Date : 14th Apr, 2026 | Call 1800 452 567 | info@thewall.in
IPL 2026: পয়লা ওভারেই ৩ উইকেট, স্বপ্নের আইপিএল অভিষেক! কে এই প্রফুল্ল হিঙ্গে?ইরান-মার্কিন বৈঠক ব্যর্থ নেতানিয়াহুর ফোনে! ট্রাম্পের প্রতিনিধিকে কী এমন বলেছিলেন, খোলসা করলেন নিজেইWeather: পয়লা বৈশাখে ঘামঝরা আবহাওয়া! দক্ষিণবঙ্গে তাপপ্রবাহের হলুদ সতর্কতা, আবার কবে বৃষ্টি?হরমুজ ঘিরে ফেলল মার্কিন সেনা! ইরানের 'শ্বাসরোধ' করতে ঝুঁকির মুখে আমেরিকাও, চাপে বিশ্ব অর্থনীতি'ভয় দেখিয়ে মুখ বন্ধ করা যাবে না', আইপ্যাক ডিরেক্টরের গ্রেফতারিতে বিজেপিকে হুঁশিয়ারি অভিষেকেরভোটের মুখে ইডির বড় পদক্ষেপ! কয়লা পাচার মামলায় গ্রেফতার আইপ্যাক ডিরেক্টর ভিনেশ চান্ডেলমহাকাশে হবে ক্যানসারের চিকিৎসা! ল্যাবের সরঞ্জাম নিয়ে পাড়ি দিল নাসার ‘সিগনাস এক্সএল’সঞ্জু-রোহিতদের পেছনে ফেলে শীর্ষে অভিষেক! রেকর্ড গড়েও কেন মন খারাপ হায়দ্রাবাদ শিবিরের?আইপিএল ২০২৬-এর সূচিতে হঠাৎ বদল! নির্বাচনের কারণে এই ম্যাচের ভেন্যু বদলে দিল বিসিসিআইWest Bengal Election 2026 | হার-জিত ভাবিনা, তামান্না তো ফিরবেনা!

এইচপিভি টিকা: মহিলাদের জরায়ু মুখ ক্যান্সার নির্মূলের পথে এক বড় পদক্ষেপ

প্রথম প্রজন্মের এইচপিভি টিকাগুলি মূলত দুটি অত্যন্ত শক্তিশালী ও ক্ষতিকর ভাইরাসের স্ট্রেইন HPV 16 এবং HPV 18’-কে উদ্দেশ্য করে তৈরি করা হয়েছিল। বিশ্বজুড়ে জরায়ুমুখ ক্যান্সারের মোট ঘটনার ৭০ শতাংশের জন্যই এই দুটি স্ট্রেইন দায়ী, আর ভারতের ক্ষেত্রে এই হার ৮৫ শতাংশ। অস্ট্রেলিয়া ও যুক্তরাজ্যের মতো দেশগুলি, ২০০৭-০৮ সালে টিকাটি বাজারে আসার পরপরই তা গ্রহণ করেছিল, ইতিমধ্যেই ওই দেশগুলিতে প্রাক্‌-ক্যান্সারের পূর্বাবস্থা  এবং পূর্ণাঙ্গ ক্যান্সারের মতো ঘটনা উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে।

এইচপিভি টিকা: মহিলাদের জরায়ু মুখ ক্যান্সার নির্মূলের পথে এক বড় পদক্ষেপ

প্রতীকী ছবি।

শেষ আপডেট: 27 March 2026 17:29

নীরজা ভাটলা

২০০৮ সালে, অধ্যাপক হ্যারল্ড জুর হাউসেন তাঁর এক আবিষ্কারের জন্য নোবেল পুরস্কার পেয়েছিলেন; তাঁর সেই আবিষ্কারটি হচ্ছে, জরায়ু মুখের ক্যান্সারের জন্য দায়ী হ’ল - হিউম্যান প্যাপিলোমাভাইরাসের (এইচপিভি) স্ট্রেইন। জরায়ু মুখের ক্যান্সার বিশ্বজুড়ে অসুস্থতা ও মৃত্যুর একটি অন্যতম প্রধান কারণ, তবে নিম্ন ও নিম্ন-মধ্য আয়ের দেশগুলিতে এর প্রকোপ তুলনামূলকভাবে অনেক বেশি। তাঁর এই আবিষ্কার রোগ প্রতিরোধক টিকা তৈরির পাশাপাশি, এই সংক্রামক জীবাণু শনাক্তকরণের পরীক্ষার পদ্ধতি উদ্ভাবনের পথ প্রশস্ত করেছিল। এর এক দশক পর, ২০১৮ সালে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (হু) জরায়ু মুখের ক্যান্সার নির্মূলের লক্ষ্যে একটি উদ্যোগ ঘোষণা করে। পরবর্তীকালে ২০২০ সালের ১৭ নভেম্বর আনুষ্ঠানিকভাবে এই আন্তর্জাতিক কৌশলের সূচনা করা হয়, যা ভারত সহ মোট ১৯৪টি দেশের অনুমোদন লাভ করেছে। 

