সোশ্যাল মিডিয়ায় একটি পোস্টে দাবি করা হয়েছে, ত্বক-শরীর সুস্থ রাখতে প্রতিদিন সবার ৩ লিটার জল খাওয়া উচিত। এই দাবিতে সত্যতা রয়েছে কতটা?

গ্রাফিক্স- শুভ্র শর্ভিন
শেষ আপডেট: 17 May 2025 15:48
দ্য ওয়াল ব্যুরো: যে হারে গরম বাড়ছে, বাইরে বেরনো তো দূরের কথা ঘরের মধ্যে পাখার তলাতেও দরদর করে ঘামছেন মানুষ। এসি যেন একমাত্র ভরসা। ফলে কোনওসময় জল কম খাওয়া হচ্ছে, কখনও বা বেশি। কিন্তু কতটা জল খাওয়া স্বাভাবিক মাত্রার মধ্যে পড়বে, কতটা শরীরের প্রয়োজন- সেই নিয়ে ধোঁয়াশা রয়েই যায়।
সম্প্রতি সোশ্যাল মিডিয়ায় একটি পোস্টে দাবি করা হয়েছে যে, ত্বক ও শরীর সুস্থ রাখতে প্রতিদিন সবার ৩ লিটার জল (drinking water) খাওয়া উচিত। যিনি পোস্টটি করেছেন, তিনি নিজেকে ওজন কমানোর পরামর্শদাতা বলে পরিচয় দিয়েছেন। কিন্তু কথা হচ্ছে, এই দাবিতে সত্যতা রয়েছে কতটা?
কী বলছেন বিশেষজ্ঞরা?
যদিও পর্যাপ্ত জল খাওয়া সুস্থতার জন্য গুরুত্বপূর্ণ, তবে বিজ্ঞান বলে এমন কোনও বাধ্যতামূলক নিয়ম নেই যা বলে যে সবার জন্য প্রতিদিন ৩ লিটার জল প্রয়োজনীয়।
প্রতিদিন সবার জন্যই ৩ লিটার জল প্রয়োজন, এমন ধারণা বিশেষ করে স্বাস্থ্য সচেতন মহলে ব্যাপকভাবে প্রচলিত। কিন্তু শরীরে জলের প্রয়োজনীয়তা ব্যক্তির উচ্চতা, শারীরিক কার্যকলাপ, পরিবেশ, খাদ্যাভ্যাস, বয়স ও স্বাস্থ্যের অবস্থার উপর নির্ভর করে।
ড. শালিন নাগোরি (কনসালটেন্ট প্যাথোলজিস্ট ও ইন্ডাস্ট্রিয়াল ফিজিশিয়ান) ব্যাখ্যা করেছেন, ‘ডাক্তাররা সাধারণত নির্দিষ্ট পরিমাণ জল খাওয়ার পরামর্শ দিতে পারেন না, কারণ শরীর স্বাভাবিকভাবেই তেষ্টার মাধ্যমে সেটা নিয়ন্ত্রণ করে। তবে বিশেষ কোনও সমস্যায়, আমরা মেডিক্যাল রিপোর্ট দেখে সেই অনুযায়ী পরামর্শ দিতে পারি।’
খাবার থেকেও কি হাইড্রেশন পায় শরীর?
খাবার থেকেও একটি উল্লেখযোগ্য পরিমাণ জল আসে শরীরে। দৈনিক জলের প্রয়োজনীয়তার প্রায় ২০-৩০% খাবার থেকে আসে, যদিও এটি খাদ্যাভ্যাসের উপর নির্ভর করে পরিবর্তিত হতে পারে।
তরমুজ, কমলা, স্ট্রবেরি ইত্যাদি ফলে ৯০% এরও বেশি জল থাকে। শসা, লেটুস জাতীয় শাকসবজি ও ভাত-পাস্তা, ডাল, স্যুপ ইত্যাদি খাবারও হাইড্রেশন বজায় রাখে। যদি খাবারে জলের পরিমাণ বেশি থাকে, তবে জলের প্রয়োজন অনেকটাই কমতে পারে।
অতিরিক্ত জল শরীরে হাইপোনাট্রেমিয়া বা ‘জল বিষক্রিয়া’র কারণ হতে পারে, যা রক্তে সোডিয়াম অস্বাভাবিকভাবে কমে গেলে ঘটে। ফলে মাথাব্যথা, বমি, বিভ্রান্তি, পেশির দুর্বলতা, আবার খিঁচুনি বা কোমা পর্যন্ত হতে পারে।
ডাক্তাররা বলেন, অতিরিক্ত জল খেলে মস্তিষ্কে ফোলাভাব হতে পারে, যা নিউরোলজিক্যাল জটিলতা সৃষ্টি করতে পারে। এই সমস্যা বিশেষ করে তখন হয় যখন তেষ্টা না পেলেও নির্দিষ্ট পরিমাণ জল খাওয়ার লক্ষ্যপূরণের চেষ্টা করেন।
জল খাওয়ার ক্ষেত্রে তেষ্টা কি নির্ভরযোগ্য সংকেত?
মানুষের মধ্যে ধারণা রয়েছে যে যদি জল তেষ্টা পায়, তা ডিহাইড্রেশনের লক্ষণ। এটি পুরোপুরি সঠিক নয়। বেশিরভাগ সুস্থ মানুষের জন্য, তেষ্টা প্রাথমিক সংকেত যে শরীরের আরও জল প্রয়োজন।
গরম বা আর্দ্র আবহাওয়া, শারীরিক পরিশ্রম, উচ্চ সোডিয়াম বা উচ্চ প্রোটিনযুক্ত খাদ্যাভ্যাস, রোগ-ব্যাধি, গর্ভাবস্থা বা ব্রেস্টফিডিং পরিস্থিতিতে সাধারণত শরীরে জলের চাহিদা বাড়ে। নিজের প্রয়োজন বুঝে জল খান, ‘৩ লিটারের লক্ষ্য’ অর্জনের জন্য নিজের ওপর জোর খাটাবেন না।
তাই, প্রতিদিন ৩ লিটার জল খেতেই হবে- এই দাবির পেছনে তেমন কোনও সত্যতা নেই।
হাইড্রেশন নিঃসন্দেহে স্বাস্থ্যের জন্য গুরুত্বপূর্ণ, তবে জলের পরিমাণ নির্ভর করে আবহাওয়া, পরিশ্রম, স্বাস্থ্য ও খাদ্যাভ্যাসের উপর। বেশিরভাগ মানুষ শরীরের চাহিদা অনুযায়ী জল ও জলসমৃদ্ধ খাবারের মাধ্যমে সেই প্রয়োজন মেটাতে পারেন। অতিরিক্ত জল উপকার করে না, বরং অনেক সময় তা ক্ষতিকরও হতে পারে।