Date : 14th Apr, 2026 | Call 1800 452 567 | info@thewall.in
IPL 2026: পয়লা ওভারেই ৩ উইকেট, স্বপ্নের আইপিএল অভিষেক! কে এই প্রফুল্ল হিঙ্গে?ইরান-মার্কিন বৈঠক ব্যর্থ নেতানিয়াহুর ফোনে! ট্রাম্পের প্রতিনিধিকে কী এমন বলেছিলেন, খোলসা করলেন নিজেইWeather: পয়লা বৈশাখে ঘামঝরা আবহাওয়া! দক্ষিণবঙ্গে তাপপ্রবাহের হলুদ সতর্কতা, আবার কবে বৃষ্টি?হরমুজ ঘিরে ফেলল মার্কিন সেনা! ইরানের 'শ্বাসরোধ' করতে ঝুঁকির মুখে আমেরিকাও, চাপে বিশ্ব অর্থনীতি'ভয় দেখিয়ে মুখ বন্ধ করা যাবে না', আইপ্যাক ডিরেক্টরের গ্রেফতারিতে বিজেপিকে হুঁশিয়ারি অভিষেকেরভোটের মুখে ইডির বড় পদক্ষেপ! কয়লা পাচার মামলায় গ্রেফতার আইপ্যাক ডিরেক্টর ভিনেশ চান্ডেলমহাকাশে হবে ক্যানসারের চিকিৎসা! ল্যাবের সরঞ্জাম নিয়ে পাড়ি দিল নাসার ‘সিগনাস এক্সএল’সঞ্জু-রোহিতদের পেছনে ফেলে শীর্ষে অভিষেক! রেকর্ড গড়েও কেন মন খারাপ হায়দ্রাবাদ শিবিরের?আইপিএল ২০২৬-এর সূচিতে হঠাৎ বদল! নির্বাচনের কারণে এই ম্যাচের ভেন্যু বদলে দিল বিসিসিআইWest Bengal Election 2026 | হার-জিত ভাবিনা, তামান্না তো ফিরবেনা!

টানা ৩৬ ঘণ্টার অস্ত্রোপচার, খুলির ভিতর থেকে টিউমার অপসারণ— একসঙ্গে ৪ অপারেশনে জীবন ফিরে পেলেন রোগী

গত ৯ ডিসেম্বর সকালে শুরু হয় সেই দীর্ঘ ৩৬ ঘণ্টার অস্ত্রোপচার। লক্ষ্য ছিল রোগীর শুধু টিউমার অপসারণ নয়, মুখের কার্যকারিতা ফিরিয়ে আনা এবং একটি ইমপ্লান্টের মাধ্যমে হারানো শ্রবণশক্তি পুনরুদ্ধার করা। ডা. সম্পৎ চন্দ্র প্রসাদ রাও-এর নেতৃত্বে চিকিৎসকদের দল এই জটিল অপারেশন সম্পন্ন করেন। মস্তিষ্ক ও খুলির অংশ খুলে অপারেশন করায় মুখ বিকৃত হওয়ার আশঙ্কাও ছিল।

টানা ৩৬ ঘণ্টার অস্ত্রোপচার, খুলির ভিতর থেকে টিউমার অপসারণ— একসঙ্গে ৪ অপারেশনে জীবন ফিরে পেলেন রোগী

জটিল অপারেশনে সাফল্য

জিনিয়া সরকার

শেষ আপডেট: 28 March 2026 19:15

দ্য ওয়াল ব্যুরো: টানা ৩৬ ঘণ্টার ম্যারাথন অস্ত্রোপচার। কলকাতার বাসিন্দা, ৪৮ বছর বয়সী দীপাঞ্জন বাবুর খুলির গভীরে ছিল ৬ সেন্টিমিটারের একটি টিউমার। সেটা বাদ দেওয়ার সঙ্গে একযোগে মুখের স্নায়ুর কার্যকারিতা ও শ্রবণশক্তি পুনরুদ্ধারের চেষ্টা করা হয় — চিকিৎসাবিজ্ঞানের নিরিখে যা অত্যন্ত জটিল এবং বিরল। সেই অসম্ভবকেই সম্ভব করলেন বেঙ্গালুরু মণিপাল হাসপাতাল (Manipal Hospitals)-এর চিকিৎসকরা।

