দোলের আবির বা রং চোখে ঢুকলে ঘষবেন না। কর্নিয়া রক্ষা করতে ও ইনফেকশন এড়াতে কী করবেন এবং কখন চিকিৎসকের কাছে যাবেন? বিস্তারিত পড়ুন।

চোখ সামলে রং মাখুন
শেষ আপডেট: 1 March 2026 16:28
দ্য ওয়াল ব্যুরো: ফাগুন হাওয়ায় মেতে ওঠার দিন দোল। হাতে পিচকিরি, পকেটে আবির আর আকাশজুড়ে রঙের খেলা। তবে আনন্দের এই হুল্লোড়ে অনেক সময় অসাবধানবশত রং বা আবির চোখের ভেতরে ঢুকে গিয়ে তৈরি করতে পারে মারাত্মক বিপত্তি। সামান্য জ্বালা থেকে শুরু করে দৃষ্টিশক্তি হারানোর মতো ঝুঁকিও থেকে যায়।
কলকাতার রিজিওনাল ইনস্টিটিউট অফ অপথালমোলজির প্রাক্তন ডিরেক্টর ডা. অসীম কুমার ঘোষ বলেন, দোলের পরপরই কর্নিয়ার সমস্যা খুব বেড়ে যায়। গত বছর দোলের দিনের ঘটনার কথা তুলে ধরে তিনি আরও বলেন, "ঠিক দুদিনের রং খেলা শেষ হয়েছে। তার কয়েকদিন পরই একজন রোগী এল আমার ইনস্টিটিউশনে। অসম্ভব চোখ রগড়াচ্ছে, লাল চোখ। পরীক্ষা করে দেখলাম মাঝবয়সি ভদ্রলোকের চোখের কর্নিয়াটা একবারে গেছে। কারণ কী? শুধু কি চোখে রং ঢুকে যাওয়া? তা নয়। রঙের মধ্যে থাকা কাঁচের সূক্ষ্ম টুকরো চোখে ঢুকে যাওয়া ও তারপর চোখ জোরে রগড়ানোর ফলে কর্নিয়া মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তবে সঠিক সময়ে চিকিৎসা শুরু করায় অন্ধত্ব রোধ করা গেছে। কিন্তু এমন ঘটনা বড় থেকে ছোট সকলের ক্ষেত্রেই ঘটে।"
বাজারের আবিরে মেশানো হচ্ছে মশলা ও ক্ষতিকারক রাসায়নিক
বাজারে এখন যে সব আবির দেদার বিকোচ্ছে, তার অনেকগুলোতেই মেশানো হচ্ছে নানারকম মশলা ও রাসায়নিক, যা ত্বকের তো বটেই, চোখেরও বারোটা বাজিয়ে দিচ্ছে। গত বছর দেখা গিয়েছিল, অনেক জায়গায় আবিরে ক্যালসিয়াম কার্বাইড (Calcium Carbide) মেশানো হচ্ছে। এই কার্বাইড চোখের মণির সংস্পর্শে এলে তা অপূরণীয় ক্ষতি করতে পারে।
রঙের খেলায় বিস্ফোরক আতঙ্ক: অন্ধত্বের ঝুঁকি
বিহার, উত্তরপ্রদেশ এবং ছত্তিশগড়ের মতো রাজ্যগুলোতে গত কয়েক বছরে এক ভয়াবহ প্রবণতা দেখা গেছে। সেখানে রঙের সঙ্গে জল ও একধরণের গ্যাস মিশিয়ে পিচকিরি বা স্প্রে গান থেকে তীব্র গতিতে রঙ ছোড়া হয়। এই মিশ্রণটি অনেকটা বিস্ফোরকের (Explosive) মতো কাজ করে। এর তীব্র ঝাপটা সরাসরি চোখে লাগলে চোখের ভেতরটা চিরতরে নষ্ট হয়ে যেতে পারে। গত কয়েক বছরে এই ধরণের 'বিস্ফোরক রঙ' খেলার চক্করে পড়ে বহু শিশু ও কিশোর সারাজীবনের মতো অন্ধ হয়ে গিয়েছে। তাই দোল খেলার সময় অতিরিক্ত উন্মাদনা যেন হিতে বিপরীত না হয়, সেদিকে খেয়াল রাখা জরুরি।
