দেখা যায়, তাঁর পেটে জল জমেছে এবং শরীরে অন্য সমস্যাও রয়েছে। প্রথমে চিকিৎসকদের সন্দেহ ছিল, স্তন ক্যানসার হয়তো ছড়িয়ে পড়েছে। কিন্তু বিস্তারিত পরীক্ষা-নিরীক্ষা করতে গিয়ে মাত্র দুই সপ্তাহের মধ্যেই ধরা পড়ে—তাঁর ওভারিতেও ক্যানসার রয়েছে। অর্থাৎ, শরীরে একসঙ্গে দুটি আলাদা ক্যানসার বাসা বেঁধেছে। স্তন ক্যানসার দ্বিতীয় পর্যায়ে এবং ওভারিয়ান ক্যানসার তৃতীয় পর্যায়ে ছিল।

শেষ আপডেট: 28 March 2026 15:46
বেঁচে থাকাটা সত্যিই কখনও কখনও রূপকথার মতো মনে হয়। কারও একটি ছোট ক্যানসার ধরা পড়লেও তাকে বাঁচানো যায় না, আবার অন্যদিকে একসঙ্গে দুটি ক্যানসার ধরা পড়ার পরও কেউ পাঁচ বছর পরে দিব্যি সুস্থভাবে স্বাভাবিক জীবন কাটাচ্ছেন। শুনতে অবিশ্বাস্য লাগলেও এমন ঘটনাই সামনে এসেছে। ৬৭ বছরের শিখা ঘোষের অদম্য মানসিক শক্তি ও সঠিক চিকিৎসার কাছে হার মেনেছে দুটি ক্যানসার। ঘটনাটি সরোজ গুপ্ত ক্যানসার সেন্টার এন্ড রিসার্চ ইনস্টিটিউট-এর।
কী হয়েছিল রোগীর?
আজ থেকে পাঁচ বছর আগে শিখা দেবী চিকিৎসার জন্য ওই হাসপাতালে আসেন। প্রথমে তাঁর স্তনে একটি ছোট টিউমার ধরা পড়ে। তবে চিকিৎসকরা যখন বিষয়টি খতিয়ে দেখতে শুরু করেন, তখন আরও জটিল সমস্যা সামনে আসে। দেখা যায়, তাঁর পেটে জল জমেছে এবং শরীরে অন্য সমস্যাও রয়েছে। প্রথমে চিকিৎসকদের সন্দেহ ছিল, স্তন ক্যানসার হয়তো ছড়িয়ে পড়েছে। কিন্তু বিস্তারিত পরীক্ষা-নিরীক্ষা করতে গিয়ে মাত্র দুই সপ্তাহের মধ্যেই ধরা পড়ে—তাঁর ওভারিতেও ক্যানসার রয়েছে। অর্থাৎ, শরীরে একসঙ্গে দুটি আলাদা ক্যানসার বাসা বেঁধেছে। স্তন ক্যানসার দ্বিতীয় পর্যায়ে এবং ওভারিয়ান ক্যানসার তৃতীয় পর্যায়ে ছিল।
রোগীর এই জটিল অবস্থার পিছনে জেনেটিক কারণ থাকতে পারে বলে সন্দেহ করেন চিকিৎসকরা। হাসপাতালের কর্ণধার ও অঙ্কোসার্জন ডা. অর্ণব গুপ্ত জানান, রোগীর পারিবারিক ইতিহাস খতিয়ে দেখতেই সামনে আসে একাধিক তথ্য। রোগীর মায়ের ৫৫ বছর বয়সে ইসোফেজিয়াল ক্যানসার ধরা পড়ে এবং ৬৫ বছরে তাঁর মৃত্যু হয়। তাঁর কাকিমার ৫০ বছর বয়সে স্তন ক্যানসার ধরা পড়ে, তিনিও ৬৫ বছরে মারা যান। বাবার পরিবারের দিকেও দুই বোনের ৫০ বছর বয়সে স্তন ক্যানসার ধরা পড়ে এবং তিন বছরের মধ্যে তাঁদের মৃত্যু হয়। এই সমস্ত তথ্য বিশ্লেষণ করে চিকিৎসকরা নিশ্চিত হন যে রোগী হেরিডিটারি ব্রেস্ট অ্যান্ড ওভারি ক্যানসার সিনড্রোম (HBOC Syndrome)-এ ভুগছেন, যা নির্দিষ্ট জিনের মিউটেশনের ফলে বংশগতভাবে ছড়িয়ে পড়ে এবং স্তন, ওভারি, প্যানক্রিয়াস ও প্রোস্টেট ক্যানসারের ঝুঁকি বাড়ায়।
চিকিৎসার ধাপে ধাপে লড়াই
