ডিজিটাল যুগে মৃত্যুর আগেই ছড়িয়ে পড়ছে শোকবার্তা! এমন তাড়াহুড়োর পিছনে কী কাজ করছে? মনোবিদ দিলেন বিস্তারিত ব্যাখ্যা।

ছবি - দ্য ওয়াল (দিব্যেন্দু দাস)
শেষ আপডেট: 13 November 2025 11:40
অক্টোবরের শেষ দিকে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলেন কিংবদন্তি অভিনেতা ধর্মেন্দ্র। পরিবার থেকে জানানো হয়েছিল, চিকিৎসকরা নজর রাখছেন, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে। তারপর হঠাৎই রবিবার রাতে খবর আসে, অবস্থা নাকি আশঙ্কাজনক। আর সেই মুহূর্তেই সোশ্যাল মিডিয়ায় শুরু হয়ে যায় এক অদ্ভুত দৌড়। শোকবার্তা, RIP, পুরনো ছবি, ‘অমর থাকবেন’ জাতীয় পোস্ট, সব একসঙ্গে। সোমবার সকালেই অনেকের কাছে ধর্মেন্দ্র আর ‘ছিলেন না’। অথচ বুধবারে তিনিই হাসপাতাল থেকে সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরলেন।
এমন দৃশ্য নতুন নয়। মনোজ মিত্রের মৃত্যুর আগেও একাধিকবার সোশ্যাল মিডিয়ায় তাঁকে ‘মেরে’ ফেলা হয়েছিল। একই ঘটনা ঘটেছে মনমোহন সিং, প্রণব মুখোপাধ্যায়, লতা মঙ্গেশকর বা সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের ক্ষেত্রেও। প্রশ্ন একটাই, কেন এমন তাড়াহুড়ো? কেন মানুষ মৃত্যুর আগেই শোক জ্ঞাপন করতে এত ব্যস্ত হয়ে পড়ছেন আজকাল?
এই প্রশ্নের উত্তর খোঁজার জন্য দ্য ওয়াল কথা বলেছিল মনোবিদ ঐন্দ্রিলা চট্টোপাধ্যায়ের সঙ্গে। ঐন্দ্রিলা হেসে বললেন, ‘সোমবার যা হল! ধর্মেন্দ্র তো আরও অসুস্থ হয়ে পড়ার কথা এসব দেখে। মানুষ কি একবারও ভাবছেন না যিনি বাঁচার লড়াই করছেন, তিনি এই খবর দেখলে কেমন ধাক্কা খেতে পারেন?’
তাঁর কথায়, এটা কোনও মানসিক সমস্যা নয়, বরং একটা সামাজিক প্যাটার্ন, ‘আমরা এমন এক ধরনের সমাজে বাস করছি, যেখানে সেনসেশনালিসমই সব। আমি এমন কী করলে, বললে, দেখালে সেনসেশন তৈরি করব, এই মানসিকতাই কাজ করে। নেগেটিভ খবরের প্রতি বেশি আকর্ষিত হয় মানুষ। তাই কেউ অসুস্থ হলে বা মারা গেলেই সেটা দ্রুত ছড়িয়ে দেওয়াটা যেন স্বাভাবিক হয়ে গেছে। এতে আমি নিজেই একটা 'খবরের উৎস' হয়ে উঠছি।’
‘আমার আগে কেউ নয়’ প্রতিযোগিতার মনস্তত্ত্ব
‘আমার থেকে আগে কেউ কিছু করতে পারবে না, এই মানসিকতাটাও প্রবল হয়ে উঠছে। আমাদের এখনই করতে হবে, এখনই বলতে হবে, এখনই পোস্ট দিতে হবে। ধৈর্য নেই। ফোমো কাজ করে, আমি পিছিয়ে পড়লাম নাকি! ইনসিকিওরিটি কাজ করে, তাই থামার জায়গা নেই, ’ বললেন মনোবিদ।
এই ফোমো বা ‘Fear of Missing Out’ এখন এক সামাজিক মানসিকতা। খবর, পোস্ট, ট্রেন্ড, সব ক্ষেত্রেই একটা চাপ কাজ করে, যেন সবাই সব জানে, আমিও জানতেই হবে। সেই তাড়াহুড়োতেই শোকও হয়ে উঠছে প্রতিযোগিতার ক্ষেত্র।
ডোপামিন, অ্যাড্রিনালিন আর ইমপালস
ঐন্দ্রিলা বলছেন, ‘এসবের সঙ্গে জৈবিক কারণও জড়িত। ডোপামিন আর অ্যাড্রিনালিন রাশ হয়, মানুষ ইমপালসিভ হয়ে যায়। তখন নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করা যায় না, চট করে কেউ একটা পোস্ট করে ফেলল, একটা RIP লিখে দিল।’