খবরদার! চোখ ঘষবেন না
চোখে রং বা আবির ঢুকলে আমাদের সহজাত প্রবৃত্তি হলো চোখ কচলে ফেলা। ভুল করেও এই কাজ করবেন না। কৃত্রিম রঙে থাকা রাসায়নিক বা আবিরের সূক্ষ্ম কাঁচের কণা কর্নিয়াতে ক্ষত (Abrasion) তৈরি করতে পারে। এতে জ্বালা এবং ইনফেকশন দুই-ই বেড়ে যায়।
প্রথম কাজ: ঠান্ডা জলে বারবার ধোয়া
রং ঢোকামাত্রই পরিষ্কার ঠান্ডা জল বা স্টেরাইল স্যালাইন সলিউশন দিয়ে বারবার চোখ ধুয়ে নিতে হবে। তবে খেয়াল রাখবেন, সরাসরি চোখের মণির ওপর জলের খুব জোরে ঝাপটা দেবেন না। এতে উল্টো চাপ সৃষ্টি হয়ে চোখের ক্ষতি হতে পারে। বরং মাথাটা একদিকে কাত করে চোখের ভেতরের কোণ থেকে বাইরের কোণের দিকে ধীরে ধীরে জল ঢালুন, যাতে ধুলো বা রঙের কণা ধুয়ে বেরিয়ে যায়।
কন্ট্যাক্ট লেন্স ব্যবহারকারীরা সাবধান
আপনি কি লেন্স পরে দোল খেলছেন? চোখে রং লাগার সাথে সাথে লেন্সটি খুলে ফেলুন। কন্ট্যাক্ট লেন্স রঙের কণাগুলোকে চোখের মণির সঙ্গে আটকে রাখে, যা থেকে কর্নিয়া নষ্ট হয়ে যাওয়ার প্রবল সম্ভাবনা থাকে। লেন্স খোলার পর ভাল করে চোখ ধুয়ে নিন।
কখন আসবেন চিকিৎসকের কাছে?
চোখ ধোয়ার পরেও যদি দেখেন:
তবে এক মুহূর্ত দেরি না করে ভাল ডাক্তারের পরামর্শ নিন। কারণ রঙের কেমিক্যাল থেকে ‘কেমিক্যাল কনজাংটিভাইটিস’ বা ‘কেরাটাইটিস’-এর মতো দীর্ঘমেয়াদী সমস্যা হতে পারে। চোখের চামড়ায় একজিমা হতে পারে। চোখে এই ধরনের ইনফেকশন নিয়ে চেম্বারে আসার সময় পরিষ্কার রুমাল বা ব্যান্ডেজ দিয়ে আলতো করে চোখ ঢেকে রাখুন যাতে নতুন করে সংক্রমণ না ছড়ায়।
সুরক্ষা কবজ হোক চশমা
বিপদ ঘটার আগেই সাবধান হওয়া ভাল। দোল বা হোলি খেলার সময় প্রোটেক্টিভ গগলস বা সাধারণ চশমা ব্যবহার করুন। এতে সরাসরি রঙ বা জলভরা বেলুন চোখে এসে লাগার ভয় থাকে না। এছাড়া বাজারের সস্তা কেমিক্যাল দেওয়া রঙের বদলে ভেষজ আবির ব্যবহার করলেই ভাল।
মনে রাখবেন, উৎসবের আনন্দ কয়েক দিনের, কিন্তু চোখের সুরক্ষা সারা জীবনের। তাই সচেতন থাকুন, নিরাপদে দোল খেলুন।