গত ৯ ডিসেম্বর সকালে শুরু হয় সেই দীর্ঘ ৩৬ ঘণ্টার অস্ত্রোপচার। লক্ষ্য ছিল রোগীর শুধু টিউমার অপসারণ নয়, মুখের কার্যকারিতা ফিরিয়ে আনা এবং একটি ইমপ্লান্টের মাধ্যমে হারানো শ্রবণশক্তি পুনরুদ্ধার করা।  হাসপাতালের স্কাল বেস সার্জন   ডা. সম্পৎ চন্দ্র প্রসাদ রাও-এর নেতৃত্বে চিকিৎসকদের দল— নিউরোসার্জন ডা. সাথউইক আর শেট্টি, প্লাস্টিক ও রিকনস্ট্রাকটিভ সার্জন ডা. শ্রীকান্ত ভি, ডা. ময়ূর শেট্টি, অ্যানেস্থেসিয়োলজিস্ট ডা. এইচ এস মূর্তি, ডা. জলজা কে আর এবং ইএনটি সার্জন ডা. নিবেদিতা দামোধরন— একসঙ্গে এই জটিল অপারেশন সম্পন্ন করেন। মস্তিষ্ক ও খুলির অংশ খুলে অপারেশন করায় মুখ বিকৃত হওয়ার আশঙ্কাও ছিল।

ডা. সম্পৎ জানান, “দীপাঞ্জনের মেনিনজিওমা (meningioma) বা টিউমারটি খুলির গভীরে ছিল এবং এটি আমার দেখা সবচেয়ে বড় টিউমারগুলির একটি। এর অবস্থান ও আকারের জন্য ট্রান্সটেম্পোরাল স্কাল বেস অ্যাপ্রোচ ব্যবহার করা হয়, যাতে কানের পিছন দিয়ে নিরাপদভাবে টিউমারের কাছে পৌঁছনো যায়। টিউমারটি রক্তনালীবহুল এবং শক্ত প্রকৃতির ছিল, পাশাপাশি ব্রেনস্টেমের সঙ্গে লেগে থাকায় অপসারণ অত্যন্ত কঠিন ছিল। তবুও সফলভাবে এটিকে বের করা সম্ভব হয়েছে।"

অন্যদিকে, টিউমারের জন্য সম্ভাব্য মুখের বিকৃতি সংশোধনের জন্য আগে থেকেই পরিকল্পনা করা হয়েছিল। প্রয়োজনে রিকনস্ট্রাকটিভ সার্জারির মাধ্যমে মুখের স্বাভাবিক অভিব্যক্তি ফিরিয়ে আনা সম্ভব। ডা. শ্রীকান্ত ব্যাখ্যা করেন, “ক্রস-ফেসিয়াল গ্রাফটের মাধ্যমে মুখের যে দিকটি স্বাভাবিক ছিল, সেই দিকের স্নায়ু ব্যবহার করে ক্ষতিগ্রস্ত দিককে পুনরুজ্জীবিত করা হয়। অত্যন্ত ধৈর্য ধরে এই জটিল কাজটি করতে হয়েছে এবং তা সফলভাবেই করা সম্ভব হয়েছে। তাই রোগী এখন স্বাভাবিক জীবনযাপন করছেন।”

যেহেতু প্রায় দু’দিন ধরে অপারেশনটি করতে হয়েছে, তাই ৩৬ ঘণ্টা ধরে রোগীকে অ্যানাস্থেশিয়া দিয়ে স্থিতিশীল রাখাটাও ছিল বড় চ্যালেঞ্জ। হাসপাতালের অ্যানেস্থেশিয়া টিমের সহায়তায় পুরো বিষয়টাই সুষ্ঠভাবে করা সম্ভব হয়েছে।

কী হয়েছিল রোগীর?