রোগ নির্ণয়ের পর শুরু হয় দীর্ঘ চিকিৎসা প্রক্রিয়া। প্রথমে তাঁকে তিন দফা কেমোথেরাপি দেওয়া হয়। এরপর করা হয় স্তনের অস্ত্রোপচার। ম্যাসটেকটমি করে ডান স্তনে টিউমার থাকলেও দুটি স্তনই বাদ দেওয়া হয়, কারণ রোগীর শরীরে BRCA2 জিন পজিটিভ থাকায় অন্য স্তনেও ভবিষ্যতে ক্যানসার হওয়ার প্রায় ৪৫ শতাংশ ঝুঁকি ছিল। চিকিৎসকদের মতে, এই পরিস্থিতি অনেকটাই অভিনেত্রী অ্যাঞ্জেলিনা জোলি-র ঘটনার সঙ্গে তুলনীয়, যদিও তাঁর ক্ষেত্রে BRCA1 মিউটেশন ছিল।
চিকিৎসকদের টিমে ছিলেন গাইনোসার্জন ডা. এনআর মণ্ডল। তিনি জানান, অস্ত্রোপচারের পর আবার তিন দফা কেমোথেরাপি দেওয়া হয় রোগীর। কিছুটা সুস্থ হওয়ার পর ম্যাসটেকটমির তিন মাসের মাথায় তাঁর জরায়ু, ডিম্বাশয় এবং আক্রান্ত টিস্যু সম্পূর্ণ অপসারণ করা হয়। একের পর এক কেমোথেরাপি এবং পরপর দুটি বড় অস্ত্রোপচার—যেখানে প্রতিটি মুহূর্তেই ঝুঁকি ছিল প্রবল। এর সঙ্গে ছিল ডায়াবেটিস ও থাইরয়েডের সমস্যা। তবুও মানসিক জোর ও চিকিৎসকদের দক্ষতায় এই কঠিন লড়াইয়ে জয়ী হয়েছেন তিনি।

রোগীর কথা
এক বিশেষ সাংবাদিক বৈঠকে শিখা দেবী জানান, তিনি এখন সম্পূর্ণ সুস্থ আছেন এবং শুধুমাত্র টার্গেটেড থেরাপির মাধ্যমে ভাল রয়েছেন। পাঁচ বছর আগে যে পরিস্থিতির মধ্যে দিয়ে গিয়েছিলেন, তখন তিনি ভাবতেও পারেননি যে আবার স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারবেন। তাঁর কথায়, হাসপাতালের পরিবেশ, চিকিৎসকদের ব্যবহার এবং রোগীর সঙ্গে তাদের সম্পর্কই তাঁকে মানসিক শক্তি জুগিয়েছে। বিশেষ করে ডা. গুপ্ত ও তাঁর টিমের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়ে তিনি বলেন, তাঁর কাছে তাঁরা ভগবানের মতো।
চিকিৎসকদের মতে, এই ধরনের জিনগত ক্যানসারের ক্ষেত্রে জেনেটিক টেস্ট অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেয়। গত বছরের ফেব্রুয়ারি মাস থেকে এই হাসপাতালেও জেনেটিক ক্লিনিক চালু হয়েছে। এখনও পর্যন্ত প্রায় ১৫০ জন সন্দেহভাজন রোগীর পরীক্ষা করা হয়েছে, যার মধ্যে ৪৬ জনের ক্ষেত্রে হেরিডিটারি ক্যানসার ধরা পড়েছে। তাই পরিবারে ক্যানসারের ইতিহাস থাকলে সচেতন হওয়া এবং প্রয়োজনীয় জেনেটিক কাউন্সেলিং ও পরীক্ষা করানো জরুরি বলে জানান সার্জিক্যাল অঙ্কোলজিস্ট ডা. সমীর ভট্টাচার্য।
চিকিৎসকদের বক্তব্য, উন্নত পর্যায়ের ক্যানসার হলেও সময়মতো নির্ণয়, সঠিক ও সমন্বিত চিকিৎসা এবং নিয়মিত পর্যবেক্ষণ থাকলে সুস্থ হয়ে ওঠা সম্ভব। এই ঘটনা শুধু একজন রোগীর সাফল্যের গল্প নয়, বরং এটাই প্রমান করে, সঠিক চিকিৎসা ও অদম্য মানসিক শক্তি থাকলে ক্যানসারের বিরুদ্ধেও জয় সম্ভব।