অটিজম, সেরিব্রাল পলসি, ইন্টেলেকচ্যুয়াল ডিসএবিলিটি ও মাল্টিপল ডিসএবিলিটিতে আক্রান্ত শিশুদের জন্য ‘ন্যাশনাল ট্রাস্ট অ্যাক্ট’-এর আওতায় নানা সুবিধা রয়েছে। এই সুবিধাগুলি পেতে প্রথম ধাপ হল ডিসেবিলিটি সার্টিফিকেট বা ইউডিআইডি (UDID Card) কার্ড তৈরি করা।

অটিজম নিয়ে ভয় নয়! সচেতন হন
শেষ আপডেট: 4 April 2026 19:22
দ্য ওয়াল ব্যুরো: বিশেষ সুবিধা রয়েছে, সরকারি নানা প্রকল্পও চালু—তবু অটিজম ( Autism)-এ আক্রান্ত শিশুদের অধিকাংশই সেগুলির নাগাল পান না। ফলে আর্থ-সামাজিক নানা সমস্যার মুখোমুখি হতে হয় পরিবারগুলিকে। স্কুলে ভর্তি থেকে ভবিষ্যতে স্বনির্ভর হয়ে ওঠা—প্রতিটি ক্ষেত্রেই সামনে আসে বাধা। সবচেয়ে বড় সমস্যা, অনেক অভিভাবকই জানেন না কীভাবে বা কোথায় গেলে এই সুবিধাগুলি পাওয়া যায়। এই বাস্তবতাকেই সামনে রেখে বিশ্ব অটিজম সচেতনতা মাসে বিশেষ উদ্যোগ নিল কলকাতার পিয়ারলেস হাসপাতাল (Peerless Hospital)।
৪ এপ্রিল ‘অটিজম অ্যান্ড হিউম্যানিটি – এভরি লাইফ হ্যাজ ভ্যালু’ শীর্ষক সচেতনতা কর্মসূচির আয়োজন করে হাসপাতালের চাইল্ড গাইডেন্স ক্লিনিক। দিনভর এই অনুষ্ঠানে বিশেষজ্ঞরা যেমন তুলে ধরলেন সমস্যার দিক, তেমনই শোনালেন সমাধানের পথ এবং আশার কথা।
হাসপাতাল সূত্রে জানানো হয়েছে, এই উদ্যোগের মূল লক্ষ্য ছিল অভিভাবক, পরিচর্যাকারী ও শিক্ষকদের সচেতন ও ক্ষমতাবান করে তোলা, যাতে অটিজম ও অন্যান্য বিকাশজনিত সমস্যায় আক্রান্ত শিশুদের জন্য একটি শক্তিশালী সাপোর্ট সিস্টেম গড়ে ওঠে। প্রাথমিক পর্যায়ে রোগ নির্ণয়, মাল্টিডিসিপ্লিনারি থেরাপি এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক শিক্ষার উপর বিশেষ জোর দেওয়া হয়।
অনুষ্ঠানে ডেভেলপমেন্টাল পেডিয়াট্রিক্স, বিহেভিয়ার থেরাপি, স্পিচ ও ল্যাঙ্গুয়েজ থেরাপি এবং চাইল্ড সাইকোলজির বিশেষজ্ঞরা পরিবারগুলির বাস্তব সমস্যাগুলি নিয়ে আলোচনা করেন এবং তার ব্যবহারিক সমাধান তুলে ধরেন।
হাসপাতালের ডিরেক্টর ডা.ডি পি সমাদ্দার জানান, প্রাথমিক পর্যায়ে সনাক্তকরণ, সময়মতো হস্তক্ষেপ এবং অভিভাবক, শিক্ষক ও চিকিৎসকদের সম্মিলিত উদ্যোগ এই শিশুদের উন্নতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে এবং তাদের পূর্ণ সম্ভাবনা বিকাশে সাহায্য করে। এই হাসপাতালে মাল্টিডিসিপ্লিনারি চিকিৎসা এবং সহানুভূতিশীল সহায়তার মাধ্যমে পরিবারগুলিকে শক্তিশালী করতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। কারণ প্রতিটি শিশুই প্রাপ্য—বোঝাপড়া, গ্রহণযোগ্যতা এবং নিজের মতো করে এগিয়ে যাওয়ার সমান সুযোগ।
চিকিৎসক অনিন্দিতা চট্টোপাধ্যায় বলেন, “অটিজম সম্পর্কে সচেতনতা মানে শুধু তথ্য নয়, গ্রহণযোগ্যতা ও সহানুভূতি তৈরি করা। প্রাথমিক পর্যায়ে রোগ নির্ণয় ও সঠিক থেরাপি শিশুদের যোগাযোগ দক্ষতা, আচরণ ও সামাজিক মেলামেশায় উল্লেখযোগ্য উন্নতি ঘটাতে পারে।”
অনুষ্ঠানে উপস্থিত ন্যাশন্যাল ট্রাস্টের বোর্ড মেম্বার ও স্পেশ্যাল এডুকেটর চৈতালি গামি আইনি দিক, প্রতিবন্ধী সার্টিফিকেট, অভিভাবকদের মানসিক চাপ সামলানো এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেন। তিনি জানান, অটিজম, সেরিব্রাল পলসি, ইন্টেলেকচ্যুয়াল ডিসএবিলিটি ও মাল্টিপল ডিসএবিলিটিতে আক্রান্ত শিশুদের জন্য ‘ন্যাশনাল ট্রাস্ট অ্যাক্ট’-এর আওতায় নানা সুবিধা রয়েছে।
