
শেষ আপডেট: 22 January 2024 20:59
দ্য ওয়াল ব্যুরো: গরমের প্যাচপ্যাচানি দূর হয়ে শীতকাল এলে যেমন মনে হয়, 'হাঁফ ছেড়ে বাঁচলাম', তেমনই শীতকাল মানেই হাজারটা অসুখবিসুখও হানা দেয়। সর্দি-কাশি, অ্যালার্জি, হাঁপানির সমস্যা বাড়ে। আর এবার তো কনকনে ঠান্ডা পড়েছে কলকাতা-সহ জেলায় জেলায়। ভোরে ঘন কুয়াশা, মেঘলা আকাশ আর সেই সঙ্গে হাড়হিম উত্তুরে হাওয়ায় জবুথবু অবস্থা। কলকাতার তাপমাত্রা ১২ ডিগ্রির আশপাশে ঘোরাফেরা করছে, পশ্চিমের জেলাগুলিতে ১০ ডিগ্রির নীচে নেমে গেছে। এমন আবহাওয়ায় নানা অসুখবিসুখ বাড়ে। বিশেষ করে ভাইরাস-ব্যাকটেরিয়ার দাপট বাড়ে। ইদানীংকালে নিউমোনিয়া খুব ভোগাচ্ছে। ছোট বাচ্চাদেরও রেহাই দিচ্ছে না। এমন আবহাওয়ার পরিস্থিতিতে কীভাবে সুস্থ থাকা যায় তার টিপস দিচ্ছেন ডাক্তারবাবুরা।
জল খাওয়া জরুরি
রাজ্য সরকারের জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. সুবর্ণ গোস্বামী বললেন, শীতে জল খাওয়াও কম হয়। ডিহাইড্রেশনের সমস্যা বাড়ে। ইদানীংকালে ডেঙ্গি বাড়ছে। সুস্থ থাকতে শরীর হাইড্রেটেড রাখতেই হবে। যেভাবেই হোক না কেন, দিনে অন্তত আট-দশ গ্লাস জল খাওয়ার নিয়মটা বজায় রাখতেই হবে। ঠান্ডা জল খেলে গলা খুসখুস করে? তা হলে হালকা গরম জল খেতে পারেন। আরও একটা ভাল উপায় হল ইনফিউজড ওয়াটার যাকে ডিটক্স ওয়াটারও বলা হয়।
ডিটক্স ওয়াটার শরীর চাঙ্গা রাখবে
যখনই মনে হবে খুব খিদে পাচ্ছে, একগাদা ভাজাভুজি বা মশলাদার খাবার না খেয়ে, এক গ্লাস সুগন্ধি জল খাওয়ার অভ্যেস তৈরি করুন এই শীতে। আর্দ্রতার পাশাপাশি ফলের পুষ্টিগুণটাও তো ফেলে দেওয়ার মতো বিষয় নয়! শরীরের টক্সিন জমতে পারবে না, ফলে ত্বক হয়ে উঠবে ঝকঝকে। যদি জলে দারচিনি, কমলালেবু, বেদানা থাকে, তা হলে রক্তে শর্করার পরিমাণও নিয়ন্ত্রিত হবে। যেহেতু ফলে কার্বোহাইড্রেট থাকে, তাই যে কোনও ইনফিউজড জল থেকেই মিলবে বাড়তি এনার্জি।
খাওয়াদাওয়ায় নজর দিন
ডাক্তারবাবু বলছেন, শীতকালে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বছরের অন্যান্য সময়ের তুলনায় কমজোরি হয়ে পড়ে। ফলে নানারকম শারীরিক অসুস্থতা দেখা দেয়। রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যাওয়া মানেই মারণ ভাইরাসের শরীরে ঢুকে পড়ার রাস্তাটা আরও সহজ হয়ে যাওয়া। নিজেকে সুরক্ষিত রাখতে ও রোগ প্রতিরোধ শক্তি বাড়াতে দরকার লাইফস্টাইল মডিফিকেশন। শীতে বিয়েবাড়ি, পার্টি লেগেই থাকে। তাই খাওয়াদাওয়া নিয়ম করেই করতে হবে। প্রথমেই আপনাকে একটা ব্যাপার মেনে নিতে হবে। নিজেকে বোঝান যে, সারা বছরের প্রতিটি দিনই সুস্থ থাকতে হবে। বছরের কয়েকটা দিন নতুন গুড়ের পায়েস, কেক, এক-আধ পাত্তর ওয়াইন, রোস্টেড চিকেন খেলে বিরাট মহাভারত অশুদ্ধ হবে না। যদি গ্যাস-অম্বল-বুকজ্বালা-পেটভারের মতো সমস্যা হয় বা ব্রণ দেখা দেয়, তা হলে বুঝতে হবে যে খাওয়াদাওয়ায় রাশ টানার সময় হয়েছে। বিয়েবাড়ি যাওয়ার আগের দিন থেকে হাল্কা খাওয়াদাওয়া করুন। তার মানে পেট খালি রাখবেন, এমন নয়। কম ক্যালোরিযুক্ত খাবার খেয়ে পেট ভরানোর চেষ্টা করতে হবে। ঠিক যতটা বিরিয়ানি বা ফ্রায়েড রাইস পাতে তুললে মনে শান্তি পেতেন, তার চেয়ে একটু কম তুলুন। গোটা জলভরা সন্দেশ খাবেন না, অর্ধেকটা খান। দিনের শুরুতে এক কাপ উষ্ণ জলে অর্ধেকটা লেবুর রস মিশিয়ে খেয়ে দেখতে পারেন – তা আপনার পাচনতন্ত্রকে অ্যালকালাইজ় করে, ফলে যে কোনও খাবারই হজম করতে সুবিধে হয়।
