রোগীর পরিবার সূত্রে জানা গিয়েছে, তাঁর যখন বয়স মাত্র ১৫, তখনই মাথায় ছোট্ট একটি মাংসপিণ্ড দেখা দিয়েছিল। ধীরে ধীরে তা বাড়তে বাড়তে পেল্লায় আকার নেয়। গত ৪৫ বছর ধরে স্থানীয় হাতুড়ে চিকিৎসক থেকে শুরু করে বহু জায়গায় গিয়েও সুরাহা হয়নি। শেষমেশ তিনি হাজির হন এম আর বাঙুর হাসপাতালে।

এমআর বাঙুরে সফল অস্ত্রোপচার
শেষ আপডেট: 27 March 2026 14:12
মাথার বাঁদিকে অস্বাভাবিক এক ফোলা—দেখলে মনে হতে পারে যেন বিশাল কোনও ফোঁড়া। কিন্তু বাস্তবে সেটি ছিল প্রায় ১০ কেজি ওজনের এক বিরাট টিউমার। দীর্ঘ ৪৫ বছর ধরে এই যন্ত্রণা বয়ে বেড়াচ্ছিলেন দক্ষিণ ২৪ পরগনার মগরাহাটের হরিশঙ্করপুরের বাসিন্দা, ৬০ বছরের তপনবাবু। অবশেষে দক্ষিণ ২৪ পরগনার এম আর বাঙুর হাসপাতাল-এ এক জটিল অথচ সফল অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে মুক্তি মিলল তাঁর।
এই ঘটনা আবারও প্রমাণ করল — জেলা হাসপাতালেও এখন জটিল অপারেশন দক্ষতার সঙ্গে করা সম্ভব।
কী ঘটেছিল রোগীর সঙ্গে?
রোগীর পরিবার সূত্রে জানা গিয়েছে, তাঁর যখন বয়স মাত্র ১৫, তখনই মাথায় ছোট্ট একটি মাংসপিণ্ড দেখা দিয়েছিল। ধীরে ধীরে তা বাড়তে বাড়তে পেল্লায় আকার নেয়। গত ৪৫ বছর ধরে স্থানীয় হাতুড়ে চিকিৎসক থেকে শুরু করে বহু জায়গায় গিয়েও সুরাহা হয়নি। শেষমেশ তিনি হাজির হন এম আর বাঙুর হাসপাতালে।
গত ৩-৪ বছরে তাঁর শারীরিক অবস্থা দ্রুত খারাপ হতে শুরু করে। মাথার ভার এতটাই বেড়ে যায় যে স্বাভাবিকভাবে চলাফেরা করাও কঠিন হয়ে ওঠে। সঙ্গে যুক্ত হয় একাধিক উপসর্গ—তীব্র মাথাব্যথা, বারবার মাথা ঘোরা, দৃষ্টিশক্তি কমে যাওয়া, বমি বমি ভাব ও ঘুমের সমস্যা। দৈনন্দিন জীবন কার্যত দুর্বিষহ হয়ে ওঠে। অবশেষে পরিবারের উদ্যোগে তিনি পৌঁছন এম আর বাঙুর হাসপাতালে।
কী ধরনের টিউমার?
চিকিৎসকদের ভাষায়, এটি ছিল একটি এসওএল (SOL - Space Occupying Lesion)। অর্থাৎ শরীরের কোনও অংশে অস্বাভাবিকভাবে জায়গা দখল করে থাকা টিউমার। এই বিশেষ ক্ষেত্রে টিউমারটি মাথার খুলির ভিতরে নয়, বরং বাইরে অবস্থান করছিল। তবে সেটি আকারে এতটাই বড় হয়ে গিয়েছিল যে তা রোগীর স্বাভাবিক জীবনযাত্রাকে মারাত্মকভাবে প্রভাবিত করছিল। ঝুঁকি কম ছিল না—কারণ অপারেশনের সময় অতিরিক্ত রক্তপাত বা সংক্রমণের আশঙ্কা ছিল যথেষ্ট।

কীভাবে হল অস্ত্রোপচার?
হাসপাতালের সার্জারি বিভাগের প্রধান ডা. নিলয় নারায়ণ সরকার-এর নেতৃত্বে এই জটিল অস্ত্রোপচার সম্পন্ন হয়। তাঁর কথায়, অপারেশনের আগে প্রায় এক মাস ধরে রোগীর সমস্ত প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা হয়—রক্তপরীক্ষা, ইমেজিং, শারীরিক সক্ষমতা যাচাই—সবকিছু খতিয়ে দেখে তবেই অস্ত্রোপচারের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। অবশেষে নির্ধারিত দিনে প্রায় ১ ঘণ্টা ২০ মিনিট ধরে চলে অস্ত্রোপচার। দক্ষতার সঙ্গে সম্পূর্ণ টিউমারটি অপসারণ করা হয়। সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বিষয়, এত বড় টিউমার কাটা সত্ত্বেও রক্তপাত ছিল অত্যন্ত কম। এর জন্য ব্যবহার করা হয় আধুনিক ‘ডায়াথার্মি’ (Diathermy) প্রযুক্তি, যা অস্ত্রোপচারের সময় রক্তক্ষরণ নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করে। অপারেশনের পর রোগীকে পর্যবেক্ষণে রাখা হয়। বর্তমানে তিনি স্থিতিশীল এবং ভাল আছেন।
হাসপাতালের সুপার ডা. শিশির নস্কর জানান, এই ধরনের জটিল অস্ত্রোপচার এখন আর শুধুমাত্র বেসরকারি হাসপাতাল বা বড় শহরের মেডিক্যাল কলেজগুলির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। তাঁর কথায়,"জেলার হাসপাতালগুলিতেও এখন আধুনিক চিকিৎসা পরিকাঠামো এবং দক্ষ চিকিৎসক রয়েছেন। তাই মানুষকে আর অযথা ভয় পেতে হবে না। আর হাসপাতালে জটিল সমস্যা নিয়ে এলে রেফার করারও প্রয়োজন নেই। সময়মতো এলে জেলা হাসপাতালেই এখন অনেক জটিল সমস্যারই সমাধান সম্ভব।" এই গুরুত্বপূর্ণ অস্ত্রোপচারে ডা. নিলয় সরকারের সঙ্গে সহকারী হিসেবে ছিলেন ডা. অনুভব সাহা ও অন্যরা। সবার সমন্বিত প্রচেষ্টাতেই এই কঠিন অস্ত্রোপচার সফল হয়েছে।
টিউমারটি অপসারণের পর তা বায়োপসির জন্য পাঠানো হয়েছে। এটি বিনাইন (সৌম্য) না ম্যালিগন্যান্ট (ক্যানসারজনিত), তা রিপোর্ট এলে নিশ্চিতভাবে জানা যাবে। সেই অনুযায়ী পরবর্তী চিকিৎসার পরিকল্পনা করা হবে।