ক্যান্সার নির্মূলীকরণ! তবে যে কোনও ক্যান্সার নয়, একেবারে জরায়ু মুখের ক্যান্সার, যা চরম শারীরিক যন্ত্রণা, মানসিক পীড়ন এবং আর্থিক সঙ্কটের কারণ। ভারতে মহিলাদের মধ্যে এটি হ’ল - দ্বিতীয় সর্বাধিক প্রচলিত ক্যান্সার, যেখানে প্রতি বছর প্রায় এক লক্ষ নতুন রোগীকে শনাক্ত করা হয় এবং এর মধ্যে অর্ধেক আক্রান্তের মৃত্যু ঘটে, যা বিশ্বব্যাপী মোট মৃত্যুর এক-চতুর্থাংশ। অন্যান্য ক্যান্সারের তুলনায় জরায়ু মুখের ক্যান্সারে দ্রুত মৃত্যু হয়। আক্রান্তদের বয়স তুলনামূলকভাবে কম এবং তাঁদের সক্রিয় পারিবারিক ও সামাজিক দায়দায়িত্ব থাকে। একজন ক্যান্সার বিশেষজ্ঞ হিসেবে আমি তাঁদের যন্ত্রণার সাক্ষী হয়েছি... চতুর্থ পর্যায়ে রোগ নির্ণয় হওয়া নারীদের মূত্রনালীর ফিসচুলা তৈরি হয়েছিল, এমন নারীরা যারা রজোনিবৃত্তির পরে রক্তপাতের কথা বলতে দ্বিধাবোধ করতেন, এমন নারীরা যাঁদের ছিল তীব্র সায়াটিকা ও কোমরের ব্যথা, মূত্রনালীতে প্রতিবন্ধকতা এবং কিডনি বৈকল্য... আবার এমন ভাগ্যবানরাও ছিলেন, যাঁদের রোগটি প্রাথমিক পর্যায়ে নির্ণয়  এবং শুধুমাত্র বড় ধরনের অস্ত্রোপচার অথবা কেমো ও রেডিয়েশন থেরাপির মাধ্যমে নিরাময় করা সম্ভব হয়েছিল। অস্ত্রোপচার শরীরের ওপর মারাত্মক প্রভাব ফেলে, রেডিয়েশনের দীর্ঘ চিকিৎসা পদ্ধতি আক্রান্তের পড়াশোনা বা কাজের পথে বাধা হয়ে দাঁড়ায়। কেমো ও ইমিউনোথেরাপি ব্যয়বহুল চিকিৎসা পদ্ধতি। তারপর, আমাদের সর্বোত্তম চেষ্টা সত্ত্বেও রোগটির ফিরে আসার ঘটনাও ছিল, যার জন্য আরও কঠিন এক্সেন্টারেশন পদ্ধতি, স্টোমা ইত্যাদির প্রয়োজন হত। হ্যাঁ, আমরা নিরাময় করতে পারতাম, আমরা উপসর্গের উপশম দিতে পারতাম, এমনকী হরমোন প্রতিস্থাপন এবং অন্যান্য সহায়ক যত্নও দিতে পারতাম। কিন্তু তার জন্য শারীরিক, মানসিক, আর্থিক মূল্য দিতে হত।

