গবেষণাটি Global Burden of Disease Study -এর তথ্য বিশ্লেষণ করে জানাচ্ছে, ভারতে শিশুদের মৃত্যুর ক্ষেত্রে ক্যানসার এখন শীর্ষ দশ কারণের মধ্যে রয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এটি এমন এক জনস্বাস্থ্য সঙ্কেত, রোগ বাড়তে থাকলেও যা এখনও পর্যাপ্ত গুরুত্ব পাচ্ছে না।

শিশুদের ক্যানসারে মৃত্যু বাড়ছে
শেষ আপডেট: 6 April 2026 16:24
দ্য ওয়াল ব্যুরো: শিশুদের সংক্রামক রোগ (Infection) হয় বেশি, কিন্তু তার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে নতুন বিপদ। ভারতে শিশুদের মধ্যে ক্যানসার (Cancer) এখন নীরবে জায়গা করে নিয়েছে মৃত্যুর অন্যতম প্রধান কারণ হিসেবে—সাম্প্রতিক বিশ্লেষণে এমনই উদ্বেগজনক তথ্য উঠে এসেছে The Lancet-এ প্রকাশিত গবেষণায়।
গবেষণাটি Global Burden of Disease Study ২০২৩-এর তথ্য বিশ্লেষণ করে জানাচ্ছে, ভারতে শিশুদের মৃত্যুর ক্ষেত্রে ক্যানসার এখন শীর্ষ দশ কারণের মধ্যে রয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এটি এমন এক জনস্বাস্থ্য সঙ্কেত, রোগ বাড়তে থাকলেও যা এখনও পর্যাপ্ত গুরুত্ব পাচ্ছে না।
সংক্রামক রোগের চেয়েও ঊর্ধ্বমুখী নন-কমিউনিকেবল ডিজিজ
ভারতে শিশুমৃত্যুর চিত্র বদলাচ্ছে দ্রুত। আগে যেখানে সংক্রামক রোগ ছিল প্রধান কারণ, এখন সেখানে জায়গা নিচ্ছে নন-কমিউনিকেবল ডিজিজ — যেমন ক্যানসার। এই ‘এপিডেমিওলজিক্যাল শিফট’ বিশেষভাবে উদ্বেগজনক, কারণ শিশুদের ক্যানসার তুলনামূলকভাবে বিরল হলেও, সময়মতো ধরা পড়লে অনেক ক্ষেত্রেই সম্পূর্ণ নিরাময় সম্ভব। কিন্তু বাস্তব ছবিটা ভিন্ন—অনেক ক্ষেত্রেই রোগ ধরা পড়ে দেরিতে। তাতেই বাড়ছে মৃত্যু ঝুঁকি। এদেশে প্রতি বছর ৫০-৬০ হাজার শিশু ক্যানসারে আক্রান্ত হয়। Indian Council of Medical Research-এর অধীন National Centre for Disease Informatics and Research-এর তথ্য অনুযায়ী, ২০২২ সালে ভারতে মোট ক্যানসারের প্রায় ৩-৫ শতাংশই ছিল শিশুদের মধ্যে। এখন সেই সংখ্যাটাও বেড়েছে। প্রতি বছর দেশে আনুমানিক ৫০,০০০ থেকে ৬০,০০০ নতুন শিশু (০–১৪ বছর বয়সী) ক্যানসারে আক্রান্ত হচ্ছে। সংখ্যার নিরিখে এটি বিশ্বের অন্যতম চিন্তার কারণ (burden)।
অন্যদিকে, বিশ্বজুড়ে গত কয়েকবছরে শিশুদের মধ্যে নতুন ক্যানসারে আক্রান্তের সংখ্যা প্রায় ৩,৭৭,০০০ এবং মৃত্যু হয়েছে ১,৪৪,০০০ জনের—জানাচ্ছে The Lancet-এর গবেষণা।
লুকিয়ে থাকা বোঝা: ধরা পড়ে না অনেক কেস
এদেশে শিশুদের মধ্যে যে ধরনের ক্যানসার সবচেয়ে বেশি দেখা যায়— সেগুলো হল, লিউকেমিয়া (রক্তের ক্যানসার), লিম্ফোমা ও সেন্ট্রাল নার্ভাস সিস্টেমের টিউমার। ক্যানসারে শিশু মৃত্যুর পিছনে এই তিন ধরনের ক্যানসারই অধিকাংশ ক্ষেত্রে দায়ী। তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রকৃত সংখ্যা আরও বেশি হতে পারে। কারণ—
শহরাঞ্চলে, বেশ কিছু জায়গায় বেশি কেস ধরা পড়ে—কারণ সেখানে রিপোর্টিং ও ডায়াগনসিসের ব্যবস্থা উন্নত। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ভারতে শিশু ক্যানসারে মৃত্যুর অন্যতম প্রধান কারণ দেরিতে রোগ ধরা পড়া।
প্রাথমিক উপসর্গগুলো—যা উপেক্ষার নয়
