ভারতের মতো বিপুল জনসংখ্যার দেশে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই এই রোগ ধরা পড়ে একেবারে শেষ পর্যায়ে, যখন চিকিৎসা করা অত্যন্ত কঠিন হয়ে দাঁড়ায়। এ রাজ্যের চিত্রটাও তাই। অথচ এই ক্যানসার শরীরে বাসা বাঁধে অত্যন্ত ধীরগতিতে। সংক্রমণের শুরু থেকে ক্যানসার হওয়া পর্যন্ত যে দীর্ঘ সময় পাওয়া যায়, সেই সুযোগটাই আমাদের কাজে লাগাতে হবে। দরকার সচেতনতা বাড়ানো।

জরায়ুমুখের ক্যানসার প্রতিহত করতে করণীয় কী?
শেষ আপডেট: 20 March 2026 16:44
ভারতে নারী স্বাস্থ্যের অন্যতম বড় কাঁটা জরায়ুমুখের ক্যানসার বা সার্ভাইক্যাল ক্যানসার (cervical cancer)। ইন্ডিয়ান কাউন্সিল অফ মেডিক্যাল রিসার্চ (ICMR)-এর পরিসংখ্যান শিউরে ওঠার মতো—ভারতে প্রতি ৮ মিনিটে জরায়ুমুখের ক্যানসারে আক্রান্ত হয়ে এক জন মহিলার মৃত্যু হয়। অথচ,সঠিক সময়ে সচেতন হলে এই মারণ রোগ প্রায় ১০০ শতাংশ প্রতিরোধ করা সম্ভব।
ভারতের মতো বিপুল জনসংখ্যার দেশে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই এই রোগ ধরা পড়ে একেবারে শেষ পর্যায়ে, যখন চিকিৎসা করা অত্যন্ত কঠিন হয়ে দাঁড়ায়। এ রাজ্যের চিত্রটাও তাই। অথচ এই ক্যানসার শরীরে বাসা বাঁধে অত্যন্ত ধীরগতিতে। সংক্রমণের শুরু থেকে ক্যানসার হওয়া পর্যন্ত যে দীর্ঘ সময় পাওয়া যায়, সেই সুযোগটাই আমাদের কাজে লাগাতে হবে। দরকার সচেতনতা বাড়ানো।
সম্প্রতি এই মারণ রোগ নির্মূল করতে বড়সড় পদক্ষেপ নিয়েছে কেন্দ্রীয় সরকার। দেশজুড়ে ১৪ বছর বয়সি কিশোরীদের জন্য হিউম্যান প্যাপিলোমাভাইরাস (HPV) টিকাকরণ কর্মসূচি শুরু হয়েছে। এছাড়াও আরও কয়েকটি বিষয়ে সতর্ক থাকা খুব দরকার, তবেই জরায়ুমুখের ক্যানসার প্রতিহত করা সম্ভব।
কীভাবে রুখবেন এই মারণ রোগ? জেনে নিন ৫টি গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শ:
১. মূল কারণ রুখতে এইচপিভি (HPV) টিকাকরণ
জরায়ুমুখের ক্যানসারের প্রায় প্রতিটি ঘটনার নেপথ্যে থাকে হিউম্যান প্যাপিলোমা ভাইরাস বা এইচপিভি-র সংক্রমণ। স্কোয়ামাস সেল কার্সিনোমা বা জরায়ুমুখের ক্যানসারের প্রধান কারণ এই ভাইরাস।
এই ভাইরাস অত্যন্ত সাধারণ, তবে এর কিছু নির্দিষ্ট হাই-রিস্ক স্ট্রেন শরীরে বছরের পর বছর রয়ে গেলে তা ধীরে ধীরে জরায়ুর কোষের গঠন বদলে দেয়। টিকা নিলে এই ভয়ংকর স্ট্রেনগুলোকে রুখে দেওয়া সম্ভব। ৯ থেকে ১৪ বছর বয়সিদের মধ্যে এই টিকা নেওয়া সবচেয়ে কার্যকর। তবে ২৬ বছর বা তার বেশি বয়স পর্যন্তও এই টিকা নেওয়া যেতে পারে। এটি কোনও লাইফস্টাইল সংক্রান্ত বিষয় নয়, এটি সরাসরি ক্যানসার প্রতিরোধের অস্ত্র। এমনকি ত্রিশ ঊর্ধ্ব যাঁরা আনপ্রটেক্টেড সেক্স করেননি তাঁরাও অনায়াসে নিতে পারেন এই ভ্যাকসিন। কিছুটা হলেও কার্যকর হবে এই টিকা। তবে বয়ঃসন্ধিকালই (Before intercourse) এই টিকা নেওয়ার উপযুক্ত সময়।
২. কোনও উপসর্গ না থাকলেও স্ক্রিনিং জরুরি
সার্ভাইক্যাল ক্যানসারের সবচেয়ে ভয়ের জায়গা হল, এটি শুরুর দিকে কোনও আগাম সংকেত দেয় না। ব্যথা, রক্তপাত বা অন্য কোনও লক্ষণ ছাড়াই শরীরে এই রোগ থাবা বসাতে পারে।
