
ডক্টর অপর্ণা হেগড়ে।
শেষ আপডেট: 1 November 2024 15:56
দ্য ওয়াল ব্যুরো: তখন রাত ১টা। হাসপাতালে ইমার্জেন্সি ডিপার্টমেন্টে হঠাৎই ছুটে যান ডাঃ অপর্ণা হেগড়ে। তারপর তিনি সেখানে যে দৃশ্য দেখেছিলেন তা আজও ভুলতে পারেননি। বিছানায় শুয়ে এক দুর্বল নারী, যার দেহ থেকে বেরিয়ে রয়েছে একটি মৃত শিশুর মাথা!
সালটা ১৯৯৬। আজও সেই দৃশ্য অপর্ণা হেগড়ের চোখে ভাসে। বিছানায় শুয়ে থাকা সেই ২৫ বছর বয়সি অরুণাকে দেখে ছুটে আসে হাসপাতালে থাকা বিভিন্ন ডাক্তার। অরুণা থাকতেন মুম্বইয়ের একটি প্রত্যন্ত এলাকায়। সেখান থেকে হাসপাতালের দূরত্ব ছিল ৩০ কিলোমিটার। এতটা পথ পেরিয়ে সে এসেছিল মুম্বইয়ের কেন্দ্রস্থলে। সাইন হাসপাতালে পৌঁছতেই ডাক্তাররা দেখেন তার শরীর থেকে বেরিয়ে রয়েছে মৃত শিশুর মাথা। শিশুর দেহ এতটাই বড় যে তাকে মায়ের দেহ থেকে বের করে আনা যাচ্ছে না।
অরুণার আদতে গর্ভকালীন ডায়াবেটিস ছিল। সেই কারণেই শিশুটির মাথা দেহের তুলনায় ছিল অনেকটা বড়। বহুক্ষণ প্রচেষ্টার পরও শিশুটিকে মায়ের গর্ভ থেকে বের করে আনা সম্ভব হয়নি। অবশেষে শিশুটির দেহ থেকে মাথাটিকে বাদ দিয়ে দেন ডাক্তাররা। পরে পেট কেটে বের করে আনা হয় দেহ। অবশেষে বাঁচানো যায়নি অরুণাকে।
গর্ভকালীন ডায়াবেটিসের কারণে গর্ভস্থ শিশু আকারে অস্বাভাবিক বড়, শিশুর জন্মগত ত্রুটি, সময়ের আগে জন্ম ও গর্ভেই মৃত্যু হতে পারে। গর্ভকালীন ডায়াবেটিস থেকে কিছু মায়ের স্থায়ী ডায়াবেটিস হতে পারে। আবার অনেক মা ও সন্তানের ভবিষ্যতে ডায়াবেটিস হওয়ার উচ্চ ঝুঁকি থাকে।

ইদানীং গর্ভাবস্থায় ডায়াবেটিসে আক্রান্ত হওয়ার ঘটনা অনেকখানি বেড়েছে। আর তাই এই সমস্যা থেকে মুক্তি পেতে জোর দিতে হবে দৈনন্দিন খাওয়াদাওয়াতে। পুষ্টিকর খাবার খেতে হবে। টাইপ ১ টাইপ ২ ডায়াবেটিসের মত গর্ভাবস্থায় একরকম ডায়াবেটিস দেখা যায়। একে বলা হয় জেস্টেশনাল ডায়াবেটিস। মূলত ২৪-২৮ সপ্তাহের মধ্যে ডায়াবেটিসের লক্ষণ প্রকট হয়। অরুণারও এই জেস্টেশনাল ডায়াবেটিসই ছিল।
হেগড়ের মতে, অরুণা শুধুমাত্র সেদিন রাতের সেই যন্ত্রণায় মারা যায়নি। তাঁর মধ্যে যে গর্ভকালীন ডায়াবেটিস রয়েছে তাঁকে তা জানানোই হয়নি। এমনকি স্ত্রীরোগ বিশেষজ্ঞের কাছে গেলেও, এই রোগের লক্ষণ এবং সম্ভাব্য জটিলতা সম্পর্কে বলা হয়নি। অরুণাকে এটাও বলা হয়নি যে, তাঁকে নিয়মিত চেকআপের মধ্যে থাকতে হবে। ফলে তার মারা যাওয়ার অন্যতম কারণই ছিল এটি।

যাদের ওজন বেশি থাকে, হরমোনের অসামঞ্জস্যতায় ভুগছেন, পারিবারিক ইতিহাসে ডায়াবেটিস রয়েছে তাদেরই এই সময় সুগার বেড়ে যাওয়ার প্রবণতা থাকে। সুগার নিয়ন্ত্রণে রাখতে নিয়ম করে ইনসুলিন নিতে হয়। আর গর্ভাবস্থায় ডায়াবেটিস ধরা পড়লে গর্ভস্থ সন্তানের জন্ডিস বা রক্তে শর্করা কমে যাওয়ার ঝুঁকি থাকে। আর যে সব মা এই ডায়াবেটিসে আক্রান্ত থাকেন তাঁদের প্রায় সব সময়ই সি সেকশন ডেলিভারি বা সিজার করা হয়।
ন্যাশনাল লাইব্রেরি অফ মেডিসিন-এ প্রকাশিত একটি সমীক্ষায় দেখা গিয়েছে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলিতে এই গর্ভকালীন ডায়াবেটিসের প্রকোপ অনেক বেশি। এর মধ্যে মালয়েশিয়াতে ১৮.৩ শতাংশ মহিলা গর্ভকালীন ডায়াবেটিসে আক্রান্ত আর ভারতে গর্ভাবস্থায় ডায়াবেটিসে আক্রান্ত হয়েছেন ১৩.৬ শতাংশ। ভারতে প্রতি ২০ মিনিটে একজন করে গর্ভবতী নারী মারা যায়।

যাতে আর কোনও নারীকে অরুণার মত প্রাণ দিতে না হয়, তাই ২০০৮ সালে একটি এনজিও তৈরি করেন ডাঃ অপর্ণা হেগড়ে। তার নাম রাখা হয় আরমান (অ্যাডভান্সিং রিডাকশন ইন মর্ট্যালিটি অ্যান্ড মোর্বিডিটি অফ মাদারস, চিলড্রেন এবং নবজাতক)। এই এনজিওতে গর্ভবতী নারী ও মায়েদের সময়মত স্বাস্থ্যসেবা দেওয়া হয়। এমনকি এখানে ভয়েস কল এবং ভিডিও মেসেজিং পরিষেবাও রয়েছে। তারপর থেকে আজও পর্যন্ত ডাঃ অপর্ণা বাঁচিয়ে এসেছেন একের পর এক প্রাণ।

মানুষ ডাক্তারদের ভগবানের দূত মনে করে। কারণ প্রাণ বাঁচাতে তারাই শেষ ভরসা! তাই ডাঃ অপর্ণা হেগড়ের মতো চিকিৎসকদের কুর্নিশ।