বাড়িতে যখন খাবেন, তখন একেবারে হালকা, পুষ্টিকর খাবার খান। স্যুপ-স্যালাডই যে খেতে হবে তার কোনও মানে নেই কিন্তু! ঝোল-ভাতেও সুস্থ থাকা যায়।
রোজ হাঁটুন
মেডিসিন বিশেষজ্ঞ ডা. অকুল সেন বলছেন, এক্সারসাইজ তিন রকমের হয়। কার্ডিও, স্ট্রেংথ অ্যান্ড পাওয়ার, স্ট্রেচিং। তা হাঁটা বা দৌড়নো হতে পারে, কেউ ব্যাডমিন্টন খেলতে পারেন, সাইকেল চালাতে পারেন, সাঁতার কাটতে পারেন। রোজ অন্তত আধ ঘণ্টা করে এক্সারসাইজ করা উচিত। এর বেশিও করতে পারেন কেউ ভাল লাগলে। সময়ের অভাব হলে সকাল ও বিকেল দু'বেলা মিলিয়েও করা যেতে পারে। প্রতিদিনই করা ভাল, না হলে সপ্তাহে অন্তত ৫ দিন করা উচিত শরীরচর্চা।
এই ঠান্ডায় ভোরবেলায় মর্নিং ওয়াকে না গিয়ে বরং একটু বেলা করে বেরোন। তাতে ঠান্ডা লাগবে না। বিকেলে হাঁটাহাঁটি করুন নিয়মিত। তবে সন্ধের আগে ঘরে ঢোকার চেষ্টা করুন। ভিড়, জমায়েত এড়িয়ে চলাই ভাল। এইসময় নানারকম রেসপিরেটারি ভাইরাসের বাড়াবাড়ি হয়। তাই ভিড়ভাট্টা এড়িয়ে চলাই ভাল। বাচ্চাদের বাইরে নিয়ে গেলে ভাল করে পোশাক পরিয়ে নিন। মাথা-কান যেন ঢাকা থাকে।
শীতে রোজ স্নান করা জরুরি
ডাক্তারবাবু বলছেন, শীতে আবহাওয়া এমনিতেই রুক্ষ, শুষ্ক থাকে। শরীরেও সেই রুক্ষতা টের পাওয়া যায়। এর ওপর যদি এই ঠান্ডায় কেউ স্নান অনিয়মিত করেন বা জল কম খান, তখন শরীর আরও শুকিয়ে যায়। তা থেকে শুরু হয় নানা গোলযোগ।
এ সময় আমরা শীতপোশাক ব্যবহার করি। কেউ কেউ আবার একটু বেশিই চাপিয়ে ফেলেন গায়ে। এতে শরীরের অভ্যন্তরীণ তাপমাত্রা বেড়ে গিয়ে হিতে বিপরীত হতে পারে। তাই দেহের ভেতরের উষ্ণতার ভারসাম্য রক্ষার জন্য রোজ স্নান করাটা দরকার।
এই সময় বাচ্চাদের দিকেও নজর দিতে হবে। ছোট বাচ্চা বলে স্নান করানো বন্ধ করে দেবেন তা যেন না হয়। গরম জল, গ্লিসারিন সাবান ও কম ক্ষারযুক্ত শ্যাম্পু দিয়ে স্নান করান শিশুকে। স্নান সেরেই গরম তোয়ালে দিয়ে শরীর ঢেকে রাখুন। শিশু অসুস্থ থাকলে বা শীতকাতুরে হলে গরম জলে তোয়ালে ভিজিয়ে গা মুছিয়ে দিন। হালকা করে মাথা ধুইয়ে দিন। ভিটামিন সি যুক্ত ফল, মরসুমি সব্জি খাওয়ান। কোনও কোনও সব্জিতে অ্যালার্জি থাকলে তা এড়ান, কিন্তু প্রচুর সবুজ শাক-সব্জি রাখুন ডায়েটে।
নিউমোনিয়া থেকে সাবধান
শীতকালে জীবাণুর দ্রুত সংখ্যাবৃদ্ধি হয় বলে এই সময়ে নিউমোনিয়ার প্রকোপে বেশি মানুষ আক্রান্ত হন। লাগাতার সর্দি-কাশি, জ্বর না কমলে, ফুসফুসে জল জমা শুরু হলে, শ্বাসের সমস্যা হলে দেরি না করে ডাক্তার দেখিয়ে নিতে হবে। নিউমোনিয়ার প্রাথমিক লক্ষণ ধুম জ্বর। ১০৩-১০৪ ডিগ্রি উঠতে পারে জ্বর। এর সঙ্গে শ্বাসকষ্ট, বুকে ব্যথা, মাথা যন্ত্রণা হবে। আক্রান্তের কাশি বা হাঁচি থেকে নিউমোনিয়া ছড়াতে পারে। এই সময় প্রচুর জল ও ফ্লুয়িড জাতীয় খাবার খাওয়াতে হবে বাচ্চাদের। পরিচ্ছন্নতায় নজর দিতে হবে। অ্যাজমা থাকলে ইনহেলার সঙ্গে রাখুন। চিকিৎসকের পরামর্শ নিয়ে নিউমোনিয়া প্রতিরোধক টিকা নিতেই হবে।