
সহমরণে বৃদ্ধ দম্পতি। গ্রাফিক্স: শুভ্র শর্ভিন।
শেষ আপডেট: 11 April 2025 19:46
সারাজীবন ধরে পরম ভালবাসার পরে, রূপকথার মতো সংসারে যৌবন থেকে বার্ধক্যের বেলা পার করে ফেলার পরে, পরস্পরের জীবনের সবটুকু দুঃখসুখ পরস্পরের মধ্যে নিংড়ে নেওয়ার পরে, যখন নিজের হাতে সঙ্গীনীকে গলা টিপে মেরে ফেলতে হয়, তখন ঠিক কেমন লাগে? স্ত্রীর গলার নরম কুঁচকোনো চামড়ায় যখন নিজের রোগা অথচ শক্ত আঙুলগুলি চেপে বসে, আরও জোরে চেপে বসে, তখন কি মনে পড়ে, এই গলার ভাঁজে এই আঙুলগুলোই কোনও একদিন এঁকেছিল আদরের দাগ? স্ত্রীর ছটফটানি থেমে যাওয়ার পরে কি ইচ্ছে করে, প্রিয়তম সে নিথর মুখে শেষবারের চু্ম্বনটি রাখতে? সে চু্ম্বন রাখতে গিয়ে কি চোখের জলে ভেসে যায়, মুখ, বুক?
এই উত্তরগুলো আর পাওয়া যাবে না। কারণ জীবনসঙ্গী প্রিয়তমা লতাকে এভাবে খুন করার পরে, নিজেকেও শেষ করে দিয়েছেন মুরলীধর। তাঁরা হয়ে উঠেছেন পরস্পরের 'মরণসঙ্গী'। পৃথিবীর থেকে নিজেদের চিরবিচ্ছিন্ন করে ফেলে, হয়তো বেছে নিয়েছেন চিরমিলনের, চিরআনন্দের পথ, যেথা নাইকো মৃত্যু, নাইকো জরা...
এই জরার তাড়নাতেই এত কিছু। মহারাষ্ট্রের নাসিকের এক প্রাক্তন স্কুলপ্রধান, ৮০ বছর বয়সি মুরলীধর যোশী, অসুস্থ স্ত্রী, প্রাক্তন শিক্ষিকা লতাকে এই কারণেই 'হত্যা' করে আত্মহত্যা করেছেন সদ্য। শেষ চিঠিতে লিখে রেখে গেছেন, 'আমি ওকে এবং নিজেকেও মুক্তি দিলাম।' জানিয়েছেন, স্ত্রীর দীর্ঘ রোগভোগ, শয্যাশায়ী হয়ে থাকা, অসহায় দিনযাপন-- আর সইতে পারছিলেন না তিনি। তাই এই সিদ্ধান্ত।
অথচ অভাব কিন্তু ছিল না প্রাক্তন শিক্ষক এই দম্পতির। যথেষ্ট আধুনিকমনস্ক ছিলেন তাঁরা। শেষের চিঠিতে বলে গেছেন নিজেদের শেষকৃত্যের কথা, অনুরোধ করেছেন স্ত্রীকে শাড়ি-গয়নায় সাজিয়ে দেওয়ার কথাও। গৃহপরিচারককে কৃতজ্ঞতা জানিয়ে, মোটা অঙ্কের টাকাও বরাদ্দ করে গেছেন। অন্যদিকে, তাঁদের দুই সন্তানই প্রতিষ্ঠিত, মা-বাবার দেখভালও করতেন তাঁরা। ফলে আপাতদৃষ্টিতে না-পাওয়া বলতে কিছু ছিল না, আক্ষেপও না। তবু সঙ্গীর দীর্ঘকালীন অসুস্থতার যে অবসাদ, তাই কেড়ে নিল দু-দুটি প্রাণ।
খবরের কাগজের পাতায় ছোট্ট জায়গা দখল করা কয়েকটা বাক্য হয়ে মিলিয়ে গেলেও, এই ঘটনা কেবলই একটি বিচ্ছিন্ন ট্র্যাজেডি নয়। এটি যেন আমাদের সামনে তুলে ধরে একটি গভীর সামাজিক ও মনস্তাত্ত্বিক বাস্তবতাকে। চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয় বার্ধক্য, অসুস্থতা, একাকিত্বের পরিণতি। 'সহমরণ'-এর এমন প্রবণতা নিয়ে প্রশ্নও উস্কে দেয়।
