নাম ডাক্টাস আর্টেরিওসাস (Ductus Arteriosus)। এটি অ্যাওর্টা (মহাধমনি) ও পালমোনারি আর্টারির মধ্যে সংযোগ তৈরি করে এবং ফুসফুস পুরোপুরি তৈরি না হওয়া পর্যন্ত রক্তপ্রবাহ নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করে। সাধারণত জন্মের ২–৩ দিনের মধ্যেই এই পথ বন্ধ হয়ে যায়। কিন্তু যদি তা বন্ধ না হয়, তখনই তাকে বলা হয় পেটেন্ট ডাক্টাস আর্টেরিওসাস (PDA)।
এক্ষেত্রে স্বাভাবিক নিয়মে হার্টের ডানদিক থেকে (ডান অলিন্দ) রক্ত পালমোনারি আর্টারি দিয়ে ফুসফুসে যায়। সেখানে রক্ত পরিশুদ্ধ হয়ে তারপর হার্টের বাঁদিকে দিয়ে (বাম অলিন্দ) শুদ্ধ রক্ত প্রবাহ সারা শরীরে যায়। শিশু জন্মের সঙ্গে সঙ্গে এই পালমোনারী আর্টারি কাজ শুরু করে দেয় ও নিজে থেকেই ডাক্টাস আর্টেরিওসাস বন্ধ হয়। যদি তা না হয় তাহলে ওই পরিশুদ্ধ রক্ত হার্টের বাঁদিক থেকে ডানদিকে ঢুকতে শুরু করে ডাক্টাস আর্টেরিওসাস দিয়ে, ফলে ডান দিকের চাপ ধীরে ধীরে বাড়তে বাড়তে একসময় বাম দিকের (সিস্টেমিক সার্কুলেশন) চাপকে ছাড়িয়ে গেলে, তখন হার্টের ডান দিকের অপরিশোধিত (অক্সিজেনশূন্য) রক্ত ফুসফুসে ফিল্টার না হয়ে সরাসরি সিস্টেমিক সার্কুলেশনে প্রবাহিত হতে শুরু করে। এই অবস্থাকেই বলা হয় শান্ট রিভার্সাল (Shunt Reversal)। এইভাবে হৃদপিণ্ডের বা রক্তনালীর জন্মগত ত্রুটির কারণে রক্তের স্বাভাবিক প্রবাহ উল্টে যায়। ফলে শরীরে কম অক্সিজেনযুক্ত রক্ত সঞ্চালিত হয়। ও ফুসফুসের ধমনীতে চাপ বেড়ে পালমোনারি আর্টারিয়াল হাইপারটেনশন (PAH) হয়ে যায়। এই মেয়েটির ক্ষেত্রেও শান্ট রিভার্সাল না হলেও ডাক্টাস আর্টেরিওসাস থেকে সমস্যা শুরু হয়, পালমোনারি আর্টারির চাপ বাড়তে থাকে।
১৭ বছর কেন কিছু বোঝা যায়নি?
সাধারণত এই সমস্যা থাকলে শিশু জন্মর পরেই নীল হয়ে যায় বা নানা লক্ষণ দেখা দেয়। কিন্তু ডা. ঘোষাল জানান, এই রোগীর ক্ষেত্রে নালীটি খুব বেশি চওড়া ছিল না (Small PDA)। ফলে কোনও বিশেষ শব্দ বা ‘হার্ট মারমার’ (Heart Murmur) আগে ধরা পড়েনি। ১৫ বছর পর্যন্ত সে স্বাভাবিক ছিল। কিন্তু ১৭ বছর বয়সে এসে অবস্থা অত্যন্ত সংকটজনক হয়ে পড়ে।
তিনি আরও জানান, আর কয়েকটা দিন দেরি হলে হার্টের রক্তপ্রবাহ সম্পূর্ণ উল্টে যেত (Shunt Reversal)। যার ফলে ফুসফুসে পাকাপাকিভাবে রক্তচাপ বেড়ে গিয়ে মৃত্যু পর্যন্ত হতে পারত। কিন্তু সেই ‘টার্নিং পয়েন্ট’-এ পৌঁছানোর ঠিক আগেই অস্ত্রোপচার সফল হয়। টিমে ছিলেন কার্ডিওলজিস্ট ডাঃ শ্রেয়াংশু চৌধুরি ও ডা. দীপাঞ্জণা বক্সি।
এসএসকেএম-এ যেভাবে হল অসাধ্য সাধন
বিনা কাটাছেঁড়ায় অত্যাধুনিক পদ্ধতিতে কিশোরীর প্রাণ বাঁচালেন চিকিৎসকরা। একে বলা হয় ‘কার্ডিয়াক ক্যাথিটারাইজেশন’। কুঁচকির কাছে একটি অতি সূক্ষ্ম ছিদ্র করে একটি সূক্ষ্ম টিউব (Catheter) ঢোকানো হয়।
এক্স-রে মনিটরে দেখে সেই টিউবটিকে হার্টের সেই খোলা নালীর মুখে নিয়ে যাওয়া হয়। এরপর ‘পিডিএ অক্লুডার’ নামক একটি ছোট্ট ছাতার মতো দেখতে বিশেষ ডিভাইস বা যন্ত্র সেখানে বসিয়ে দেওয়া হয়। প্লাগের মতো এই যন্ত্রটি নালীর মুখ বন্ধ করে দিতেই রক্ত সঞ্চালন স্বাভাবিক হয়ে যায়।
সতর্ক থাকতে কী কী লক্ষণ মনে রাখবেন?
চিকিৎসকের কথায়, বড় ধরনের PDA থাকলে শিশুর মধ্যে বিশেষ কিছু উপসর্গ দেখা দেয়:
রূপকথার মতো ফিরে আসা
জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত বিরতিহীনভাবে কাজ করে যায় আমাদের হৃদযন্ত্র। সেই যন্ত্রে সামান্য ত্রুটি নিয়ে ১৭ বছর কাটিয়ে দেওয়া কার্যত অবিশ্বাস্য। এসএসকেএম-এর চিকিৎসকদের এই সাফল্য শুধু এক কিশোরীকে নতুন জীবন দিল না, বরং আবারও প্রমাণ করল যে সঠিক সময়ে আধুনিক চিকিৎসা শুরু করলে মিরাকেল সম্ভব। বর্তমানে ওই কিশোরী সুস্থ এবং স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে শুরু করেছে।