যে কোনও লিভারের সমস্যাই আসলে সাইলেন্ট ডিজিজ। মানবদেহে লিভার হল দ্বিতীয় বৃহৎ অঙ্গ। অর্থাৎ ১ থেকে ১.৫ কিলো ওজনের হয় লিভার। আসলে মানবদেহ ৩০ শতাংশ লিভার ঠিক থাকলেই তা নিয়েই কাজ চালিয়ে দিতে পারে। তাই যতক্ষণ না পর্যন্ত কারও লিভার ৭০ শতাংশ খারাপ হচ্ছে, ততক্ষণ কেউ টেরই পায় না। তাই একে সাইলেন্ট ডিজিজ বলা হয়। যখন রোগ ধরা পড়ে, তখন অধিকাংশ রোগীর ৭০-৮০ শতাংশ লিভার খারাপ হয়ে যায়।

ফ্যাটি লিভার থেকে সাবধান হন
শেষ আপডেট: 4 April 2026 18:51
লিভার নিঃশব্দে কাজ করে যায়। কিছুই টের পাওয়া যায় না, যতক্ষণ না আমরা কষ্ট পাই। চলতে থাকে নানা অত্যাচার। তারপর যখন লিভার সমস্যায় পড়ে, তখন শরীরে বড় বিপদ ডেকে আনে। আর প্রায়ই তা বুঝতে অনেক দেরি হয়ে যায়। আমাদের অনেকেরই ধারণা, এই অত্যাচার মানেই শুধু মদ্যপান। কিন্তু তা একেবারেই নয়। স্ট্রেস, লাইফস্টাইল বা খাওয়াদাওয়ার অনিয়মও মারাত্মকভাবে লিভারের ক্ষতি করে।
কেন হঠাৎ করে লিভারের অসুখ ধরা পড়ে
দেখা যায়, একজন ব্যক্তি একদম ঠিকই ছিল—স্বাভাবিক হাঁটাচলা, খাওয়া-দাওয়া সবই চলছিল। একদিন হঠাৎ করে জানতে পারলেন যে, তাঁর ফ্যাটি লিভার বা লিভারের মারাত্মক কোনও সমস্যা হয়েছে। কেন হঠাৎ করেই লিভারের সমস্যা দেখা দেয়?
যে কোনও লিভারের সমস্যাই আসলে সাইলেন্ট ডিজিজ। মানবদেহে লিভার হল দ্বিতীয় বৃহৎ অঙ্গ। অর্থাৎ ১ থেকে ১.৫ কিলো ওজনের হয় লিভার। আসলে মানবদেহ ৩০ শতাংশ লিভার ঠিক থাকলেই তা নিয়েই কাজ চালিয়ে দিতে পারে। তাই যতক্ষণ না পর্যন্ত কারও লিভার ৭০ শতাংশ খারাপ হচ্ছে, ততক্ষণ কেউ টেরই পায় না। তাই একে সাইলেন্ট ডিজিজ বলা হয়। যখন রোগ ধরা পড়ে, তখন অধিকাংশ রোগীর ৭০-৮০ শতাংশ লিভার খারাপ হয়ে যায়।
শুধু মদ্যপান দায়ী নয়, তাহলে?
নন-অ্যালকোহলিক ফ্যাটি লিভার এখন খুব বেড়ে গেছে। তবুও একটা কথা সত্যি—এখন লিভারের সমস্ত অসুখের মূলে দায়ী কিন্তু মদ্যপানই। রোজ যত রোগী আসছেন, তার ৫০ শতাংশ লিভারের অসুখের রোগীই কিন্তু মদের নেশায় আসক্ত। যত দিন যাচ্ছে, মদের নেশা বাড়ছে অল্পবয়সী থেকে বয়স্কদের মধ্যে। তাই লিভারের সমস্যা বাড়ছে সব বয়সীদের মধ্যে।
এর পাশাপাশি নন-অ্যালকোহলিক ফ্যাটি লিভারের সমস্যাও বেড়েছে। যাঁরা মদ খান না, তাঁরাও এখন ফ্যাটি লিভারে আক্রান্ত হচ্ছেন, কারণ মাত্রাহীন জীবনযাপন।
এখন ডায়াবেটিসের মতো ঘরে ঘরে সবাই হচ্ছে ফ্যাটি লিভারের রোগী। এই অসুখ একটি সিনড্রোম, যা শুধু লিভারকেই বিকল করে না, সঙ্গে রক্তে গ্লুকোজের মাত্রা বাড়ায়, হার্ট অ্যাটাক ও স্ট্রোকের ঝুঁকি ডেকে আনে। তাই ফ্যাটি লিভারে ওষুধ খেয়ে ঠিক হয়ে যাবে—তা নয়। এর পাশাপাশি জীবনযাপনের পরিবর্তন করা খুবই দরকার।
এই সমস্যাকে হালকা করে নিলে বিপদ
অবহেলা করলে বিপদ বাড়ে। কারণ লিভার খুবই স্পর্শকাতর একটি অঙ্গ। তাই ক্ষতি হয়ে যাওয়ার আগেই সতর্ক হওয়া দরকার। যাঁদের বয়স ৪০ বছরের বেশি, তাঁদের বছরে একবার টেস্ট করা দরকার। লিভার ফাংশন টেস্ট ও আল্ট্রাসাউন্ড করে ৭০-৮০ শতাংশ লিভারের অসুখ আগে থেকে অনুমান করা সম্ভব।