এই যন্ত্রণা প্রতিরোধযোগ্য ছিল, এই সত্য বিষয়টিকে আরও মর্মান্তিক করে তুলেছিল। ১৯৪০-এর দশক থেকে পশ্চিমী দুনিয়ায় নিয়মিত প্যাপ স্মিয়ার স্ক্রিনিংয়ের মাধ্যমে সেকেন্ডারি প্রিভেনশন বা রোগ প্রতিরোধের ব্যবস্থা চালু হয়েছিল, যা শুধু ক্যান্সারই নয়, এর প্রাক-ক্যান্সার পর্যায়গুলিও শনাক্ত করতে সক্ষম। এক শতাব্দীরও বেশি সময় ধরে সার্ভিক্যাল ক্যান্সারের স্বাভাবিক ইতিহাস যথাযথভাবে নথিভুক্ত করা হয়েছে। ১০-১৫ বছরের এক দীর্ঘ প্রাক-ক্যান্সার পর্যায় রয়েছে, যাকে সার্ভিক্যাল ইন্ট্রাএপিথেলিয়াল নিওপ্লাসিয়া (সিআইএন) বলা হয়, যা জরায়ু মুখ ব্রাশ করে স্লাইডে সংগৃহীত কোষের মাইক্রোস্কোপিক পরীক্ষার মাধ্যমে শনাক্ত করা যায়। এই পর্যায়ে সাধারণ ডে-কেয়ার পদ্ধতির মাধ্যমে এর সহজেই চিকিৎসা করা যায়, যার জন্য জরায়ু অপসারণের প্রয়োজন হয় না। ভারত এবং অন্যান্য নিম্ন ও মধ্য আয়ের দেশগুলিতে, পরামর্শ মেনে ৩ বছর অন্তর স্ক্রিনিং তো দূরের কথা, ৩০ বছরের বেশি বয়সি সব নারীর জন্য জীবনে একবার স্ক্রিনিং বাস্তবায়নের মতো পরিকাঠামো এবং প্রশিক্ষিত লোকবলেরও অভাব ছিল। এমনকী, ভাল তৃতীয় স্তরের কেন্দ্রগুলিতে, পরীক্ষাগারগুলিতে দিনে কতজন মহিলার স্ক্রিনিং করা যাবে, তার একটি সীমা নির্ধারণ করে দেওয়া হয়েছিল। বঞ্চিতদের সাহায্য করার জন্য সারা দেশে স্ত্রীরোগ বিশেষজ্ঞ এবং প্যাথোলজিস্টরা নিয়মিত ক্যাম্প পরিচালনা করতেন, কিন্তু সেগুলি ছিল প্রয়োজনের তুলনায় নগণ্য।

