নিস্তব্ধ শৈশবে ফুটল কথা! এসএসকেএম হাসপাতালে ৯ মাসে ৯৭ জন শিশুর সফল ককলিয়া ইমপ্ল্যান্ট। ১৭ লক্ষ টাকার ব্যয়বহুল চিকিৎসা এখন সরকারি সহায়তায় সম্পূর্ণ বিনামূল্যে। বিস্তারিত পড়ুন।

শিশুদের কথা ফোটালো ককলিয়া ইমপল্যান্ট
শেষ আপডেট: 4 March 2026 20:01
জন্ম থেকেই কানে শুনতে পায় না, তাই মুখে ফোটে না কথা। অন্ধকার এই জগতেই হয়তো আজীবন থেকে যেতে হতো একশোর কাছাকাছি কচি খুদে প্রাণেদের । কিন্তু অসাধ্যসাধন করল এসএসকেএম (SSKM) হাসপাতালের ইএনটি বিভাগ। সরকারি সহায়তায় ও চিকিৎসকদের অক্লান্ত পরিশ্রমে গত ৯ মাসে মোট ৯৭ জন শিশুর মুখে কথা ফোটাল পিজি হাসপাতাল। অত্যন্ত ব্যয়বহুল ‘ককলিয়া ইমপ্ল্যান্ট’ (Cochlear Implant) পদ্ধতির মাধ্যমে সম্পূর্ণ বিনামূল্যে এই চিকিৎসা করানো হয়।
গতকাল ছিল ‘বিশ্ব শ্রবণ দিবস’ (World Hearing Day)। এই বিশেষ দিনেই এসএসকেএম-এ দুই ও তিন বছর বয়সি দুই শিশুর (একটি ছেলে ও একটি মেয়ে) সফল ককলিয়া ইমপ্ল্যান্ট করা হয়। হাসপাতালের ইএনটি বিভাগের প্রধান চিকিৎসক ডা. অরুণাভ সেনগুপ্ত জানান, রাজ্য সরকারের প্রকল্পের অধীনে ১০০ জন শিশুকে বিনামূল্যে এই চিকিৎসা প্রদানের সহায়তা করা হয়। এই লক্ষ্য রেখেই মাত্র ৯ মাসের মধ্যেই করা হয়েছে ৯৭ জনের ইমপ্ল্যান্ট। তাহলে বলার অপেক্ষা রাখে না এই সমস্যা কতটা মাত্রায় বেড়েছে। ঘরে ঘরে শিশুরা রয়েছে যাঁরা কানে শুনতে না পাওয়ার জন্য কথাও বলতে পারে না। বাকি দুটি শিশুর অস্ত্রোপচার হবে বর্ধমান মেডিক্যাল কলেজে।
বেসরকারি হাসপাতালে এই চিকিৎসার খরচ প্রায় ১৫-১৭ লক্ষ টাকা। সাধারণ পরিবারের পক্ষে যা বহন করা অসম্ভব। ফলে অনেক শিশুই আজীবন শ্রবণ ও বাকপ্রতিবন্ধী থেকে যেত। কিন্তু রাজ্য সরকারের হস্তক্ষেপে পিজিতে এই বিপুল কর্মকাণ্ড চলছে সম্পূর্ণ বিনামূল্যে।
শিশুরা শুনতে পায় না বলেই তাদের কথা বলার ক্ষমতা তৈরি হয় না। একেই বলা হয় ‘জন্মগত বধিরতা’। ডাঃ সেনগুপ্তের কথায়, "বর্তমানে নানা কারণে এই সমস্যা বাড়ছে। অনেক সময় মা-বাবার জিনগত ত্রুটি বা জন্মের পর ভাইরাল ইনফেকশনের কারণেও শিশু বধির হতে পারে।"
অস্ত্রোপচার হলেই যে শিশু কথা বলবে, তা নয়। ডাঃ সেনগুপ্ত জানালেন, অপারেশনের মাধ্যমে সমস্যা মেটে ৩০ শতাংশ। বাকি ৭০ শতাংশ কাজ হয় দীর্ঘ রিহ্যাবিলিটেশন বা স্পিচ থেরাপির মাধ্যমে।
অস্ত্রোপচারের ১৫ দিন পর হয় ‘সুইচ অন’ প্রক্রিয়া। ২০ দিনের মাথায় শুরু হয় রিহ্যাবিলিটেশন। টানা ৬ মাস থেকে এক বছর চলে এই প্রশিক্ষণ, যার পরেই শিশুটি ধীরে ধীরে শব্দ উচ্চারণ করতে শেখে।
এমনটাই মিরাকেল ঘটেছে ৩৮ বছরের অভীক দাসের একমাত্র কন্যাসন্তানের ক্ষেত্রেও। কথা বলতে পারছিল না। কোনো শব্দে সে সাড়া দিত না। বেসরকারি হাসপাতালে ১৭ লক্ষ টাকার খরচ শুনে যখন দিশেহারা পরিবার, তখনই ত্রাতা হয়ে দাঁড়ায় এসএসকেএম। আজ সেই শিশুটি শুনতে পায়, তার মুখে হাসি ফুটেছে।
সাধারণ মানুষের মধ্যে এখনও সচেতনতা কম। অনেক সময় অভিভাবকেরা ভাবেন দেরি করে কথা ফুটবে, এই ভ্রান্ত ধারণা বিপদ ডেকে আনে। শিশু কথা বলতে দেরি করলে বা ডাকলে সাড়া না দিলে দ্রুত ইএনটি বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া উচিত। জন্মের পর অনেক সময় টেস্ট করে শ্রবণ ক্ষমতা ঠিক আছে এই রিপোর্ট আসতেই পারে। তবুও যদি পরবর্তী সময় শিশুর ভাইরাল ডিজিজ হয় মারাত্মক আকারে তা থেকেও শ্রবণক্ষমতা হ্রাস পেয়ে কথা বলাল সমস্যা হতে পারে। তাই সবসময়ই নজরে রাখা দরকার।
এই হাসপাতালে প্রতিটি শিশুই ৫ বছর বয়সের মধ্যে করিয়েছে ককলিয়া ইমপ্ল্যান্টেশন। তাই কার্যকর হয়েছে চিকিৎসা। এখন প্রত্যেকেই কথা বলছে, হাসছে, খেলছে। এটাই বড় প্রাপ্তি।