কোর্টরুমে তুখোড় সওয়াল থেকে শুরু করে জটিল আইনি পরামর্শ— আইনজীবী দীপাঞ্জন ভট্টাচার্য সংবেদনশীল ও উচ্চঝুঁকিপূর্ণ মামলার দায়িত্ব সামলাতে সামলাতে ব্যস্ততার সঙ্গে দিন কাটছিল। সবকিছু ঠিকঠাকই চলছিল, হঠাৎই সেই ছন্দে ছেদ পড়ে।

২০১৮ সালের দিকে প্রথম তিনি ডান কানে শ্রবণশক্তি কমে যাওয়ার সমস্যা টের পান। কলকাতায় অডিওমেট্রি ও ইএনটি বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেন। তাঁকে একটি উন্নত মানের হিয়ারিং এইড ব্যবহারের পরামর্শ দেওয়া হয়। কিন্তু সেই সময় কোনও এমআরআই বা স্নায়বিক পরীক্ষা করার কথা বলা হয়নি। চিকিৎসকদের আশ্বাসে এবং তেমন কোনও গুরুতর উপসর্গ না থাকায় তিনি স্বাভাবিক জীবনযাপন চালিয়ে যেতে থাকেন।

শারীরিকভাবে অত্যন্ত ফিট এবং শৃঙ্খলাবদ্ধ জীবনযাপনে অভ্যস্ত দীপাঞ্জন নিয়মিত জিম করতেন। কিন্তু ধীরে ধীরে সামনে ঝুঁকলে মাথা ধরার মতো ব্যথা শুরু হয়। এমনকি তীব্র ওয়ার্কআউটের সময় দু’বার প্রায় অজ্ঞান হয়ে যাওয়ার পরিস্থিতিও তৈরি হয়। দীর্ঘ সময় ধরে কাজ করে যাওয়া এবং পর্যাপ্ত বিশ্রামের অভাবের কারণে এই উপসর্গগুলিকে প্রথমে ক্লান্তি বা মানসিক চাপ বলেই ধরে নেওয়া হয়।

২০২৩ সালে একটি সাধারণ সামাজিক আড্ডার সময় এক চিকিৎসক সতর্কতামূলকভাবে তাঁকে স্নায়বিক পরীক্ষা করানোর পরামর্শ দেন। সেই পরামর্শ মেনে এমআরআই করাতেই ধরা পড়ে মস্তিষ্কে টিউমারের উপস্থিতি। পরবর্তী সিটি স্ক্যানসহ অন্যান্য পরীক্ষায় তেমন নতুন কিছু ধরা না পড়লেও, এই রিপোর্ট তাঁর এবং তাঁর পরিবারের কাছে বড় ধাক্কা ছিল।

এরপর একাধিক নিউরোসার্জনের পরামর্শ নিয়ে ২০২৩ সালের জুলাই মাসে মুম্বইয়ের একটি হাসপাতালে জরুরি অস্ত্রোপচার করান দীপাঞ্জন। অপারেশনের সময় দেখা যায় টিউমারটি অত্যন্ত ক্যালসিফায়েড, ফলে সম্পূর্ণ অপসারণ ঝুঁকিপূর্ণ। তাই মাত্র ১৫-২০ শতাংশ টিউমারই সরানো সম্ভব হয়। অস্ত্রোপচারের পর ধীরে ধীরে সুস্থ হয়ে ওঠেন তিনি এবং শারীরিক সক্ষমতাও ফিরে পান। ২০২৫ সালের অগস্ট নাগাদ প্রায় স্বাভাবিক জীবনে ফিরেছিলেন তিনি।