বিশেষ করে যাঁদের ফ্যাটি লিভার রয়েছে, ভাইরাল হেপাটাইটিস বি আছে, বা ফ্যাটি লিভারের পারিবারিক ইতিহাস রয়েছে, তাঁদের বছরে একবার এই টেস্টগুলো করে দেখা উচিত। প্রয়োজন হলে ৪০ বছরের আগেই করতে হবে। রিপোর্টে কোনও খারাপ কিছু এলে তখন আগাম সাবধান হতে হবে।
হেপাটাইটিস বি ও সি সংক্রমণ থেকেও সাবধান হন
ভাইরাল হেপাটাইটিসের ব্যাপারে আজও এ দেশে সচেতনতা খুবই কম। তাই সচেতন হওয়া খুবই দরকার।
সবচেয়ে ভয়ের লিভার সিরোসিস
লিভারের এই পরিণতি একদিনে হয় না, ধীরে ধীরে হয়। যেমন কোনও ক্রিকেট ম্যাচে শেষ পর্যন্ত টিকে থাকতে গেলে শুরুর সময়টা ভালোভাবে রান করে যেতে হয়, আস্তে ধীরে খেলতে হয়। তেমনই আমাদের লিভার—বা বলা ভালো জীবন।
তাই অনেক অল্প বয়স থেকেই লিভারের কথা ভেবে বেশ কিছু বিষয় মাথায় রাখা দরকার। তবেই লিভারের সমস্যা প্রতিহত করা যায়। তাই খাদ্যাভ্যাস ঠিক রাখা, মদ্যপান না করা বা নিয়ন্ত্রিত মদ্যপান খুব জরুরি। সঙ্গে এক্সারসাইজ ও ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখা দরকার।
লিভার সিরোসিস হলে লিভার ট্রান্সপ্ল্যান্টই শেষ কথা। ওষুধ দিয়ে সিরোসিস ঠিক করা কঠিন।
কোন কোন লক্ষণে দেরি করবেন না?
যে কোনও লিভারের সমস্যা শেষ পর্যায়ে (liver failure) এলে তার লক্ষণ হিসেবে দেখা দিতে পারে জন্ডিস, রক্তবমি, পেটে যন্ত্রণা, পেটে জল জমে যাওয়ার সমস্যা।
লিভার ট্রান্সপ্ল্যান্ট কতটা চিন্তার?
বর্তমানে এই জটিল অপারেশন অনেকটাই সহজ হয়েছে। চিকিৎসার চেয়েও জরুরি সচেতন হওয়া। তাহলে অসুখটা হওয়া আটকানো যায়। তবে সমস্যা জটিল হলে ট্রান্সপ্ল্যান্ট করে সুস্থ করা সম্ভব।
বর্তমানে শিশুদেরও লিভার ট্রান্সপ্ল্যান্ট হচ্ছে। এমন ঘটনাও রয়েছে, যেখানে শিশু চিকিৎসা করে, ট্রান্সপ্ল্যান্ট করে বড় হয়ে এখন সুস্থ আছে, এমনকি কেউ কেউ চিকিৎসকও হয়েছে।
কাজেই ট্রান্সপ্ল্যান্ট করলে জীবন শেষ—এটা কখনই বলা যায় না। বেশি বয়সীদের ক্ষেত্রেও এখন খুব সফলভাবে করা সম্ভব হচ্ছে লিভার প্রতিস্থাপন।
চেন্নাইয়ের অ্যাপোলো হাসপাতালে এই চিকিৎসা অত্যন্ত আধুনিক পদ্ধতিতে করা হয়। এখানে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের টিম যৌথভাবে এই চিকিৎসা করেন।
এছাড়াও ট্রান্সপ্ল্যান্টের ক্ষেত্রে বড় চ্যালেঞ্জ হল ডোনার বা দাতা পাওয়া। পরিবারে কারও পক্ষে এটা সম্ভব না হলে, তখন ব্রেন ডেথ হওয়া রোগী বা মরণোত্তর অঙ্গদান (Deceased Donor/Organ Donation) থেকে লিভার নেওয়া হয়।
এদিক থেকে চেন্নাই অনেকটাই এগিয়ে রয়েছে। কারণ প্রতিবছর এখানে ডোনার ক্যাম্প করা হয়, এবং প্রতি বছর প্রায় ৫০-৬০ বা তারও বেশি অঙ্গদান হয়। তাই পরিবারে কেউ না দিতে পারলেও এখানে ডোনার পেতে সমস্যা হয় না।
বাঙালি খেতে ভালবাসে, লিভার ভাল রাখতে কী করবেন?