১৫০ কেজি ওজনের এক ব্যক্তি পড়ে গিয়ে কোমরের হাড় ভেঙে ফেলেন। অস্ত্রোপচার ছাড়া সেই হাড় জোড়া লাগানোর কোনও উপায় ছিল না। কিন্তু এত বেশি ওজনের রোগীকে অপারেশন টেবিলে তোলা সম্ভব নয়—এই আশঙ্কায় রাজ্যের বেশ কয়েকটি হাসপাতাল চিকিৎসা করতে অস্বীকার করে। কারণ, সাধারণ ওটি টেবিল ১২০ কেজির বেশি ওজন বহন করতে সক্ষম নয়। এই অবস্থায় এগিয়ে আসে কলকাতারই এক বেসরকারি হাসপাতাল।

রোগীর ওজন ১৫০ কেজি। অসম্ভবকে সম্ভব করার গল্প। প্রতীকী ছবি, এআই দিয়ে বানানো।
শেষ আপডেট: 25 March 2026 12:12
কথায় আছে, “যদি হও সুজন, তবে তেঁতুল পাতায় ন’জন!”—প্রবাদের সেই চেনা লাইনটাকে একটু বদলে নিলেই বোধহয় এই ঘটনার প্রেক্ষাপট পরিষ্কার হয়—‘যদি হও সুজন, তবে ওটি টেবিলেও ১৫০ কেজির ঠাঁই!’ রূপক অর্থে নয়, বরং আক্ষরিক অর্থেই অসম্ভবকে সম্ভব করে দেখালেন কলকাতার এক বেসরকারি হাসপাতালের চিকিৎসকরা। স্থূলতা বা ওবেসিটি যখন অস্ত্রোপচারের পথে পাহাড়প্রমাণ বাধা হয়ে দাঁড়ায়, তখন আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞান ও চিকিৎসকদের দৃঢ়তা কীভাবে অসাধ্য সাধন করতে পারে, তারই এক অনন্য নজির হল এই ঘটনায়।
১৫০ কেজি ওজনের এক ব্যক্তি পড়ে গিয়ে কোমরের হাড় ভেঙে ফেলেন। অস্ত্রোপচার ছাড়া সেই হাড় জোড়া লাগানোর কোনও উপায় ছিল না। কিন্তু এত বেশি ওজনের রোগীকে অপারেশন টেবিলে তোলা সম্ভব নয়—এই আশঙ্কায় রাজ্যের বেশ কয়েকটি হাসপাতাল চিকিৎসা করতে অস্বীকার করে। কারণ, সাধারণ ওটি টেবিল ১২০ কেজির বেশি ওজন বহন করতে সক্ষম নয়। এই অবস্থায় এগিয়ে আসে কলকাতারই এক বেসরকারি হাসপাতাল।
হাসপাতালের অর্থোপেডিক সার্জন ডা. সুজয় কুণ্ডু জানান, “১৫০ কেজি ওজনের রোগীর ক্ষেত্রে সাধারণ ওটি টেবিল অনেক সময় ভার সইতে পারে না। এছাড়া শরীরে অতিরিক্ত চর্বি থাকার কারণে অস্ত্রোপচারের সময় রক্তনালী খুঁজে পাওয়া বা নির্দিষ্ট অঙ্গে পৌঁছানো অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়ে। হার্টের ওপর বাড়তি চাপ এবং ফুসফুসের কার্যক্ষমতা কমে যাওয়ার ঝুঁকিও থাকে।”
তিনি আরও জানান, এই রোগীর আগে থেকেই স্লিপ অ্যাপনিয়ার সমস্যা ছিল, ফলে ফুসফুস সংক্রান্ত জটিলতাও ছিল। এক সময় পালমোনারি এম্বোলিজমের কারণে তাঁর শরীরে অক্সিজেন স্যাচুরেশন ৮ শতাংশে নেমে যায়, যা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থা। হাসপাতালে ভর্তি করার পর প্রথমে চারদিন ধরে তাঁর ফুসফুসের অবস্থা স্থিতিশীল করা হয়। তারপর করা হয় কোমরের অস্ত্রোপচার।
ডা. কুণ্ডুর কথায়, “সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ ছিল রোগীকে অপারেশন টেবিলে তোলা। সেই জন্য টেকনিক্যাল টিমের সঙ্গে আলোচনা করে বিশেষ ব্যবস্থা করা হয়।” চিকিৎসরদের টিমে ছিলেন ডা. এ পাত্র, ডা. পি.কে মিত্র, ডা.দীপেন্দু কুণ্ডু ও নার্সরা।

কী হয়েছিল রোগীর?