বস্তুত, ভারতের মতো দেশে, যেখানে বার্ধক্যকালীন মানসিক স্বাস্থ্য এখনও সামাজিক আলোচনার মূলস্রোতে এসে পৌঁছয়নি, তখন এই সব প্রশ্নের উত্তর মেলা খুব সহজ নয়। তবু অন্ধকারে হাতড়ানোর মতোই কিছু দিশা আলোচনায় উঠে আসে বই কী।
বয়সের ভারে শরীরকে চেপে ধরে বসা নানা অক্ষমতা, পারকিনসন, ডিমেনশিয়ার মতো নানা দীর্ঘমেয়াদি রোগ, সন্তানদের দূরে থাকা বা সম্পর্কের দূরত্ব, সঙ্গীকে হারানোর ভয় বা তাঁর কষ্ট সহ্য করতে না পারা-- এসবের কোনওটিই বিচ্ছিন্ন বিষয় নয়। এই সব কিছু মিলিয়ে কম-বেশি সব প্রবীণ মানুষের মধ্যেই জন্ম নেয় চূড়ান্ত একাকিত্ব ও প্রাণহীনতার অনুভব। এই প্রাণহীনতাই ছায়া ফেলে মুরলীর চিঠিতেও। 'ও অসুস্থতায় ক্লান্ত, আমি ওকে মুক্তি দিলাম...'
সাইকোলজিস্ট এবং লাইফ কোচ, সৌমি চক্রবর্তী অবশ্য এ বিষয়ে গভীর ও সুচিন্তিত এক মতামত জানাচ্ছেন। তাঁর কথায়, 'আমার মতে, বাঁচার অধিকার যেমন রয়েছে মানুষের, তেমনই রয়েছে স্বেচ্ছামৃত্যুর অধিকারও। কারও ক্ষতি না করে, সমাজকে বা প্রকৃতিকে কোনও আঘাত না করে, নিজেদের দায়িত্ব সমাপন করে নিজেদের সম্মতিতে তাঁরা যদি সিদ্ধান্ত নিয়ে থাকেন জীবনের শেষ প্রান্তের দ্বারটা নিজেদের হাতে বন্ধ করে দেবেন, আমি ব্যক্তিগতভাবে তাকে মহাপাপ মনে করি না। ওঁদের দৃষ্টিকোণকে আমি সম্মান করি।'
তবে একই সঙ্গে সৌমি মনে করিয়ে দিলেন, 'তাঁদের মৃত্যুর ইচ্ছেকে সম্মান জানালেও, এটাই শেষ কথা নয় এবং এটা ভেবে সমাজের দায়িত্বও ফুরিয়ে যায় না। বয়স্ক মানুষদের সঙ্গে বহির্জগতের সংযোগ আরও বাড়াতে সমাজকেই আরও উদার ও দায়িত্বশীল হতে হবে। তাঁদের মানসিক অনুভূতি বিনিময়ের জায়গা তৈরি করতে হবে। বয়স্ক মানুষদের প্রতি আরও সংবেদনশীল হতে হবে প্রতিটি স্তরে।'
বস্তুত, এইধরনের মর্মস্পর্শী ঘটনা সমাজের সহানুভূতি আদায় করতে পারলেও, সামাজিক ব্যবস্থা ও চিকিৎসা কাঠামোর ব্যর্থতা নিয়ে ভাবার অবকাশ উস্কে দেয় দিনের শেষে। কারণ ভারতে এখনও প্রবীণদের মানসিক স্বাস্থ্যের যত্নের জন্য আলাদা করে তেমন কোনও প্রতিষ্ঠানিক কাঠামো নেই। বেশিরভাগ পরিবারেই বয়স্ক সদস্যদের মানসিক স্বাস্থ্য উপেক্ষিত, গভীর আবেগজনিত বিষণ্ণতা বা একাকিত্ব বাসা বাঁধে তাঁদের মনে। কিন্তু কাউন্সেলিংয়ের প্রশ্নে কেবলই একরাশ উপেক্ষা। সেই উপেক্ষারাজির মাঝে দপ করে জ্বলে ওঠা এ ধরনের এক একটা মৃত্যু যেন চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়, প্রবীণদের সুরক্ষা নিশ্চিত করার মতো যথেষ্ট দায়িত্বশীল এখনও হতে পারেনি এ দেশের সমাজ ও রাষ্ট্র।
