৩০-এর আগেই নীরবে শুরু হচ্ছে হাঁটুর ক্ষয়। উপসর্গ না থাকলেও ভবিষ্যতে হতে পারে অস্টিও আর্থ্রাইটিসের মতো বড় সমস্যা। জেনে নিন কীভাবে সচেতন থাকবেন, কোন অভ্যাস বদলালে রক্ষা পেতে পারেন হাঁটুর ক্ষতি থেকে।

প্রতীকী ছবি
শেষ আপডেট: 12 September 2025 18:53
দ্য ওয়াল ব্যুরো: মাত্র তিরিশের কোঠায় পৌঁছনোর আগেই হাঁটুতে ক্ষয়ের ছাপ। এতদিন ধরে আমরা জানতাম, হাঁটুর সমস্যা মানে বৃদ্ধ বয়সের সমস্যা। কিন্তু সাম্প্রতিক গবেষণা সেই ধারণা বদলে দিয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আধুনিক জীবনযাত্রা, অতিরিক্ত ওজন আর শারীরিক অনিয়মের কারণে হাঁটুর ক্ষয় এখন তরুণ প্রজন্মের মধ্যেও দেখা যাচ্ছে।
উপসর্গ ছাড়াই অল্প বয়সে শুরু হচ্ছে হাঁটুর পরিবর্তন। ফলে আগে থেকে সচেতন না হলে, ভবিষ্যতে অপেক্ষা করছে অস্টিও আর্থ্রাইটিসের (এক ধরনের বাত) মতো জটিল রোগ।
ফিনল্যান্ডের ইউনিভার্সিটি অব ওউলুর সাম্প্রতিক গবেষণায় জানাচ্ছে, বয়স মাত্র তিরিশের কোঠায় পৌঁছনোর আগেই হাঁটুতে গঠনগত ক্ষয়ের লক্ষণ দেখা দিতে শুরু করে। হালকা কার্টিলেজ ক্ষতি, ছোট ছোট হাড়ের গোঁজা বা স্পার, এমন পরিবর্তন সাধারণত তিরিশের মাঝামাঝি বয়সী অনেকের মধ্যেই দেখা যাচ্ছে। অথচ এ সময়ে বেশিরভাগ মানুষেরই হাঁটুতে ব্যথা বা অন্য কোনও উপসর্গ থাকে না।
গবেষকরা জানাচ্ছেন, বাড়তি ওজন বা উচ্চ বডি মাস ইনডেক্স (BMI) হাঁটুর উপর চাপ বাড়িয়ে দেয়, ফলে ক্ষয় দ্রুত শুরু হয়। তাই হাঁটুর সুস্থতা ধরে রাখতে ওজন নিয়ন্ত্রণ এবং সক্রিয় জীবনযাপনকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
গবেষণাটি করা হয়েছিল মোট ২৯৭ জন অংশগ্রহণকারীর উপর, যাদের গড় বয়স ছিল ৩৩.৭ বছর। দেখা গেছে, তাঁদের মধ্যে অর্ধেকেরও বেশি মানুষের হাঁটুতে ক্ষয়ের প্রাথমিক চিহ্ন রয়েছে, যদিও তাঁদের কারও কারও কোনও ধরনের ব্যথা বা অস্বস্তি ছিল না। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই লক্ষণগুলোকে অবহেলা করলে ভবিষ্যতে অস্টিও আর্থ্রাইটিস (OA)-এর মতো বড় সমস্যা তৈরি হতে পারে। অর্থাৎ, হাঁটুর ক্ষয় কেবল বৃদ্ধ বয়সের সমস্যা নয়, ক্রমশ তিরিশ-চল্লিশ বছর বয়সীদের মধ্যেও তা বাড়ছে। তাই এখন থেকেই সাবধান হওয়া জরুরি।
কীভাবে এই সমস্যা এড়িয়ে চলবেন?
হাঁটু ভাল রাখতে ও ব্যথা এড়াতে প্রথমেই দরকার সুস্থ ওজন ধরে রাখা। বাড়তি ওজন হাঁটুর উপর চাপ বাড়িয়ে ক্ষয় ত্বরান্বিত করে। ‘অস্টিও আর্থ্রাইটিস প্রিভেনশন স্টাডি’ (TOPS) দেখিয়েছে, ডায়েট নিয়ন্ত্রণ ও নিয়মিত ব্যায়ামের সমন্বয়ে হাঁটুর ক্ষয় অনেকাংশে কমানো যায়, বিশেষত যাঁদের ঝুঁকি বেশি।
নিয়মিত শরীরচর্চা অত্যন্ত কার্যকর। শক্তি বৃদ্ধি, অ্যারোবিক এক্সারসাইজ বা ফ্লেক্সিবিলিটি অনুশীলন হাঁটুর আশপাশের পেশি শক্ত করে, ফলে জয়েন্টের স্থিতিশীলতা বাড়ে। গবেষণায় দেখা গেছে, এ ধরনের ব্যায়াম হাঁটুর ব্যথা কমায় এবং হাঁটার সক্ষমতা উন্নত করে। বিশেষ করে কোয়াড্রিসেপস, হ্যামস্ট্রিং এবং ক্যালফ মাসল মজবুত হলে হাঁটু অনেক বেশি সাপোর্ট পায়।
শরীরচর্চার আগে সঠিকভাবে ওয়ার্ম-আপ এবং শেষে কুল ডাউন করার অভ্যাস গড়ে তোলাও জরুরি। এতে পেশি ও জয়েন্ট আঘাত থেকে রক্ষা পায়। সেই সঙ্গে সঠিক সাপোর্ট দেওয়া জুতো ব্যবহার করলে হাঁটুর উপর চাপ কম পড়ে। পায়ের সঠিক অ্যালাইনমেন্ট থাকলে হাঁটুর ভুল অবস্থান থেকে আসা ব্যথার ঝুঁকিও কমে।
একটানা দীর্ঘ সময় বসে থাকা এড়িয়ে চলা দরকার। টানা বসে থাকলে হাঁটুর আশপাশের পেশি শক্ত হয়ে যায় ও দুর্বল হয়। তাই মাঝে মাঝে উঠে হাঁটা বা শরীর নড়াচড়া করলে হাঁটুর উপর চাপ কমে। একইভাবে শারীরিক কাজে সঠিক ভঙ্গি ও টেকনিক মেনে চলাও গুরুত্বপূর্ণ। যেমন ভারী কিছু তুলতে হলে পিঠের পরিবর্তে পায়ের শক্তি ব্যবহার করা উচিত, যাতে হাঁটুর উপর বাড়তি চাপ না পড়ে।
যথেষ্ট জলপান করা এবং ক্যালসিয়াম-ভিটামিন ডি সমৃদ্ধ খাদ্য গ্রহণও হাঁটুর জন্য উপকারী। পর্যাপ্ত জল শরীরের সিনোভিয়াল ফ্লুইড ঠিক রাখে, যা জয়েন্টে লুব্রিকেশন দেয়। আবার হাড়ের শক্তি বজায় রাখতে ক্যালসিয়াম ও ভিটামিন ডি অপরিহার্য। এগুলোর অভাবে অস্টিওপেনিয়া বা অস্টিও পোরোসিসের ঝুঁকি বাড়ে, যা হাঁটুর স্বাস্থ্যে সরাসরি প্রভাব ফেলে।
হাঁটুতে নিয়মিত অস্বস্তি বা ব্যথা দেখা দিলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত। প্রাথমিক পর্যায়েই চিকিৎসা শুরু করা গেলে গুরুতর সমস্যার হাত থেকে রক্ষা পাওয়া সম্ভব।