বিড়ালের বেশিরভাগ আঁচড়ই নিরীহ এবং সাধারণ যত্নে সেরে যায়। তবু সব সময় এতটা তুচ্ছ নয়। রেবিসের বাইরেও সম্ভাব্য ঝুঁকি জানা, সতর্ক লক্ষণ চিনে নেওয়া এবং দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়াই জটিলতা এড়ানোর চাবিকাঠি।

শেষ আপডেট: 10 February 2026 18:44
দ্য ওয়াল ব্যুরো: বিড়ালের নখের ছোট্ট আঁচড়ে (Cat Scratch) সাধারণত তেমন কিছু মনে হয় না। জায়গাটা ভাল করে ধুয়ে কেউ হয়তো একটু অ্যান্টিসেপটিক লাগান, তারপর ভুলেও যান। বাড়ির পোষ্য তো, বন্য প্রাণী নয় - এই ভরসাই কাজ করে। বেশিরভাগ মানুষের মাথায় আসে একটাই ভয় - রেবিস বা জলাতঙ্ক (rabies)। কিন্তু চিকিৎসকরা সতর্ক করছেন, বিড়ালের আঁচড় (Cat scratch infection risks) কখনও কখনও তার বাইরেও নানা ঝুঁকির কারণ হতে পারে, বিশেষ করে আঁচড় গভীর হলে, অবহেলা করলে, বা যাঁদের রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা কম।
গুরুগ্রাম ফর্টিস হাসপাতালের সংক্রামক রোগ বিশেষজ্ঞ নেহা রাস্তোগি বলেন, “যা সাধারণত ‘ক্যাট স্ক্র্যাচ ফিভার’ নামে পরিচিত, তার কারণ 'বার্টোনেলা হেনসেলে' (Bartonella henselae) ব্যাকটেরিয়া। সাধারণত বিড়ালছানা বা যেসব বিড়ালের গায়ে যে পোকা থাকে, তাদের মাধ্যমে এটি ছড়ায়। এছাড়া 'পাস্তুরেলা মাল্টোসিডা' (Pasteurella multocida) সংক্রমণও হতে পারে। এই ব্যাকটেরিয়া অনেক সুস্থ বিড়ালের মুখে ও নখের নিচে থাকে এবং প্রাণীর আঁচড় বা কামড়ের পরে নরম টিস্যুর সংক্রমণের অন্যতম কারণ।”
কেন বিড়ালের আঁচড়ে সমস্যা হতে পারে
ঘরের বিড়ালের নখে ও মুখে ব্যাকটেরিয়া থাকতে পারে। ঘরের ভিতরে থাকা বিড়ালও পরিবেশ, এমনকি পোকামাকড় বা ইঁদুরের সংস্পর্শ থেকে জীবাণু বহন করতে পারে। আঁচড়ে ত্বক চিরে গেলে সেই ব্যাকটেরিয়া শরীরে ঢুকে পড়ে। অনেক সময় সংক্রমণ সঙ্গে সঙ্গে ধরা পড়ে না - কয়েক দিন, এমনকি কয়েক সপ্তাহ পর লক্ষণ দেখা দিতে পারে।
StatPearls জার্নাল অনুযায়ী, সবচেয়ে পরিচিত ঝুঁকির একটি হল ‘ক্যাট স্ক্র্যাচ ডিজিজ’, যার কারণ Bartonella henselae। আঁচড়, কামড়, এমনকি বিড়াল শরীরের কেটে যাওয়া অংশ চেটে দিলেও এটি ছড়াতে পারে।
সেন্টার ফর ডিজিজ কন্ট্রোল অ্যান্ড প্রিভেনশন জানাচ্ছে, আঁচড়ের এক থেকে তিন সপ্তাহ পর লক্ষণ দেখা দিতে পারে। আঁচড়ের জায়গায় ফোলা বা ছোট গুটি, তারপর গলার কাছে, বগলে বা কুঁচকিতে লিম্ফ নোড ফুলে যাওয়া - এগুলো সাধারণ লক্ষণ। কারও কারও জ্বর, ক্লান্তি, মাথাব্যথা বা পেশিতে ব্যথাও হতে পারে।