তবে কেবল এদেশের খামতি, কমতি ও নেতিবাচক দিকগুলি নিয়ে আলোচনা করলে এই বিষয়টিকে খানিকটা সংকীর্ণতায় আবদ্ধ করা হবে। কারণ তথাকথিত উন্নত ও অত্যাধুনিক দেশগুলিতেও এই ধরনের মৃত্যু ঘটছে। আরও সমারোহে ঘটছে। জাপানে বহু প্রবীণ মানুষই একাকিত্বজনিত মৃত্যুর শিকার হন। অনেকে আবার সঙ্গী হারানোর পরে মানসিক ভরসাহীনতায় আত্মহননের পথ বেছে নেন। ফ্রান্স ও সুইজারল্যান্ডের মতো দেশগুলি তো এই ধরনের ক্ষেত্রে আত্মহত্যার আইনি স্বীকৃতিও দিয়ে দিয়েছে।
এ বিষয়ে আন্তর্জাতিক স্তরের মনোবৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণ বলছে 'ডায়াডিক ডেস্পেয়ার' মডেলের কথা। মানসিক স্বাস্থ্য গবেষণায় প্রবীণ যুগলদের এই সহমরণধর্মী আত্মহত্যা ব্যাখ্যা করতে গিয়ে এই থিওরি উঠে আসে। এই মডেল বলে, এক যুগল যখন গভীরভাবে নির্ভরশীল ও আবদ্ধ থাকে পরস্পরের সঙ্গে, সে সময়ে কোনও এক সঙ্গী গুরুতরভাবে অসুস্থ হয়ে পড়লে বা মানসিক শূন্যতার শিকার হলে, অপর সঙ্গী এক গভীর অসহায়তা অনুভব করেন, যা কোনও কিছু দিয়েই সারে না, ভরে না। বরং সময়ের সঙ্গে সঙ্গে জন্ম নেয় সহমরণ-ধর্মী আত্মহত্যার প্রবণতা।
তবে ভুলে গেলে চলবে না, এ দেশের ন্যায় সংহিতা অনুযায়ী কারও মৃত্যু ঘটানো, তা সে যতই আত্মত্যাগমূলক কারণে হোক না কেন, সেটা আইনত ‘হত্যা’। শাস্তিযোগ্য অপরাধ। ফলে নীতিনৈতিকতার প্রশ্ন ও আইনি দ্বন্দ্বের উদ্বেগ সামনে আসে বই কী। ভারতের আদালতে বহু ক্ষেত্রে প্রবীণদের এমন আত্মঘাতী ইচ্ছের পিছনের প্রেক্ষাপট মানবিক ভাবে বিবেচনা করা হয়, কিন্তু মৃত্যুর অনুমোদন কখনওই দেওয়া হয় না।
তাই প্রশ্ন তোলা ভাল, আমরা কি সমাজের প্রতিনিধি হিসেবে প্রবীণ নাগরিকদের জন্য নিরাপত্তা ও সহমর্মিতার সুরক্ষাবলয় আদৌ তৈরি করতে পারছি, যাতে এ ধরনের পথ তাঁরা না বেছে নেন? নাকি আমাদের ব্যর্থতা ঢাকতে এই করুণ ঘটনাগুলোকে আমরা ‘ভালবাসার চূড়ান্ত রূপ’ বা 'সহমরণ' বলে গৌরবান্বিত করে আত্মসান্ত্বনা পাচ্ছি? আমরা কি আদৌ এক মানবিক পরিকাঠামো গড়ে তোলার কথা ভাবছি, যেখানে মুক্তির অনিশ্চিত আকাঙ্ক্ষার দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে আস্থা ও আশার লাইটহাউস খুঁজে পাবে জীবনের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছনো প্রজন্ম?
প্রশ্নগুলো কঠিন, আর উত্তরও তো অজানা!