
ডক্টর দিলীপ কুমার।
শেষ আপডেট: 20 July 2024 18:44
দ্য ওয়াল ব্যুরো: ছোটবেলায় টিবি হয়েছিল বসিরহাটের বাসিন্দা রেজাউল করিমের। সেরে ওঠার পরে খেলাধুলো, দৌড়োদৌড়ি সবই করতেন। মাঝেমাঝে হাঁফ ধরলে বা কাশি হলেও তাতে গুরুত্ব দেননি। এভাবেই কৈশোর, যৌবন পেরিয়ে প্রৌঢ়ত্বে পৌঁছনোর পরে, বিষম কষ্ট নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হন তিনি। বসাতে হয় পেসমেকার। আর তখনই জানা যায়, ৬৬ বছর বয়সি রেজাউল ডেক্সট্রোকার্ডিয়ার রোগী! অর্থাৎ, বুকের বাঁ দিকে নয়, ডানদিকে রয়েছে তাঁর হৃদপিণ্ডটি!
তবে রেজাউলের এই কেস ক্লাসিক্যাল ডেক্সট্রোকার্ডিয়া নয়। অর্থাৎ বিপরীত দিকে হার্ট নিয়ে জন্মাননি তিনি। তাঁর শরীরে এই কাণ্ড ঘটেছে, ছোটবেলার সেই যক্ষ্মারোগে। ফুসফুসে ফাইব্রোসিস হওয়ার কারণে স্বাভাবিক অবস্থান থেকে সরে গিয়ে বুকের ডানদিকে চলে গেছে তাঁর হার্ট। সেসব না জেনেই দিব্যি কেটে গেছে এতগুলো বছর।
অসুস্থতা বাড়ার পরে, ভেলোর নিয়ে যাওয়া হয় রেজাউলকে। কিন্তু সেখানেও সুরাহা না হওযায়, শেষমেশ কলকাতার মেডিকা সুপারস্পেশ্যালিটি হাসপাতালে ভর্তি করা হয় তাঁকে, বসাতে হয় পেসমেকার। আর তখনই দেখা যায়, এই কাণ্ড! বুকের ডানদিকে হার্ট নিয়ে ঘুরছেন রেজাউল! হাসপাতালের ডিরেক্টর অফ ক্যাথ ল্যাব, ডক্টর দিলীপ কুমারের তত্ত্বাবধানে, 'কন্ডাকশান সিস্টেম পেসিং' বা সিএসপি পদ্ধতিতে পেসমেকার বসানো হয় বুকে। অস্ত্রোপচারটি হয়েছে স্বাস্থ্যসাথী স্কিমের আওতায়।
ডক্টর দিলীপ কুমার বলছিলেন, “পেসমেকার যন্ত্রগুলি সাধারণত বাঁদিকে হৃদপিণ্ড আছে, এরকম রোগীদের জন্যই তৈরি করা হয়। তাই আমরা সিদ্ধান্ত নিই যে 'কন্ডাকশান সিস্টেম পেসিং' বা সিএসপি পদ্ধতি ব্যবহার করব এই রোগীর ক্ষেত্রে। ডানদিকে হার্ট আছে, এরকম কোনও ব্যক্তির পেসমেকার বসানোর জন্য আজ অবধি সিএসপি ব্যবহার করা হয়নি বিশ্বে।"
ডাক্তারবাবুর ব্যাখ্যা, এই কন্ডাকশান সিস্টেম পেসিং বা সিএসপি ব্যবহার করে, হৃদপিণ্ডের স্বাভাবিক যে কাজের ছন্দ, সেটাই ধরে রাখার চেষ্টা করা হয় পেসমেকার যন্ত্রের মাধ্যমে। সাধারণ পদ্ধতিতে পেসমেকার বসালে যেখানে ২০ শতাংশ রোগীর ক্ষেত্রে হার্টের কার্যক্ষমতা কমে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকে, সিএসপি-তে তা হয় না।
অস্ত্রোপচারের মাস দুয়েক পরে একেবারে সুস্থ হয়ে উঠেছেন রেজাউল। এতদিন ধরে ভেলোর থেকে কলকাতা, সব জায়গাতেই বাবার চিকিৎসার সময়ে পাশে থেকেছেন রেজাউলের মেয়ে মোনালিসা ইয়াসমিন। তিনি বলেন, 'ডাক্তাররা বাবাকে প্রথমে বলেননি যে ওঁর হার্ট ডানদিকে রয়েছে আর এত বিরল একটা অপারেশন করতে হবে। প্রায় তিন ঘণ্টা লেগেছিল অপারেশন করতে। বাবা পরে সব কিছু জানতে পেরেছেন।'
১৬৪৩ সালে চিকিৎসক মার্কো সেভেরিনো প্রথম ডেক্সট্রোকার্ডিয়া চিহ্নিত করেছিলেন। তবে তার শ'তিনেক বছর পরে ব্যোমকেশ বক্সীর কাহিনিকার শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘শজারুর কাঁটা’ উপন্যাসের মাধ্যমেই তা আমবাঙালির কাছে পৌঁছয়। হৃদপিণ্ডে শজারুর কাঁটা বিঁধিয়ে তিনজনকে খুন করার পরে, চতুর্থ ব্যক্তিকে মারতে গিয়ে খুনি ব্যর্থ হয়, কারণ তাঁর হৃদপিণ্ড ছিল বুকের ডানদিকে। সেটা জানা ছিল না খুনির। এরপরে গোয়েন্দা ব্যোমকেশ বক্সীর পাতা ফাঁদে পা দিয়ে ধরা পড়ে খুনি।