
শেষ আপডেট: 1 January 2024 17:32
দ্য ওয়াল ব্যুরো: শীতকাল আর কমলালেবু যেন ওতপ্রোতভাবে জড়িত। পৌষ-মাঘের দুপুরে যখন জানলা দিয়ে আলগা নরম রোদ্দুর এসে পড়ে ঘরের মেঝেতে, তখন দ্বিপ্রাহরিক ভোজনের পর কম্বলে পা ঢেকে রোদ পোহান অনেকেই। ঠিক সেই সময়েই মনে পড়ে কমলালেবুর কথা। আমবাঙালি মায়েরা স্বহস্তে সেই 'ফলদান' করেন। না খেলেই বিপত্তি! সেই নিয়ে ফেসবুকেও হাজার মিম। গ্র্যাজুয়েশনের পরেই বিবাহযোগ্যা মেয়েকে যেমন বিয়ের জন্য চাপ দেওয়া শুরু হয়, মধ্যবিত্ত বাঙালি বাড়িতে নাকি তেমনই শীতকালে কমলালেবু খাওয়ার জন্য চাপ দেওয়া হয়। ক্রিকেটের মাঠ হোক, বা চিড়িয়াখানা ভ্রমণ, "অ্যাই বাবু, কমলালেবুটা খেয়ে নে" হল শীতের হিট ডায়লগ।
তা মায়ের কথা কি আর অমান্য করা যায়? খাচ্ছেন তো বটেই, কিন্তু জানেন কি, যেটা খাচ্ছেন সেটা আসলে কমলালেবু কিনা? আসলে কমলা রংয়ের কোয়াবিশিষ্ট যে শীতকালীন ফল বাংলায় সর্বজনীনভাবে 'কমলালেবু' বলে পরিচিত, ইংরেজিতে কিন্তু তেমনটা নয়। যে কমলার ইংরেজি আমরা অরেঞ্জ বলে জানি, তা আদতে ট্যাঞ্জারিন। আপাতদৃষ্টিতে অরেঞ্জ এবং ট্যাঞ্জারিনের তেমন তফাৎ আছে বলে ধরা না গেলেও স্বভাবে এবং গুণাবলীর বিচারে এই দুটি জিনিস অনেকটাই আলাদা।
একই গোত্রের হলেও লেবু বংশের এই দুই সদস্যের উৎপত্তিস্থল আলাদা। অরেঞ্জের উৎপত্তি দক্ষিণ চিন বা ইন্দোনেশিয়ায়। বর্তমানে ফ্লোরিডা, সাও পাওলো, ব্রাজিলে মূলত চাষ করা হয় এই ফল। সাইট্রাস এক্স সিনেনসিস প্রজাতিভুক্ত অরেঞ্জের সঙ্গে সম্পর্ক রয়েছে সাইট্রাস প্রজাতির অন্য ফলের। অরেঞ্জ আসলে পমেলো এবং ম্যান্ডারিনের মধ্যে সংমিশ্রণ।

অন্যদিকে ট্যাঞ্জারিন হল সি ট্যাঞ্জারিনা গাছের ফল, যেটি প্রাথমিকভাবে চাষ করা হত ফ্লোরিডার পালাটকায়। ১৮ শতকে মরোক্কোর ট্যাঞ্জিয়ার হয়ে এই ফল অন্যত্র রফতানি করা হত, সেই থেকেই এটির নাম হয়ে যায় ট্যাঞ্জারিন। বংশের হিসেবে ট্যাঞ্জারিন একটি বিশেষ ধরনের ম্যান্ডারিন। তবে সমস্ত ম্যান্ডারিনই কিন্তু ট্যাঞ্জারিন নয়।

অরেঞ্জ এবং ট্যাঞ্জারিনের বহিরঙ্গের পার্থক্য:
