বিশ্বের প্রায় ১০০ কোটির বেশি কিশোর-কিশোরী এবং তরুণ-তরুণী হেডফোন ব্যবহারের কারণে শ্রবণশক্তি হারানোর ঝুঁকিতে রয়েছে। এ রাজ্যেও তার প্রভাব মাত্রাছাড়া। ফলে হেডফোন ব্যবহারে রাশ না টানলে শুধু শিশুরা নয়, মধ্যবয়সি থেকে বয়স্ক—সকলেরই গুরুতর সমস্যা হতে পারে।

লাগামছাড়া হেডফোন ব্যবহারে কমছে শ্রবণশক্তি
শেষ আপডেট: 4 March 2026 18:20
বয়স বাড়লে শ্রবণশক্তি কমে যাওয়া স্বাভাবিক—এই ধারণা এখন অতীত। বর্তমানে খুব কমবয়সিদের মধ্যেও দেখা যাচ্ছে কানে শোনার সমস্যা হচ্ছে (Hearing loss)। এই অসুখ ক্রমশ মহামারি আকার ধারণ করছে। আর এর অন্যতম প্রধান কারণ হলো ঘণ্টার পর ঘণ্টা হেডফোন (Headphone) বা ইয়ারফোনের ব্যবহার। সম্প্রতি পালিত হয়েছে ‘ওয়ার্ল্ড হিয়ারিং ডে’। কানে শোনার ব্যাপারে এখনই সচেতন না হলে বিপদ আটকানো মুশকিল। রোজ ওপিডিতে (OPD) আসছে ছোট ছোট ছেলে-মেয়েরা, যারা ক্লাসে পড়া বুঝতে পারে না; কারণ তাদের শুনতেই সমস্যা হয়। অধিকাংশ ক্ষেত্রে অভিভাবকেরা বুঝতেই পারেন না যে তাঁদের সন্তান ঠিকমতো শুনতে পাচ্ছে না। তাই কানে শোনার ক্ষমতা বাঁচাতে প্রথম থেকেই সতর্ক থাকুন।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO)-র তথ্য অনুযায়ী, সারা বিশ্বে বর্তমানে প্রায় দেড়শো কোটিরও বেশি মানুষ শ্রবণশক্তির সমস্যায় ভুগছেন। যদিও কানের সংক্রমণ বা অতিরিক্ত শব্দদূষণের মতো কারণগুলো প্রতিরোধযোগ্য, তবুও সতর্কতার অভাবে এই সংখ্যা ক্রমশ বাড়ছে। ‘ব্রিটিশ মেডিক্যাল জার্নাল গ্লোবাল হেলথ’-এর একটি প্রতিবেদন অনুযায়ী, বিশ্বের প্রায় ১০০ কোটির বেশি কিশোর-কিশোরী এবং তরুণ-তরুণী হেডফোন ব্যবহারের কারণে শ্রবণশক্তি হারানোর ঝুঁকিতে রয়েছে। এ রাজ্যেও তার প্রভাব মাত্রাছাড়া। ফলে হেডফোন ব্যবহারে রাশ না টানলে শুধু শিশুরা নয়, মধ্যবয়সি থেকে বয়স্ক—সকলেরই গুরুতর সমস্যা হতে পারে।
কেন হেডফোন ভয়ের কারণ?