কিন্তু তার কিছু সপ্তাহ পরই নতুন করে সমস্যা দেখা দিতে শুরু করে। তীব্র মাথা ঘোরা, ঝাপসা দৃষ্টি, বমিভাব— এই উপসর্গগুলি ক্রমশ বাড়তে থাকে। ডান কানে শ্রবণশক্তি পুরোপুরি হারান তিনি। লক্ষণগুলি ধীরে ধীরে বাড়তে থাকে এবং বিশেষ করে ‘সাউন্ড হিলিং’ সেশনের পর তা আরও তীব্র হচ্ছিল বলে মনে হয়। দ্রুত তাঁকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। একাধিক পরীক্ষায় দেখা যায়, তাঁর মস্তিষ্কে সেরিব্রাল ইডিমা বেড়ে গেছে। এক মাস স্টেরয়েড চিকিৎসার পর পরিস্থিতি কিছুটা নিয়ন্ত্রণে এলেও কানে গুঞ্জন ও শ্রবণ সমস্যা থেকেই যায়। কলকাতায় পুনরায় পরীক্ষা করানো হলে চোখ ও অপটিক নার্ভের বিশদ পরীক্ষা করার পরামর্শ দেওয়া হয়, যা কিছুটা উদ্বেগের কারণ হয়ে ওঠে।

এরপর ধীরে ধীরে ডান দিকের মুখের স্নায়ু দুর্বল হতে শুরু করে। এমনকি তিনি পেন ধরে লিখতেও পারছিলেন না, অর্থাৎ ডান হাতের মোটর ফাংশনও দুর্বল হয়ে পড়ে। তারপর রোগীর পরিবারের সদস্যরা মণিপাল হাসপাতালের স্কাল বেস সার্জারির প্রোগ্রাম লিড ডা. সম্পৎ চন্দ্রর সঙ্গে যোগাযোগ করেন। আশার আলো নিয়েই দীপাঞ্জন ও তাঁর স্ত্রী বেঙ্গালুরুতে যান। ডা. সম্পৎ তাঁদের আশ্বস্ত করেন এবং দ্বিতীয় অস্ত্রোপচারের পরামর্শ দেন। প্রথমে কিছুটা দ্বিধা থাকলেও শেষ পর্যন্ত তাঁরা রাজি হন।

১০ ডিসেম্বর সন্ধ্যায় অস্ত্রোপচার সফলভাবে শেষ হয়। অপারেশনের পাঁচ দিন পর থেকে কথা বলার ক্ষমতা ফিরে পান রোগী। আর আজ সবকিছু আগের মতো, স্বাভাবিকভাবে জীবন কাটাচ্ছেন। 

দীপাঞ্জন জানান, এই জটিল টিউমারের চিকিৎসার জন্য তিনি দেশের একাধিক হাসপাতালে গিয়েছেন, এমনকি বিদেশেও চিকিৎসকদের পরামর্শ নিয়েছেন। কিন্তু প্রায় সকলেই অস্ত্রোপচারের ঝুঁকির কথাই জানিয়ে নিরুৎসাহিত করেছিলেন। “মণিপাল হাসপাতালের ডা. সম্পৎ যেভাবে আমাদের আশ্বস্ত করেছিলেন, তাতেই আমরা শেষ পর্যন্ত রাজি হই। উনি আমাদের কাছে ভগবানের মতোই মনে হয়েছে। ওনার জন্যই আজ এই দিনটা দেখতে পাচ্ছি,” বলেন তিনি।

বর্তমানে রোগী অনেকটাই সুস্থ। একসঙ্গে প্রায় ৬ সেন্টিমিটার টিউমার অপসারণ, মুখের স্নায়ুর কার্যকারিতা বজায় রাখা এবং শ্রবণশক্তি ফিরিয়ে আনার চেষ্টা— এই সাফল্য বিশ্বে খুব কম চিকিৎসা কেন্দ্রেই দেখা যায়। টানা ৩৬ ঘণ্টার এই অস্ত্রোপচার তাই শুধু একটি চিকিৎসা সাফল্য নয়, বরং একসঙ্গে একাধিক জটিল অপারেশন করেও রোগীকে সুস্থ করে তোলা সম্ভব— সেই কথাই প্রমাণ করল এই ঘটনা। পাশাপাশি, এ ধরনের উচ্চমানের জটিল অস্ত্রোপচার এদেশেই সফলভাবে করা সম্ভব— তারও এক অনন্য দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে এই সাফল্য।


```