এই হঠাৎ করে কাজ করে ফেলার প্রবণতাই বিপজ্জনক। তথ্য যাচাইয়ের সময় নেই, আবেগের যাচাইও নেই। একটা খবর দেখেই সবাই ঝাঁপিয়ে পড়ে শেয়ার করতে, পোস্ট দিতে, মন্তব্য করতে।
শোকের বদলে শোক-দেখানো
এখন শোক প্রদর্শনের বিষয় হয়ে উঠেছে বলে মনে করছেন। কেউ মারা গেলে বা অসুস্থ হলেই সোশ্যাল মিডিয়ায় পোস্টের ঢল নামে, ‘আমি চিনতাম’, ‘ওর সঙ্গে ছবি আছে’। ঐন্দ্রিলা বলেন, 'এখন আমি কাউকে চিনি, বা চিনতাম, তার মানে আমি একটা সোশ্যাল আইডেন্টিটি তৈরি করছি। কারও মৃত্যুর পর ছবি-সহ স্ট্যাটাস মানে, 'দেখো আমি কত কাছের ছিলাম। শোক নয়, এটা নিজের উপস্থিতি জানানোর কৌশল।' এভাবে শোকের গভীরতা হারাচ্ছে, থেকে যাচ্ছে শুধু তার প্রদর্শন।
‘আমরা সবাই নিউজ মিডিয়া হয়ে গেছি’
মনোবিদ মনে করছেন, এখনকার সমাজে সবাই নিউজ চ্যানেল হতে চাইছে। ‘মিডিয়ার কাজ খবর আগে দেওয়া, সাধারণ মানুষের তো সেটা কাজ নয়। কিন্তু এখন সবাই চাইছে, আমার পাড়ার খবর আগে আমি দেব, আমিই বলব। এই নাম করাটাই এত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে দাঁড়িয়েছে! নিজেরা সবাই নিউজ প্ল্যাটফর্ম হতে চাইছি, তাই এমন ভুয়ো খবর ছড়ায়।’
এই প্রবণতাই এখন সবচেয়ে বিপজ্জনক বলে মনে করছেন তিনি। কারণ, একটা ভুল খবর, বিশেষত মৃত্যুসংবাদ, মানুষের পরিবার বা ঘনিষ্ঠজনের কাছে ভয়াবহ মানসিক ধাক্কা হয়ে আসে। অথচ যারা পোস্ট দেন, তাঁদের কাছে সেটি নিছক ‘সেনসেশনাল’ খবর।
কেন এমন হচ্ছে, আর কীভাবে বদলানো যায়
‘এটা আসলে সোশ্যাল লার্নিং। আজকের মানুষ শিখে ফেলেছে, এমন কিছু করতে হবে যাতে চোখে পড়ি, দেখা যায়। তাই এখন যে কোনও ঘটনার সঙ্গে নিজেকে জুড়ে দিতে চায় সবাই। এতে জনসংযোগও বাড়ে, নিজের “ব্র্যান্ড ইমেজ” তৈরি হয়।’
তাঁর মতে, এটা শুধু মানসিক তাড়না নয়, একটা সামাজিক রেওয়াজও হয়ে উঠেছে। সবাই এখন নিজের ব্র্যান্ড তৈরি করতে ব্যস্ত। “সবার চেয়ে ভাল দেখাতে হবে, থাকতে হবে, তার চেয়েও বেশি—দেখাতে হবে। আজ বাহবা পেতে মানুষ সবকিছু করে। কিন্তু সেই বাহবা থাকে না। আজ একটু ভাইরাল হলাম, কাল ভুলে গেল সবাই। তাই পরের দিনই আবার কিছু করে দেখাতে হবে। এই ক্ষণিকের উত্তেজনাই মানুষকে ঠেলে দিচ্ছে এমন তাড়াহুড়োয়।’
সমাধান কোথায়?
ঐন্দ্রিলা পরামর্শ দেন, ‘কেন করছি, সেটা নিজেকে জিজ্ঞেস করা উচিত। এই কাজ করলে কী প্রভাব পড়বে, ভাবা উচিত। তাহলে হয়তো অনেকেই বুঝবেন, সব খবর শেয়ার করার দরকার নেই। ফেক বা অর্ধেক খবর দিলে মানুষ বিশ্বাস হারাবে।’
তাঁর শেষ কথা, ‘সোশ্যাল মিডিয়া খুব শক্তিশালী একটা মাধ্যম। সেটা অপব্যবহার করলে ফল ভয়ানক। তাই এখনই ভাবার সময় এসেছে, আমরা কীভাবে ব্যবহার করছি এই শক্তিটা।’
আজকের যুগে ‘শোক’-এর ভাষা পালটে গেছে। শোক এখন আর নিঃশব্দ নয়, বরং উচ্চারিত, শেয়ার করা, প্রদর্শিত। কিন্তু একটুখানি থেমে ভাবলে হয়তো বোঝা যাবে, মৃত্যু বা শোক কখনও ‘ব্রেকিং নিউজ’ নয়, সেটা গভীর মানবিক অনুভূতি।
শোক প্রকাশের আগে তাই একটাই কাজ দরকার, একটু থামা। একটু ভাবা। একটু অনুভব করা।