আসলে কী হয়? হেডফোনের অতিরিক্ত ব্যবহারের ফলে ‘নয়েজ-ইনডিউসড হিয়ারিং লস’ (NIHL) বা শব্দজনিত শ্রবণহানি ঘটে। লাউড স্পিকারের বিকট শব্দ হোক বা হেডফোনের একটানা মিউজিক—উচ্চশব্দ আমাদের কানের ভেতরের সূক্ষ্ম হেয়ার সেলগুলোকে (Hair cells) প্রচণ্ড চাপের মুখে ফেলে।
আজকের তরুণ প্রজন্ম কাজ, গেম বা বিনোদনের জন্য দিনের অনেকটা সময় হেডফোনের ওপর নির্ভরশীল। উচ্চ ভলিউমে একটানা গান বা শব্দ শোনার ফলে কানের ভেতরের কোষগুলো স্থায়ীভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এই ক্ষতি একবার হয়ে গেলে ওষুধ বা অস্ত্রোপচারে তা আর সারানো সম্ভব নয়। দক্ষিণ কোরিয়ার একটি গবেষণাতেও দেখা গেছে, যারা কোলাহলপূর্ণ পরিবেশে হেডফোন ব্যবহার করেন, তাদের শ্রবণশক্তি হারানোর ঝুঁকি সাধারণের তুলনায় ৪.৫ গুণ বেশি।
মানুন ৬০-৬০ রুল
কাজের ক্ষেত্রে অনেক সময় হেডফোন ব্যবহার করতেই হয়। কিন্তু কিছু বিশেষ সতর্কতা না মানলে এই যন্ত্রটিই বধিরতার কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে। তাই মানতে হবে ‘৬০-৬০ রুল’। অর্থাৎ হেডফোন ব্যবহারের সময় ভলিউম যেন ৬০ শতাংশের কম থাকে এবং তা যেন একটানা ৬০ মিনিটের বেশি ব্যবহার না করা হয়। এই বিষয়টি খেয়াল রাখতে হবে। এটি মেনে চললে হেডফোন ব্যবহারের ক্ষতি এড়ানো সম্ভব। যাঁদের কাজের প্রয়োজনে সারাদিন হেডফোন ব্যবহার করতে হয়, তাঁদের ভলিউম ৮০ ডেসিবেল মাত্রায় থাকলে সপ্তাহে ৪০ ঘণ্টার বেশি কোনোভাবেই ব্যবহার করা চলবে না। শিশুদের পড়াশোনার প্রয়োজনে হেডফোন ব্যবহার করতে হলে তা যেন ৬০ মিনিটের বেশি একেবারেই না হয়।
কোন ধরনের হেডফোন নিরাপদ?
অনেকেই মনে করেন ইয়ারবাড বা ওভার-দ্য-ইয়ার হেডফোনের মধ্যে কোনো একটি বেশি নিরাপদ। আসল কথা হলো, যদি দীর্ঘ সময় ধরে একই তীব্রতায় শব্দ কানের পর্দায় পৌঁছায়, তবে ঝুঁকি সব ক্ষেত্রেই সমান। তবে ইন-ক্যানেল হেডফোন কানে ভাল ‘সিল’ তৈরি করে, ফলে বাইরের শব্দ কম আসে এবং ভলিউম কিছুটা কম রাখলেও স্পষ্ট শোনা যায়। ওভার-দ্য-ইয়ার হেডফোন কিছুটা ভাল, কারণ এগুলো সরাসরি কানের নালিতে শব্দ পাঠায় না।
অ্যাক্টিভ নয়েজ ক্যানসেলেশন (ANC) কি উপকারী?
অ্যাক্টিভ নয়েজ ক্যানসেলেশন হেডফোন বাইরের নয়েজ কমিয়ে দেয়। এগুলো বাইরের ট্রাফিক বা অন্য জোরালো শব্দ কমিয়ে দেয় বলে ব্যবহারকারীকে ভলিউম খুব বেশি বাড়াতে হয় না। তবে এই হেডফোন ব্যবহার করেও যদি কেউ উচ্চস্বরে গান শোনেন, তবে তা কানের জন্য আরও ক্ষতিকর হতে পারে। তাই ভলিউম নিয়ন্ত্রণের দিকে নজর দেওয়া জরুরি।
কানে শোনার ক্ষমতা ভাল রাখতে আরও যা করবেন:
শ্রবণশক্তির ক্ষতি পুরোপুরি এড়ানো সম্ভব, যদি আমরা কিছু নিয়ম মেনে চলি:
মাঝে বিরতি দিন: প্রতি এক ঘণ্টা অন্তর ৫-১০ মিনিটের জন্য হেডফোন খুলে রাখুন এবং চারপাশে নীরবতা বজায় রাখুন। এটি কানকে কিছুটা বিশ্রাম ও সেরে ওঠার সুযোগ দেয়।
সতর্ক হোন: কানে যদি ভোঁ-ভোঁ শব্দ (Tinnitus) হয় বা কথা শুনতে অসুবিধা হয়, তবে দেরি না করে বিশেষজ্ঞ ইএনটি চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।
নিয়মিত পরীক্ষা: যদি আপনার কর্মক্ষেত্র বা জীবনযাত্রায় উচ্চশব্দের সংস্পর্শ অনিবার্য হয়, তবে নিয়মিত অডিওমেট্রিক পরীক্ষা করান। এতে প্রাথমিক পর্যায়েই কোনো সমস্যা ধরা পড়লে তা ঠেকানো সম্ভব।