এই সুবিধাগুলি পেতে প্রথম ধাপ হল ডিসএবিলিটি সার্টিফিকেট বা ইউডিআইডি (UDID Card) কার্ড তৈরি করা। স্বাবলম্বন পোর্টালের (Swavlamban Portal) মাধ্যমে আবেদন করে পার্শ্ববর্তী হাসপাতালে প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ করতে হয়। এই কার্ডের মাধ্যমে বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশুরা স্কুলে ভর্তি, পরীক্ষায় অতিরিক্ত সময়, স্ক্রাইব বা স্ক্রিন রিডার সুবিধা, এমনকি পরবর্তীকালে প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষাতেও ছাড় পেতে পারে।

এছাড়াও রয়েছে সরকারি চাকরিতে ৪ শতাংশ সংরক্ষণ, ‘নিরাময়া’ স্বাস্থ্য বিমা প্রকল্প, শিক্ষার জন্য স্কলারশিপ এবং মানবিক পেনশনের সুবিধা। ১৮ বছর বয়সের পর আইনি অভিভাবকত্ব নেওয়ার প্রয়োজনীয়তার কথাও তুলে ধরা হয়। পাশাপাশি ন্যাশনাল ডিভ্যাংজন ফাইন্যান্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট কর্পোরেশনের মাধ্যমে কম সুদে ঋণ এবং রাজ্য সরকারের সিড মানি পেয়ে স্বনির্ভর হওয়ার সুযোগও রয়েছে। ট্রেনে বাসে কম খরচে যাতায়াতের সুবিধাও পেতে পারেন এটা।
তবে সমস্যা হল, এই সমস্ত সুবিধা থাকা সত্ত্বেও অধিকাংশ পরিবারই তা সম্পর্কে অবগত নন, কিংবা কীভাবে আবেদন করতে হয় তা জানেন না। সেই কারণেই এই সচেতনতা কর্মসূচির আয়োজন বলে জানান চৈতালি গামি। তাই প্রতিটি অভিভাবকের উচিত এই শিশুদের খুব ছোট বয়সেই এই কার্ড করিয়ে দেওয়া।
এরপর প্রশ্নোত্তর পর্বে অভিভাবক, চিকিৎসক ও অন্যান্য অংশগ্রহণকারীরা সরাসরি মতবিনিময়ের সুযোগ পান। উপস্থিত ছিলেন সাইকোলজিস্ট পুজা দত্ত, তিনি অটিজমে আক্রান্ত শিশুদের আচরণগত সমস্যা ও তা সামলানোর কৌশল নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেন। স্পিচ ল্যাঙ্গুয়েজ প্যাথোলজিস্ট শান্তনু মুখোপাধ্যায় শিশুদের ভাষা ও যোগাযোগ দক্ষতা উন্নয়নের বিভিন্ন পদ্ধতি তুলে ধরেন।
ডা. পাপিয়া খাওয়াস বলেন, “সময়ে রোগ শনাক্তকরণ এবং সঠিক চিকিৎসা শুরু হলে অটিজম আক্রান্ত শিশুদের উন্নতির সম্ভাবনা অনেকটাই বাড়ে। শুধু চিকিৎসা নয়, অভিভাবক ও শিক্ষকদের প্রশিক্ষণও অত্যন্ত জরুরি। অটিজমের প্রাথমিক লক্ষণ চিহ্নিতকরণ, আচরণগত সমস্যা নিয়ন্ত্রণ, স্পিচ ডেভেলপমেন্ট, অভিভাবকদের মানসিক সহায়তা, আইনি পরামর্শ, অন্তর্ভুক্তিমূলক শিক্ষা এবং কিশোর বয়সের মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে সমাজে সচেতনতা বৃ্দ্ধি জরুরি। পিয়ারলেস হাসপাতালের চাইল্ড গাইডেন্স ক্লিনিকে ডেভেলপমেন্টাল অ্যাসেসমেন্ট, আইকিউ ও নিউরোডেভেলপমেন্টাল মূল্যায়ন, বিহেভিয়ার থেরাপি, স্পিচ থেরাপি, অকুপেশনাল থেরাপি, সেন্সরি ইন্টিগ্রেশন থেরাপি-সহ একাধিক পরিষেবা দেওয়া হয়। পাশাপাশি অভিভাবক ও শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ এবং কিশোরদের মানসিক স্বাস্থ্য নিয়েও কাজ করা হয়। তাই সচেতন হন ও সময়ে পদক্ষেপ নিন, তাহলেই আপনার শিশুর পৃথিবী হবে সুন্দর।"