৫৮ বছর বয়সি দমদমের বাসিন্দা এই ব্যক্তি দীর্ঘদিন ধরে হাঁটুর ব্যথায় ভুগছিলেন। ব্যবসার কাজে ধানবাদে গিয়ে হঠাৎ পড়ে যান তিনি। তাতেই ভেঙে যায় কোমরের হাড়।
এক্স-রে করে দেখা যায়, তাঁর হিপ জয়েন্টের ঠিক নিচের হাড় (Upper End Femur) পাঁচটি টুকরো হয়ে গেছে—যাকে চিকিৎসা পরিভাষায় Comminuted Fracture বলা হয়। এরপর একাধিক হাসপাতাল ঘুরে তিনি শেষমেশ ডা. সুজয় কুণ্ডুর কাছে আসেন এবং এমার্জেন্সিতে ভর্তি হয়ে চিকিৎসা শুরু হয়।
কীভাবে করা হল অপারেশন?
এই ধরনের রোগীর জন্য সাধারণ ওটি টেবিল যথেষ্ট নয়। তাই ১৫০ কেজি ওজনের রোগীর জন্য বিশেষভাবে ওটি টেবিলের ব্যবস্থা করা হয়। ডা. কুণ্ডু ও বায়োমেডিক্যাল টিমের সাহায্যে একটি বিশেষ ব্যবস্থা করেন। রোগীর মাথা থেকে তলপেট পর্যন্ত অংশ রাখা হয় মূল ওটি টেবিলে। দু’টি পা ছড়িয়ে রাখা হয় দুপাশে রাখা দুটি টেবিলে (এক্সটেনশন দিয়ে), যাকে ফ্র্যাকচার টেবিল বলা হয়।
এভাবে রোগীর মোট ওজনকে ভাগ করা সম্ভব হয়—দুই পায়ের প্রায় ৫০ কেজি ওজন আলাদা হয়ে যায় (প্রতি পা প্রায় ২৫ কেজি করে), আর বাকি ১০০ কেজি মূল টেবিলে থাকে। ফলে একটিমাত্র টেবিলের ওপর অতিরিক্ত চাপ পড়ার সমস্যা অনেকটাই কমে।
এই সিস্টেমেটিক ব্যবস্থার ফলে জটিল অপারেশন সফলভাবে সম্পন্ন করা সম্ভব হয়। রোগীকে অ্যানাস্থেশিয়া দেওয়া হয় বিশেষ পদ্ধতিতে, বড় সিরিঞ্জ ব্যবহার করে। এত বেশি ওজনের রোগীর ক্ষেত্রে এই ধরনের অস্ত্রোপচার করা নিঃসন্দেহে বড় চ্যালেঞ্জ ছিল বলে জানান চিকিৎসকরা।
এখন কেমন আছেন রোগী?
রোগীর ওজন বেশি এবং একাধিক শারীরিক জটিলতা থাকায় অন্যদের তুলনায় তাঁকে বেশি সময় বিশ্রামে থাকতে হবে। সাধারণত এই ধরনের অস্ত্রোপচারের পর স্বাভাবিক ওজনের রোগীরা তিন সপ্তাহের মধ্যে হাঁটাচলা শুরু করতে পারেন। কিন্তু এই রোগীর ক্ষেত্রে অন্তত ছয় সপ্তাহ সম্পূর্ণ বিশ্রাম জরুরি।
বর্তমানে তাঁকে এয়ার বেডে রাখা হয়েছে, যাতে দীর্ঘসময় শুয়ে থাকার ফলে শরীরে চাপজনিত সমস্যা না হয়। এছাড়াও অর্থোস্ট্যাটিক নিউমোনিয়ার ঝুঁকি থাকায় বিশেষ নজরদারি চলছে।
দীর্ঘসময় শুয়ে থাকলে ফুসফুসের নিচের অংশে সংক্রমণ হওয়ার আশঙ্কা থাকে। তাই নিয়মিত স্পাইরোমেট্রি করিয়ে তাঁর ফুসফুসের কার্যক্ষমতা ঠিক রাখা হচ্ছে। বসিয়ে এই পরীক্ষা করানো হলে শ্বাসপ্রশ্বাসের ক্ষমতা বজায় থাকে এবং সংক্রমণের ঝুঁকি কমে।
চিকিৎসক জানান, এইভাবে সঠিক পরিচর্যা চললে ছয় সপ্তাহ পর তিনি ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হাঁটাচলা করতে পারবেন। কারণ, অত্যন্ত জটিল হওয়া সত্ত্বেও এই অস্ত্রোপচার সম্পূর্ণ সফল হয়েছে—যা এই ধরনের রোগীদের ক্ষেত্রে নিঃসন্দেহে একটি বড় সাফল্য।