সুস্থ প্রাপ্তবয়স্কদের ক্ষেত্রে এটির প্রভাব সাধারণত কম এবং নিজে থেকেই সেরে যায়। কিন্তু শিশু, বয়স্ক এবং যাঁদের রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা কম, তাঁদের ক্ষেত্রে লক্ষণ গুরুতর হতে পারে এবং অ্যান্টিবায়োটিকের প্রয়োজন পড়ে।
ত্বক ও নরম টিস্যুর সংক্রমণের ঝুঁকি
ডা. রাস্তোগির কথায়, “আঁচড়ের জায়গা সংক্রমিত হয়ে ব্যাকটেরিয়া রক্তে বা ত্বকের গভীরে ঢুকে গেলে সেলুলাইটিস হতে পারে। এতে ত্বক সেনসিটিভ হয়ে পড়ে এবং সংক্রমণ দ্রুত ছড়ায়। রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা কম থাকলে একটি সাধারণ আঁচড় থেকেও সেপসিস, অর্থাৎ প্রাণঘাতী সিস্টেমিক সংক্রমণ, হতে পারে।”
চিকিৎসা না হলে এই সংক্রমণ ত্বকের গভীরে ছড়িয়ে পড়ে। ২৪ থেকে ৪৮ ঘণ্টার পরেও যদি লালচে ভাব বাড়তে থাকে বা ছড়ায়, সেটি বড় সতর্কবার্তা।
টিটেনাসের আশঙ্কাও থাকে
“আমরা সাধারণত মরচেধরা পেরেকের সঙ্গে টিটেনাসের সম্পর্ক রয়েছে বলেই ভাবি। কিন্তু বিড়ালের ধারালো নখের গভীর আঁচড় থেকেও টিটেনাসের জীবাণু শরীরে ঢুকতে পারে। টিটেনাস স্নায়ুতন্ত্রে প্রভাব ফেলে, পেশিতে টান ও খিঁচুনি সৃষ্টি করে,” বলেন ডা. রাস্তোগি।
সাধারণত শেষ টিটেনাস টিকার ১০ বছরের মধ্যে না থাকলে বুস্টার নেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়। গভীর ক্ষত হলে আরও আগে নেওয়া উচিত। টিকার অবস্থা নিয়ে সন্দেহ থাকলে চিকিৎসকের সঙ্গে কথা বলাই শ্রেয়।
ঘরের বিড়ালে কি ঝুঁকি কম?
বাইরের বিড়ালের তুলনায় ঘরের বিড়ালের ঝুঁকি কম হলেও, একেবারে শূন্য নয়। ফ্লি-এর মাধ্যমে বিড়ালদের মধ্যে বার্তোনেল্লা ছড়ায়। ঘরের বিড়ালও ফ্লি বা দূষিত জায়গার সংস্পর্শে আসতে পারে। খেলতে গিয়ে বিড়ালছানার অনিচ্ছাকৃত আঁচড় খুবই সাধারণ।
আঁচড় লাগার পর সঙ্গে সঙ্গে কী করবেন
দ্রুত ব্যবস্থা নিলে সংক্রমণের ঝুঁকি কমে। কয়েক মিনিট ধরে সাবান জলে ক্ষতস্থান ভাল করে ধুয়ে নিন, যাতে ব্যাকটেরিয়া বেরিয়ে যেতে পারে। অ্যান্টিসেপ্টিক লাগান। জায়গাটি পরিষ্কার ও শুকনো রাখুন। ছোট আঁচড় শক্ত করে ব্যান্ডেজে ঢেকে রাখবেন না, হাওয়া লাগলে শুকোতে সুবিধা হয়। গভীর আঁচড়, রক্তপাত, মুখে, হাতে বা জয়েন্টের কাছে আঁচড় হলে অবহেলা করবেন না।
কখন চিকিৎসকের কাছে যাবেন
ডা. রাস্তোগির পরামর্শ:
বেশিরভাগ বিড়ালের আঁচড়ই নিরীহ এবং সাধারণ যত্নে সেরে যায়। তবু সব সময় এতটা তুচ্ছ নয়। রেবিসের বাইরেও সম্ভাব্য ঝুঁকি জানা, সতর্ক লক্ষণ চিনে নেওয়া এবং দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়াই জটিলতা এড়ানোর চাবিকাঠি। একটু সচেতনতা আপনাকে এবং আপনার পোষ্য সঙ্গী, দু’জনকেই নিরাপদ রাখবে।