তাই ত্রিশ বছর পেরলে তিনবছরে একবার প্যাপ স্মিয়ার (Pap smear) টেস্ট জরুরি: জরায়ুমুখের কোষের পরিবর্তন বুঝতে এই পরীক্ষা অত্যন্ত কার্যকর।
এইচপিভি ডিএনএ টেস্ট (পাঁচ বছরে একবার এই টেস্ট করা দরকার): ভাইরাসের উপস্থিতি নির্ণয় করতে এই পরীক্ষা করা হয়। বয়স ত্রিশ পেরলে করতে হবে। এই টেস্ট করালে আর প্যাপ স্মিয়ার করার দরকার নেই।
৩০ থেকে ৬৫ বছর বয়সি মহিলাদের নিয়মিত ব্যবধানে স্ক্রিনিং করানো উচিত। “সবই তো স্বাভাবিক আছে”—এই ভেবে স্ক্রিনিং এড়িয়ে যাওয়া বা দেরি করা বড় বিপদ ডেকে আনতে পারে। কেন্দ্রের ন্যাশনাল হেলথ মিশনের আওতায় এখন দেশের অনেক প্রান্তেই এই স্ক্রিনিংয়ের সুবিধা মিলছে। মনে রাখবেন, স্ক্রিনিং কোনও চিকিৎসা নয়, এটি রোগকে গোড়াতেই চিনে ফেলার এক কার্যকর কৌশল।
৩. স্বাস্থ্যকর সহবাস
হিউম্যান প্যাপিলোমা ভাইরাস সাধারণত সহবাসের মাধ্যমে নারী শরীরে প্রবেশ করে। তাই স্বাস্থ্যকর মেলামেশা (কন্ডোমের ব্যবহার) অনেকাংশেক্ষেত্রেই এই ক্যানসারের ঝুঁকি কমায়। যদিও পুরোপুরি নিরাপদ নয়—এর পরেও ক্যানসারের সম্ভাবনা থেকে যায়।
বিশেষ করে যাদের একাধিক সঙ্গী রয়েছে তাঁদের ঝুঁকি বেশি। তাই নিরাপদ থাকতে একাধিক পার্টনার না রাখা ও খুব অল্প বয়সে সহবাস শুরু না করাই ভাল।
এদেশে যৌনতা নিয়ে সরাসরি কথা বলতেই অধিকাংশ মহিলা অস্বস্তি বোধ করেন। ফলে এই ধরনের সমস্যাগুলো সামনে আসে না। নীরবে বাড়তে থাকে জরায়ুমুখের ক্যানসার।
৪. মহিলাদের ধূমপান বর্জন
বর্তমানে পুরুষদের তুলনায় মহিলাদের মধ্যেও ধূমপান বাড়ছে। অতিরিক্ত ধূমপান শরীরের রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা দুর্বল করে। যা জরায়ুমুখের ক্যানসারের বিপদ বাড়ায় বহুগুণ। তামাক কোষের মিউটেশন ঘটায় দ্রুত।
যদি ইমিউনিটি দুর্বল হয়, তবে এইচপিভি ভাইরাস শরীরে দীর্ঘ সময় ধরে থেকে যায়। বারবার সংক্রমণ হয় এবং ক্যানসারের ঝুঁকি বাড়ে।
সাধারণত সঙ্গীর সঙ্গে সহবাস করার পর প্রায় ৯০ শতাংশক্ষেত্রে মহিলাদের শরীরে হিউম্যান প্যাপিলোমা ভাইরাস প্রবেশ করে। ইমিউনিটি ঠিক থাকলে আবার সেই ভাইরাস নিজে থেকেই বিনষ্ট হয়ে যায় ৯০ শতাংশক্ষেত্রে। কিন্তু যাঁদের একাধিক সঙ্গী, বারবার তাঁদের সঙ্গে সহবাস করেন তাঁদের ক্যানসারের ঝুঁকি বেশি। তাই ইমিউনিটি ঠিক রাখা ও একজনের সঙ্গে সহবাস করাই স্বাস্থ্যকর।
যে মহিলারা ধূমপান ছেড়ে দিয়েছেন, দেখা যায় তাঁদের ইমিউনিটি ধীরে ধীরে শক্তিশালী হয়। রাতারাতি কোনও কিছুর ঝুঁকি কমে না, তবে ধীরে ধীরে তা কমানো সম্ভব।
৫. প্রাথমিক লক্ষণে অবহেলা নয়
প্রতিরোধ ব্যবস্থা নিলে ক্যানসারের ঝুঁকি কমে। আর সচেতন হলে জীবন বাঁচে।
যে লক্ষণগুলো ভুলেও অবহেলা করবেন না—
১. মাসিক শেষ হওয়ার পর আবার ব্লিডিং
২. সঙ্গমের পর রক্তপাত
৩. মেনোপজের পর আবার ব্লিডিং হওয়া
৪. যোনিপথে দীর্ঘস্থায়ী দুর্গন্ধযুক্ত স্রাব
৫. দীর্ঘদিন তলপেটে ব্যথা
এই লক্ষণগুলো থাকলেও অনেক মহিলা এগুলোকে অবহেলা করেন এবং ডাক্তারের কাছে যান না। এই দেরি করে সচেতন হওয়াটাই সার্ভাইক্যাল ক্যানসারের অন্যতম কারণ।
যদি দ্রুত এই ক্যানসার ধরা পড়ে, তবে বর্তমানে আধুনিক চিকিৎসার মাধ্যমে এই রোগকে প্রতিহত করা সম্ভব। তাই কোনও লক্ষণ দেখলেই প্রথমেই চিকিৎসকের কাছে আসুন।