কমবয়সি মহিলাদের মধ্যে পাইলসের সমস্যা কেন বাড়ছে? খাদ্যাভ্যাস, জল খাওয়া ও জীবনযাপনের ভূমিকা ব্যাখ্যা করলেন চিকিৎসক।

শেষ আপডেট: 19 December 2025 11:03
দ্য ওয়াল ব্যুরো: পাইলস বা হেমোরয়েড— এই সমস্যাটিকে সাধারণত বয়সকালের রোগ বলেই ধরা হয়। কিন্তু সম্প্রতি চিকিৎসকেরা লক্ষ্য করছেন, কম বয়সি, বিশেষ করে তরুণীদের মধ্যেও পাইলসের ঘটনা ক্রমশ বাড়ছে। বিষয়টি উদ্বেগজনক, কারণ এর নেপথ্যে লুকিয়ে রয়েছে আমাদের দৈনন্দিন জীবনযাপনের কিছু অভ্যাস, যেগুলি আমরা অনেক সময় গুরুত্বই দিই না।
পাইলস বা অর্শ্ব এমন একটি শারীরিক সমস্যা, যেখানে মলদ্বার বা পায়ুপথের শিরাগুলি ফুলে যায়। এর ফলে ব্যথা, চুলকানি, অস্বস্তি এবং অনেক সময় রক্তপাতও হতে পারে। সামাজিক লজ্জা ও অস্বস্তির কারণে বহু মহিলাই এই ধরনের সমস্যা নিয়ে কথা বলতে চান না। ফলে প্রাথমিক লক্ষণ উপেক্ষিত হয় এবং সময়ের সঙ্গে সমস্যাটি আরও জটিল আকার নেয়।
চেন্নাইয়ের রেলা হাসপাতালের সিনিয়র কনসালট্যান্ট (বেরিয়াট্রিক ও মেটাবলিক সার্জারি) ডা. সি. কোলান্দাসামি জানাচ্ছেন, আধুনিক জীবনযাপনই এই সমস্যার অন্যতম মূল কারণ। তাঁর কথায়, “কম ফাইবারযুক্ত খাবার, পর্যাপ্ত জল না খাওয়া, দীর্ঘক্ষণ বসে থাকা এবং কোষ্ঠকাঠিন্য— এই সবকিছু একসঙ্গে মলদ্বারের শিরার উপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি করে। তার ফলেই তরুণীরা পাইলসের ঝুঁকিতে পড়ছেন।”
১. ফাইবারের অভাবযুক্ত খাদ্যাভ্যাস
আজকের দিনে প্রক্রিয়াজাত খাবার, ফাস্ট ফুড এবং জাঙ্ক ফুডের উপর নির্ভরতা বেড়েছে। কিন্তু এই ধরনের খাবারে ফাইবারের পরিমাণ খুবই কম। পর্যাপ্ত ফাইবার না থাকলে মল শক্ত হয়ে যায়, মলত্যাগের সময় জোর দিতে হয় এবং এতে মলদ্বারের শিরার উপর চাপ পড়ে। ন্যাশনাল লাইব্রেরি অব মেডিসিনের রিপোর্টেও বলা হয়েছে, দীর্ঘদিন ফাইবারের ঘাটতি থাকলে পাইলসের ঝুঁকি অনেক বেড়ে যায়।
২. দীর্ঘক্ষণ বসে থাকা ও শারীরিক নিষ্ক্রিয়তা
কলেজ, অফিস বা অনলাইন কাজ— ঘণ্টার পর ঘণ্টা বসে থাকার ফলে পেলভিক অঞ্চলে রক্ত সঞ্চালন কমে যায়। একই সঙ্গে হজম প্রক্রিয়াও ধীর হয়ে পড়ে। এর ফলেই কোষ্ঠকাঠিন্য তৈরি হয়, যা শেষ পর্যন্ত পাইলসের দিকে ঠেলে দেয়।
৩. পর্যাপ্ত জল না খাওয়া
অনেকেই জল কম খেয়ে চা বা কফির উপর ভরসা করেন। কিন্তু এগুলি শরীরে জলশূন্যতা আরও বাড়াতে পারে। ডা. কোলান্দাসামির কথায়, “জল হজম প্রক্রিয়ায় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেয়। ফাইবার ঠিকভাবে কাজ করতে গেলেও জল প্রয়োজন। পর্যাপ্ত জল না খেলে কোষ্ঠকাঠিন্য বাড়ে এবং পাইলসের ঝুঁকি বেড়ে যায়।”
শুরুতে পাইলসের লক্ষণ খুবই হালকা হতে পারে—
পায়ুপথে চুলকানি
হালকা ব্যথা বা অস্বস্তি
মলত্যাগের সময় অল্প রক্তপাত
অনেকেই মনে করেন, এসব আপনাআপনি সেরে যাবে। কিন্তু চিকিৎসকেরা বলছেন, এই অবহেলাই সমস্যাকে জটিল করে তোলে। প্রাথমিক অবস্থাতেই চিকিৎসা শুরু করলে সহজ উপায়ে সমস্যা নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব।
ফাইবারসমৃদ্ধ খাবার খান
ডাল, ছোলা, রাজমা, ওটস, কুইনোয়া, বেরি ফল, অ্যাভোকাডোর মতো খাবার খাদ্যতালিকায় রাখলে মলত্যাগ স্বাভাবিক থাকে।
পর্যাপ্ত জল পান করুন
সারা দিনে নিয়মিত জল খাওয়ার অভ্যাস গড়ে তুলুন। চা-কফির বদলে জলই হোক প্রথম পছন্দ।
নিয়মিত শরীরচর্চা করুন
হালকা হাঁটা, যোগাসন বা কাজের ফাঁকে স্ট্রেচিং—এগুলি রক্ত সঞ্চালন ও হজম প্রক্রিয়া ভালো রাখতে সাহায্য করে।
যদি পাইলসের লক্ষণ স্পষ্টভাবে দেখা দেয় বা দীর্ঘদিন ধরে অস্বস্তি থাকে, তাহলে দেরি না করে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি। শুরুতেই চিকিৎসা করলে ওষুধ, খাদ্যাভ্যাসের পরিবর্তন ও জীবনযাত্রার সামান্য বদলেই সমস্যা নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব। প্রয়োজনে আধুনিক ও কম জটিল চিকিৎসা পদ্ধতিও রয়েছে।
ডা. কোলান্দাসামির মতে, সচেতনতা ও সময়মতো পদক্ষেপই সবচেয়ে বড় অস্ত্র। ফাইবারযুক্ত খাবার, পর্যাপ্ত জল এবং সক্রিয় জীবনযাপন— এই তিনটি অভ্যাসই পাইলসের ঝুঁকি অনেকটাই কমিয়ে দিতে পারে।