২০০৬ সালে জরায়ুমুখ ক্যান্সারের প্রাথমিক প্রতিরোধের ক্ষেত্রে একটি আশাব্যঞ্জক 'সুপারহিরো' হিসেবে এইচপিভি টিকাদান কার্যক্রম চালু করা হয়। এটি তিন-ডোজের একটি টিকাদান কর্মসূচি হিসেবে শুরু হলেও, পরবর্তী গবেষণায় দেখা যায় যে, এর ডোজ সংখ্যা কমিয়ে দুটি করা সম্ভব; এমনকি গবেষণায় আরও প্রমাণিত হয়েছে যে, ৮৫-৯০ শতাংশ ক্যান্সারের বিরুদ্ধে সুরক্ষা প্রদানের জন্য মাত্র একটি ডোজই যথেষ্ট। বিশ্বজুড়ে এই পর্যন্ত ৫০ কোটিরও বেশি এবং ভারতে প্রায় ৪০ লক্ষ ডোজ এইচপিভি টিকা প্রদান করা হয়েছে। টিকার প্রভাবে শরীরে কিছু ক্ষণস্থায়ী ও মৃদু প্রতিক্রিয়া দেখা গেলেও এই ধরনের প্রতিক্রিয়া সব টিকার ক্ষেত্রেই একটি অত্যন্ত সাধারণ ব্যাপার। প্রজনন ক্ষমতা, সন্তানধারণের হার, নবজাতকের জন্মগত ত্রুটি কিংবা মাসিক চক্রের স্বাভাবিক ছন্দের ওপর এই টিকার কোনও নেতিবাচক প্রভাব দেখা যায়নি। এইচপিভি টিকার কার্যকারিতা সত্যিই অসাধারণ; বিশেষ করে টিকার আওতাভুক্ত নির্দিষ্ট ধরনের ভাইরাসগুলির বিরুদ্ধে এটি প্রায় একশোভাগ সুরক্ষা প্রদান করে। প্রথম প্রজন্মের এইচপিভি টিকাগুলি মূলত দুটি অত্যন্ত শক্তিশালী ও ক্ষতিকর ভাইরাসের স্ট্রেইন HPV 16 এবং HPV 18’-কে উদ্দেশ্য করে তৈরি করা হয়েছিল। বিশ্বজুড়ে জরায়ুমুখ ক্যান্সারের মোট ঘটনার ৭০ শতাংশের জন্যই এই দুটি স্ট্রেইন দায়ী, আর ভারতের ক্ষেত্রে এই হার ৮৫ শতাংশ। অস্ট্রেলিয়া ও যুক্তরাজ্যের মতো দেশগুলি, ২০০৭-০৮ সালে টিকাটি বাজারে আসার পরপরই তা গ্রহণ করেছিল, ইতিমধ্যেই ওই দেশগুলিতে প্রাক্‌-ক্যান্সারের পূর্বাবস্থা  এবং পূর্ণাঙ্গ ক্যান্সারের মতো ঘটনা উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। সুইডেন, ডেনমার্ক, কানাডা এবং যুক্তরাষ্ট্রের মতো অন্যান্য দেশ থেকেও একই ধরনের ইতিবাচক রিপোর্ট পাওয়া গেছে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার 'জরায়ুমুখ ক্যান্সার নির্মূলীকরণ উদ্যোগ'-এর মূল লক্ষ্য হ’ল, জরায়ুমুখের ক্যান্সারকে একটি অত্যন্ত বিরল রোগে পরিণত করা, যার অর্থ হ’ল, প্রতি ১ লক্ষ মানুষের মধ্যে এই রোগে আক্রান্তের হার ৪-এর নিচে নামিয়ে আনা। এই লক্ষ্য অর্জনের জন্য ২০৩০ সালের মধ্যে আমাদের সুনির্দিষ্ট কিছু মাইলফলক বা লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করতে হবে। এই লক্ষ্যমাত্রাগুলির মধ্যে রয়েছে: ১৫ বছর বয়স পূর্ণ হওয়ার আগেই ৯০ শতাংশ কিশোরীকে এইচপিভি টিকার আওতায় আনা; ৩৫ বছর ও ৪৫ বছর বয়সে ৭০ শতাংশ নারীর এইচপিভি পরীক্ষার ব্যবস্থা করা; এবং পরীক্ষায় যাদের শরীরে ক্যান্সারের প্রাক্-অবস্থা বা ক্ষত ধরা পড়বে, তাদের ৯০ শতাংশের চিকিৎসার ব্যবস্থা করা। বিশ্বব্যাপী এই নির্মূল উদ্যোগের ঘোষণাটির পর থেকে আমরা ইতিমধ্যেই অর্ধেক পথ পাড়ি দিয়ে ফেলেছি; কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্যি যে, নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করা থেকে আমরা এখনও অনেক দূরে রয়েছি। ইন্ডিয়ান মেডিক্যাল অ্যাসোসিয়েশন, ফেডারেশন অফ অবস্টেট্রিক্স অ্যান্ড গাইনোকোলজি অফ ইন্ডিয়া এবং ইন্ডিয়ান অ্যাকাডেমি অফ পেডিয়াট্রিক্স-এর মতো শীর্ষস্থানীয় চিকিৎসক সংগঠনগুলির প্রতিনিধিত্বকারী চিকিৎসক-সমাজ দীর্ঘ দিন ধরেই দাবি জানিয়ে আসছে যে, এইচপিভি টিকাদান কর্মসূচিকে অবশ্যই দেশের 'সর্বজনীন টিকাদান কর্মসূচি'র অন্তর্ভুক্ত করা উচিত। অবশেষে, আমাদের মনে আশার সঞ্চার হয়েছে। ২০২৬ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি স্বয়ং মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর হাতে দেশজুড়ে ‘জাতীয় এইচপিভি টিকাকরণ অভিযান’-এর সূচনা এই বার্তাই বহন করে যে, নারীর স্বাস্থ্য ও প্রজনন অধিকারকে তার প্রাপ্য গুরুত্ব প্রদানের লক্ষ্যে সর্বোচ্চ রাজনৈতিক অঙ্গীকার নিশ্চিত করা হয়েছে। এই কর্মসূচির ক্ষেত্রে প্রধান বিবেচ্য বিষয়গুলি, অর্থাৎ সহজলভ্যতা, সাধ্যের মধ্যে থাকা এবং প্রাপ্যতা সম্পর্কিত যাবতীয় উদ্বেগের পূর্ণাঙ্গ সমাধান সরকার সুনিশ্চিত করেছে। এখন প্রয়োজন হল, অভিভাবকের মধ্যে এই  সুযোগটি সম্পর্কে সচেতনতা তৈরি করা, যাতে তাঁদের ১৪ বছর বয়সি কন্যারা নিকটস্থ সরকারি স্বাস্থ্যকেন্দ্রে গিয়ে বিনামূল্যে এই টিকা গ্রহণ করতে পারেন। আমাদের কন্যাদের দেওয়া একটি ছোট্ট টিকার ফোঁটাই জরায়ুমুখ ক্যান্সার নির্মূল এবং ‘বিকশিত ভারত@২০৪৭’ গড়ার পথে আমাদের এক বিশাল অগ্রগতির দিকে এগিয়ে নিয়ে যাবে। 

লেখক - প্রফেসর এমেরিটাস, জাতীয় ক্যান্সার ইনস্টিটিউট ঝজ্জর,
প্রাক্তন প্রধান, প্রসূতি ও স্ত্রীরোগ বিভাগ, 
অল ইন্ডিয়া ইনস্টিটিউট অফ মেডিক্যাল সায়েন্সেস, দিল্লি


```