দ্য ওয়াল ব্যুরো: রাতের বেলা হঠাৎ বুক জ্বালা, টক ঢেকুর বা কাশির চোটে ঘুম ভেঙে যাওয়া— অনেকের কাছেই এটি এক পরিচিত সমস্যা। চিকিৎসকদের মতে, একে অবহেলা করা ঠিক নয়। কারণ এটি কেবল ঘুমের ব্যাঘাত (Sleep Problem) ঘটায় না, দীর্ঘমেয়াদে খাদ্যনালীরও ক্ষতি করতে পারে। গ্যাস্ট্রোইসোফেজিয়াল রিফ্লাক্স ডিজিজ (GERD) বা অ্যাসিড রিফ্লাক্স (Acid Reflux) কেন রাতে বাড়ে এবং এর প্রতিকার কী, তা নিয়ে আলোকপাত করেছেন বিশেষজ্ঞরা।
রাতে কেন বাড়ে অ্যাসিড রিফ্লাক্স?
বিশেষজ্ঞদের মতে, দিনের তুলনায় রাতে অ্যাসিড রিফ্লাক্স বাড়ার পেছনে বেশ কিছু কারণ রয়েছে:
- মধ্যাকর্ষণ শক্তির অভাব: দাঁড়িয়ে বা বসে থাকলে মাধ্যাকর্ষণ শক্তি পাকস্থলীর অ্যাসিডকে নিচে রাখতে সাহায্য করে। কিন্তু শুয়ে পড়লে অ্যাসিড সহজেই খাদ্যনালীর দিকে উঠে আসে।
- লালারস কম নিঃসরণ: ঘুমের সময় মুখে লালা বা স্যালাইভা তৈরি কমে যায়। লালারস প্রাকৃতিকভাবে অ্যাসিডকে প্রশমিত করতে সাহায্য করে, যা রাতে সম্ভব হয় না।
- গিলন প্রক্রিয়া ধীর হওয়া: ঘুমের মধ্যে আমরা খাবার বা থুতু গেলার কাজ খুব কম করি, ফলে খাদ্যনালীতে উঠে আসা অ্যাসিড পরিষ্কার হতে বেশি সময় লাগে।
জিইআরডি-র প্রধান কারণগুলি:
- স্থূলতা বা অতিরিক্ত ওজন: শরীরের অতিরিক্ত ওজন পাকস্থলীর ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি করে, যা অ্যাসিডকে উপরের দিকে ঠেলে দেয়।
- ভুল খাদ্যাভ্যাস: অতিরিক্ত মশলাদার, তৈলাক্ত বা টক (অ্যাসিডিক) জাতীয় খাবার নিয়মিত খেলে রিফ্লাক্সের সমস্যা বাড়ে।
- খাওয়ার ধরণ: একবারে অনেকটা বেশি খাবার খাওয়া অথবা খাওয়ার পরপরই শুয়ে পড়ার অভ্যাস হজমে দেরি করে এবং রিফ্লাক্সকে উৎসাহিত করে।
- ধূমপান ও মদ্যপান: এই অভ্যাসগুলো স্ফিঙ্কটার (LES)-কে দুর্বল করে দেয় এবং পাকস্থলীতে অ্যাসিডের পরিমাণ বাড়িয়ে তোলে।
- গর্ভাবস্থা: হরমোনের পরিবর্তন এবং গর্ভস্থ সন্তানের কারণে পেটের ভেতর চাপ বৃদ্ধি পাওয়ায় এই সমস্যা দেখা দিতে পারে।
- ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া: নির্দিষ্ট কিছু ব্যথানাশক (NSAIDs), ক্যালসিয়াম চ্যানেল ব্লকার, সিডেটিভ বা অ্যান্টিডিপ্রেসেন্ট জাতীয় ওষুধ খাদ্যনালীর পেশী শিথিল করে দিতে পারে।
- হাইটাল হার্নিয়া: এটি এমন এক শারীরিক অবস্থা যেখানে পাকস্থলীর কিছু অংশ ডায়াফ্রামের ওপর চলে আসে, ফলে স্ফিঙ্কটার বা LES দুর্বল হয়ে পড়ে।
সুস্থ থাকতে চিকিৎসকদের নির্দেশ
মেরিল্যান্ডের চিকিৎসক ডা. কুনাল সুদ এবং গ্যাস্ট্রোএন্টারোলজিস্ট ডাঃ প্রণব হোন্নাভারা শ্রীনিবাসন এই সমস্যা নিয়ন্ত্রণে কিছু জরুরি পরামর্শ দিয়েছেন:
- খাবার ও ঘুমের ব্যবধান: রাতের খাবার খাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই শুয়ে পড়বেন না। খাবার খাওয়ার পর অন্তত ২-৩ ঘণ্টা পর ঘুমানো উচিত।
- শোয়ার ভঙ্গি: শোয়ার সময় মাথার দিকটা একটু উঁচুতে রাখুন। এতে মধ্যাকর্ষণ শক্তি অ্যাসিডকে পাকস্থলীতেই আটকে রাখতে সাহায্য করবে।
- খাদ্যাভ্যাস পরিবর্তন: অতিরিক্ত ভাজাভুজি, মশলাদার খাবার, চকোলেট, ক্যাফেইন (চা-কফি) এবং টক জাতীয় খাবার এড়িয়ে চলাই ভালো। গবেষণায় দেখা গেছে, উদ্ভিজ্জ খাবার (Plant-forward diet) এই রোগের ঝুঁকি কমায়।
- ডায়েরি মেইনটেইন করুন: কোন খাবার খেলে আপনার সমস্যা বাড়ছে, তা বুঝতে দুই থেকে তিন সপ্তাহ একটি ফুড ডায়েরি রাখুন।
- ওষুধের ব্যবহার: হালকা সমস্যায় চিকিৎসকের পরামর্শে ওষুধ ব্যবহার করা যেতে পারে, যা অ্যাসিড তৈরি কমাতে সাহায্য করে।
কখন সাবধান হতে হবে?
যদি নিয়মিত জীবনযাত্রার পরিবর্তনের পরেও সমস্যার সমাধান না হয়, অথবা খাবার গিলতে অসুবিধা, দীর্ঘস্থায়ী কাশি বা ওজন কমে যাওয়ার মতো লক্ষণ দেখা দেয়, তবে দ্রুত একজন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।
মনে রাখবেন, রাতে ভাল ঘুমের জন্য সঠিক সময়ে হালকা খাবার এবং সঠিক ভঙ্গিতে শোয়াই হল সুস্থ থাকার আসল চাবিকাঠি।