খোসা না ছাড়ানো থাকলে খালি চোখে অরেঞ্জ এবং ট্যাঞ্জারিনের তফাৎ বোঝা একটু মুশকিল। নামে 'অরেঞ্জ' হলেও এটির রং একটু ফ্যাকাশে হলদেটে। আর ট্যাঞ্জারিন তুলনায় অনেকটাই গাঢ়। সাইজে তুলনামূলকভাবে অরেঞ্জের তুলনায় বেশ ছোট ট্যাঞ্জারিন। তবে খোসা ছাড়ালেই চোখে পড়বে আসল তফাৎ। ট্যাঞ্জারিন হল কোয়াবিশিষ্ট। কোয়া খুলে খুলে তা খেতে হয়, মানে যেভাবে আমরা সাধারণত কমলালেবু খেয়ে থাকি। কিন্তু আসল অরেঞ্জে কোয়া থাকে না মোটেই। তা আসলে মুসাম্বি লেবুর মতো, কোয়া ছাড়া। কেটে টুকরো করে খেতে হয়। শীতের বাজারে সস্তায় পাওয়া কমলালেবু আসলে ট্যাঞ্জারিন, অরেঞ্জের দেখা সচরাচর মেলে না।
স্বাদের ফারাক:
ফলওয়ালা যতই 'মিষ্টি না হলে টাকা ফেরত' বলে বেচে দিন না কেন, আদতে বাঙালির প্রিয় কমলালেবু টক-মিষ্টি একটি ফল। তবে মিষ্টতার বিচারে অরেঞ্জ ট্যাঞ্জারিনের চেয়েও বেশি মিষ্টি। তাই তুল্যমূল্য বিচারে এ ব্যাপারে সেরা হবে অরেঞ্জ। এছাড়া অরেঞ্জের গন্ধও বেশি তীব্র, খাওয়ার পর স্বাদ মুখে লেগে থাকে অনেকক্ষণ।
পুষ্টিগুণের তফাৎ:
যদিও অরেঞ্জে ট্যাঞ্জারিনের চেয়ে বেশি ভিটামিন সি এবং ফাইবার থাকে, তবে এতে ক্যালোরি, ফ্যাট ও কার্বোহাইড্রেট তুলনায় কম। এই দুটি ফলই থায়ামিন, ফোলেট এবং পটাসিয়ামে ভরপুর। অরেঞ্জে থাকে ভিটামিন সি, বি১, বি২, বি৫ ও বি৯। ট্যাঞ্জারিনে থাকে ভিটামিন এ, ভিটামিন ই, বি৩ ও বি৬। অরেঞ্জে ক্যালসিয়াম আর পটাশিয়াম থাকে অনেকটা, কিন্তু ট্যাঞ্জারিনে থাকে আয়রন, ম্যাগনেশিয়াম আর ফসফরাস। নিয়মিত অরেঞ্জ খেলে রক্তের লিপিড প্রোফাইল উন্নত হয়। ডিএনএ-র ক্ষত সারানো এবং এবং এইচ-পাইলোরি জনিত পাকস্থলীর আলসারের ক্ষেত্রে অরেঞ্জ বেশ উপকারী। বিশেষজ্ঞরা বলেন, পুষ্টির দিক থেকে অরেঞ্জই বেশি কার্যকর। তবে সার্বিকভাবে দুটি ফলই স্বাস্থ্যের পক্ষে উপযোগী।
তাই বাড়ি থেকে কমলালেবু খাওয়ার জন্য চাপ দিলে, চুপচাপ মেনে নেওয়াই ভাল। লাঞ্চবক্সে কমলালেবুর দেখা পেলে সোনামুখ করে খেয়ে নিন। শরীর ভাল তো থাকবে বটেই, মায়ের মনও শান্তি পাবে। তবে এটা মনে করিয়ে দিতে ভুলবেন না, আপনি মোটেই 'অরেঞ্জ' খাচ্ছেন না। সে জিনিস একে তো বাজারে পাওয়া ভার, তাছাড়া দামের দিক থেকেও পাল্লা ভারী ট্যাঞ্জারিনেরই।