পিরিয়ডের তীব্র ব্যথা স্বাভাবিক নয়। এন্ডোমেট্রিওসিসের লক্ষণ, স্বাভাবিক ব্যথার সঙ্গে পার্থক্য ও কখন চিকিৎসা জরুরি— জানুন বিস্তারিত।

পিরিয়ডের ব্যথা নাকি এন্ডোমেট্রিওসিস!
শেষ আপডেট: 31 December 2025 15:57
দ্য ওয়াল ব্যুরো: পিরিয়ড এলেই তলপেটে ব্যথা—এটা বেশিরভাগ মেয়ের কাছেই স্বাভাবিক ঘটনা। কাজের ফাঁকে পেইনকিলার খেয়ে নেওয়া, গরম সেঁক দেওয়া, কিংবা দু’দিন একটু সামলে চলা—এই অভ্যাসগুলো এতটাই পরিচিত যে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই ব্যথাকে গুরুত্ব দেওয়া হয় না। কিন্তু সব পিরিয়ডের ব্যথা কি সত্যিই স্বাভাবিক?
চিকিৎসকেরা বলছেন, কিছু ক্ষেত্রে এই ব্যথাই হতে পারে এন্ডোমেট্রিওসিসের প্রথম ও সবচেয়ে জোরালো সঙ্কেত। কিন্তু সমস্যাটা হল— এই রোগ বহু বছর চুপচাপ শরীরের ভেতরে বেড়ে ওঠে, আর মহিলা নিজেই ভেবে বসেন, “আমার পিরিয়ড একটু কষ্টকর”—এইটুকুই স্বাভাবিক।
স্বাভাবিক পিরিয়ডের ব্যথা সাধারণত পিরিয়ড শুরুর প্রথম এক–দু’দিনেই বেশি থাকে। তলপেটে হালকা থেকে মাঝারি টান ধরার মতো অনুভূতি হয়, যা অনেক সময় কোমর বা পায়ের উপরের অংশ পর্যন্ত ছড়াতে পারে। বিশ্রাম নিলে, গরম সেঁক দিলে বা সাধারণ পেইনকিলার খেলে এই ব্যথা বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই কমে যায়।
এই ধরনের ব্যথা সত্ত্বেও দৈনন্দিন কাজকর্ম পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায় না। অফিস, স্কুল বা ঘরের কাজ কোনও রকমে হলেও চালিয়ে নেওয়া সম্ভব হয়। আর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়—পিরিয়ড শেষ হলে ব্যথাটাও ধীরে ধীরে মিলিয়ে যায়।
এন্ডোমেট্রিওসিসের ক্ষেত্রে ছবিটা একেবারেই অন্যরকম। এখানে ব্যথা শুধু পিরিয়ডের কয়েক দিনে সীমাবদ্ধ থাকে না। অনেক সময় পিরিয়ডের আগেও শুরু হয়, পিরিয়ড চলাকালীন চরমে ওঠে, আবার কারও ক্ষেত্রে পুরো মাস জুড়েই কমবেশি থেকে যায়।
এই ব্যথা সাধারণ ব্যথার মতো সহনীয় নয়। অনেক নারী এটাকে তীব্র, ছুরির মতো খোঁচা বা অসহনীয় যন্ত্রণা বলে বর্ণনা করেন। গরম সেঁক বা সাধারণ ওষুধে কাজ হয় না। ব্যথা ছড়িয়ে পড়তে পারে পিঠে, কোমরে, পায়ে এমনকি পুরো পেলভিক এলাকায়।
এর ফলে অফিসে যাওয়া, স্কুলে পড়া বা দৈনন্দিন কাজ করা অসম্ভব হয়ে উঠতে পারে। অনেক সময় মিলনের সময় বা মিলনের পরেও তীব্র ব্যথা দেখা যায়—যেটা একেবারেই স্বাভাবিক পিরিয়ডের লক্ষণ নয়।
এন্ডোমেট্রিওসিস এমন একটি অবস্থা, যেখানে জরায়ুর ভিতরের আবরণীর মতো সেল-টিস্যু জরায়ুর বাইরে—ডিম্বাশয়, ফ্যালোপিয়ান টিউব, অন্ত্র বা পেলভিক অঞ্চলেও বেড়ে ওঠে। এই টিস্যুগুলোও হরমোনের প্রভাবে পিরিয়ডের সময় ফুলে ওঠে ও রক্তপাতের চেষ্টা করে, কিন্তু বাইরে বেরোনোর রাস্তা না থাকায় আশপাশে প্রদাহ ও তীব্র ব্যথা তৈরি হয়।
সমস্যা হল, এই রোগ ধরা পড়তে দেরি হয়। কারণ অনেক মহিলা বছরের পর বছর ভেবে যান— “আমার পিরিয়ডই এমন। ব্যথা বেশি হয়।”
যদি পিরিয়ডের ব্যথা ধীরে ধীরে বাড়তে থাকে, যদি ব্যথার জন্য নিয়মিত কাজ বন্ধ রাখতে হয়, যদি পেইনকিলার কাজ না করে, বা যদি পিরিয়ড ছাড়াও তলপেটে ব্যথা থেকে যায়—তাহলে সেটাকে আর স্বাভাবিক ধরে নেওয়া ঠিক নয়।
বিশেষ করে, পিরিয়ডের ব্যথার সঙ্গে যদি অতিরিক্ত ক্লান্তি, মিলনের সময় ব্যথা, দীর্ঘদিন সন্তান ধারণে সমস্যা বা পিঠ-কোমরের অস্বাভাবিক যন্ত্রণা যুক্ত হয়, তাহলে অবশ্যই গাইনোকোলজিস্টের পরামর্শ নেওয়া দরকার।
এন্ডোমেট্রিওসিস মানেই সব শেষ— এই ধারণা ভুল। সময়মতো রোগ নির্ণয় হলে ও সঠিক চিকিৎসা শুরু করলে ব্যথা নিয়ন্ত্রণে রাখা যায়, জীবনের মান অনেকটাই স্বাভাবিক রাখা সম্ভব হয়। সবচেয়ে বড় কথা, অকারণে বছরের পর বছর যন্ত্রণা সহ্য করতে হয় না।
পিরিয়ডের ব্যথাকে অবহেলা না করে শরীরের সংকেত হিসেবে দেখাই বুদ্ধিমানের কাজ। কারণ শরীর আগেই বলে দেয়—শুধু শুনতে হয়।