জ্বর, ক্লান্তি, অকারণ ওজন কমা ও শরীরে ফোলা ভাব প্রকাশ পাওয়া। এসব দেখলে অনেক সময় সাধারণ সংক্রমণের মতোই মনে হয়। ফলে পরিবার যেমন গুরুত্ব দেয় না, তেমনই প্রাথমিক চিকিৎসকরাও অনেক সময় প্রথমদিকে সন্দেহ করতে পারেন না। ফলে রোগ নির্ণয়টাই হয় দেরিতে। একাধিক স্তরে দেরি হয়—আর ততক্ষণে রোগ পৌঁছে যায় জটিল পর্যায়ে।
চিকিৎসার সুযোগে বৈষম্য, ভুগছে গ্রামাঞ্চল
এদেশে পেডিয়াট্রিক অঙ্কোলজি পরিষেবা এখনও বড় শহরের তৃতীয় স্তরের হাসপাতালে সীমাবদ্ধ। ফলে ছোট শহর বা গ্রাম থেকে রোগীর পরিবারকে— শহরে এসে, অনেক খরচ করে চিকিৎসা করাতে হয়। ফলে সমস্যা হয়। দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে হয়, চিকিৎসা শুরু করতে দেরি হয় এমন কী মাঝপথে চিকিৎসা বন্ধ হয়ে যাওয়ার ঝুঁকি বাড়ে। এই ভৌগোলিক বৈষম্য সরাসরি প্রভাব ফেলে রোগীর বেঁচে থাকার সম্ভাবনার উপর। ফলে ক্যানসার নিরাময় হওযার বদলে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়।
আর্থিক চাপও বড় বাধা
চিকিৎসাক্ষেত্রে মেডিক্লেম থাকলেও সমস্যা থেকে যায়। কারণ— যাতায়াত খরচ, থাকার খরচ, সঙ্গে অসুস্থতার কারণে কিছু কাজ করতে না পারা - এই সব মিলিয়ে অনেক পরিবার চিকিৎসা চালিয়ে যেতে পারে না। ফলে ‘ট্রিটমেন্ট অ্যাব্যান্ডনমেন্ট’ এখনও এদেশের একটি বড় সমস্যা, যা সরাসরি মৃত্যুহার বাড়ায়। উন্নত দেশে ৮০% ক্যানসার শিশু বাঁচে, ভারতে এখনও কল্পনাও করা যায় না। উন্নত দেশগুলিতে শিশু ক্যানসারের সারভাইভাল রেট ৮০ শতাংশেরও বেশি।
ভারতে কিছু উন্নত কেন্দ্র—বিশেষ করে বড় শহরের সুসজ্জিত হাসপাতাল—কিছু ক্ষেত্রে সেই মানের কাছাকাছি ফলাফল দিচ্ছে, বিশেষত অ্যাকিউট লিম্ফোব্লাস্টিক লিউকেমিয়ার ক্ষেত্রে। কিন্তু সার্বিকভাবে ছবিটা এখনও ভাল কিছু নয়। উন্নত পরিকাঠামো, মাল্টিডিসিপ্লিনারি টিম ও সময়মতো চিকিৎসা করান —যেখানে আছে, সেখানেই ফল ভাল। অন্যত্র পরিস্থিতি অনেকটাই পিছিয়ে।
বেঁচে থাকলেও চ্যালেঞ্জ শেষ নয়
শিশু ক্যানসারের চিকিৎসা সফল হলেও নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি হচ্ছে —সেকেন্ডারি ক্যানসার, অঙ্গের ক্ষতি ও শিশুর বৃদ্ধি ও বিকাশের সমস্যা। এই ‘লং-টার্ম ফলো-আপ কেয়ার’ এখনও ভারতে পর্যাপ্তভাবে গড়ে ওঠেনি। তাই সমস্যা থেকেই যায়।
কী দরকার এখন?
Indian Council of Medical Research-এর তথ্য বলছে, শিশু ক্যানসার মোকাবিলায় জরুরি — বিশেষায়িত পেডিয়াট্রিক অনকোলজি পরিকাঠামো, প্রশিক্ষিত স্বাস্থ্যকর্মী, শক্তিশালী রেফারেল ব্যবস্থাও বিস্তৃত ক্যানসার রেজিস্ট্রি।
বিশেষজ্ঞদের মতে, সচেতনতা বাড়ানোই প্রথম ধাপ। কারণ সময়মতো রোগ ধরা পড়লে, অনেক শিশুকেই বাঁচানো সম্ভব। শিশুদের ক্যানসার এখনও বিরল—কিন্তু উপেক্ষা করার মতো নয়। আশার কথা—সময়মতো চিকিৎসা পেলে, এই লড়াই জেতা সম্ভব। প্রয়োজন শুধু দ্রুত শনাক্তকরণ, চিকিৎসা শুরু করা।
দ্রষ্টব্য: এই প্রতিবেদনটি শুধুমাত্র তথ্যভিত্তিক। এটি কোনও চিকিৎসা পরামর্শের বিকল্প নয়। সোশ্যাল মিডিয়া ও অন্যান্য নানা মিডিয়ায় প্রকাশিত বক্তব্যের উপর ভিত্তি করে লেখা, যা আলাদা করে দ্য ওয়ালের তরফে যাচাই করা হয়নি।
Note: This report is intended for informational purposes only and is not a substitute for medical advice. It is based on statements published across social media and various other media platforms, which have not been independently verified by The Wall.