গবেষকদের দাবি, বিশ্বজুড়ে উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণের হার উদ্বেগজনকভাবে কম, তাই এই দীর্ঘমেয়াদি ইঞ্জেকশনভিত্তিক চিকিৎসা পদ্ধতি হাইপারটেনশন ম্যানেজমেন্টে বড় পরিবর্তন আনতে পারে। কীভাবে কাজ করবে এই থেরাপি, কতটা নিরাপদ ও কতটা কার্যকর, জানুন বিস্তারিত।

শেষ আপডেট: 20 February 2026 16:52
দ্য ওয়াল ব্যুরো: যাঁদের উচ্চ রক্তচাপ (High Blood Pressure) রয়েছে, তাঁদের নিয়মিত ওষুধ না খেলে তা নিয়ন্ত্রণ করা খুবই কঠিন। কিন্তু ভবিষ্যতে সেই ছবি বদলাতে পারে। বছরে মাত্র দু’টি ইঞ্জেকশনেই (Injection) নিয়ন্ত্রণে রাখা যেতে পারে ব্লাড প্রেসার—এমনই সম্ভাবনার কথা জানাল বিখ্যাত মেডিক্যাল জার্নাল দ্য ল্যানসেট (The Lancet)-এ প্রকাশিত এক নতুন রিভিউ।
গবেষকদের দাবি, বিশ্বজুড়ে উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণের হার উদ্বেগজনকভাবে কম, তাই এই দীর্ঘমেয়াদি ইঞ্জেকশনভিত্তিক চিকিৎসা পদ্ধতি হাইপারটেনশন ম্যানেজমেন্টে বড় পরিবর্তন আনতে পারে।
কীভাবে কাজ করে নতুন থেরাপি?
নতুন ধরনের এই ইঞ্জেকশনগুলি শুধু রক্তচাপের মাত্রা কমাবে না, বরং শরীরে যেখান থেকে রক্তচাপ বাড়ার প্রক্রিয়া শুরু হয়, সেই জায়গাতেই কাজ করবে। অর্থাৎ গোড়া থেকে নিয়ন্ত্রণ করবে রক্তচাপ। সহজভাবে বললে, আমাদের লিভার এমন কিছু প্রোটিন তৈরি করে যা রক্তনালী সঙ্কুচিত করে এবং রক্তে লবণ ও জলের মাত্রা বাড়িয়ে রক্তচাপ বৃদ্ধি করে। নতুন ইঞ্জেকশন সেই প্রোটিনের উৎপাদন কমিয়ে দেয়। ফলে রক্তচাপ বৃদ্ধির প্রক্রিয়াটি ধীর হয়ে যায়।
একটি ইঞ্জেকশনের প্রভাব প্রায় ছ’মাস পর্যন্ত থাকতে পারে—মানে প্রতিদিন ওষুধ খাওয়ার বদলে বছরে এক বা দু’বার ইঞ্জেকশন নিলেই কাজ হতে পারে। কিছু গবেষণা আবার শরীরের প্রদাহ কমানো বা এমন একটি হরমোনকে (অ্যালডোস্টেরন হরমোন) নিয়ন্ত্রণে আনার দিকেও নজর দিচ্ছে, যা লবণ ও জলের ভারসাম্য নিয়ন্ত্রণ করে। সব মিলিয়ে লক্ষ্য একটাই—দীর্ঘ সময় ধরে নিয়মিতভাবে রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে রাখা। তবে এই চিকিৎসাগুলি এখনও পরীক্ষামূলক পর্যায়েই রয়েছে। ট্রায়ালের মধ্যবর্তী পর্যায়ের কিছু ফলাফল নিউ ইংল্যান্ড জার্নাল অব মেডিসিন-এও প্রকাশিত হয়েছে, যেখানেও দীর্ঘস্থায়ী রক্তচাপ কমাবে এই ইঞ্জেকশন তেমনই ইঙ্গিত মিলেছে।
কেন দরকার এমন চিকিৎসা?
ওরাল পিল দিয়ে রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে সবচেয়ে বড় বাধা হল ডোজ মিস করা। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই রোগী নিয়মিত ওষুধ খেতে ভুলে যান। মাঝেমধ্যে ডোজ মিস করলে রক্তচাপ হঠাৎ বেড়ে গিয়ে সমস্যা জটিল হয়ে উঠতে পারে। অনেকেই একসঙ্গে ডায়াবেটিস, কোলেস্টেরল বা স্থূলতার ওষুধ খান। ফলে তৈরি হয় ‘পিল ফ্যাটিগ’। ডোজ মিস, পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া, ফলো-আপে অনিয়ম—সব মিলিয়ে চিকিৎসা মাঝপথে বিঘ্নিত হয়।
গবেষকদের মতে, বছরে এক বা দু’বার ইঞ্জেকশন দিলে এই অনিয়ম অনেকটাই কমানো সম্ভব।
কতটা নিরাপদ, কতটা খরচসাপেক্ষ?
প্রাথমিক গবেষণায় নিরাপত্তার ইঙ্গিত ইতিবাচক হলেও চিকিৎসকরা সতর্ক থাকার পরামর্শ দিচ্ছেন। কারণ উচ্চ রক্তচাপ আজীবনের রোগ। তাই দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব, হৃদরোগ ও স্ট্রোকের ঝুঁকি কমানোর ক্ষমতা—এসব বিষয়ে আরও বিস্তৃত গবেষণা প্রয়োজন। এই ইঞ্জেকশন পুরোপুরি নিরাপদ কি না, তা নিশ্চিত হতে সময় লাগবে। অন্যদিকে, দীর্ঘমেয়াদি এই ধরনের ইঞ্জেকশন সাধারণত বেশ মূল্যবান হয়। বাজারে এলে এর দাম নিম্ন ও মধ্যবিত্তের নাগালের বাইরে থাকতে পারে। সাধারণ মানুষের জন্য সহজলভ্য হতে আরও সময় লাগতে পারে।
চিকিৎসকদের মত
গুজরাটের প্লেক্সাস কার্ডিয়াক কেয়ারের ডিরেক্টর অমিত রাজ বলেন, এই নতুন চিকিৎসাপদ্ধতি রক্তচাপের উৎসস্থলে কাজ করে। দীর্ঘমেয়াদি গবেষণায় ইতিবাচক ফল মিললে বছরে দু’বার ইঞ্জেকশনই যথেষ্ট হতে পারে। এতে হার্ট অ্যাটাক ও স্ট্রোকের ঝুঁকি কমার সম্ভাবনাও রয়েছে। তাঁর মতে, প্রতিদিন ওষুধ খেতে ভুলে যাওয়ার প্রবণতা কমলে বাস্তবে আরও বেশি রোগীর রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে থাকবে।
অন্যদিকে, এইমস দিল্লির (AIIMS, Delhi) সিনিয়র কার্ডিওলজিস্ট নীতীশ নায়েক সতর্ক করেছেন । তাঁর মতে, একে এখনই যুগান্তকারী বলা ঠিক নয়। উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণের বড় চ্যালেঞ্জ হল সাশ্রয়ী ও সহজলভ্য স্বাস্থ্যপরিষেবা নিশ্চিত করা। নিয়মিত পরীক্ষা, সময়মতো রোগ নির্ণয় এবং ধারাবাহিক চিকিৎসা ছাড়া শুধু নতুন ওষুধ দিয়ে সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়। তিনি মনে করেন, প্রাথমিক স্বাস্থ্যব্যবস্থা শক্তিশালী করা ও নিয়মিত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়াই দীর্ঘমেয়াদে বেশি কার্যকর।
দেশে ও বিশ্বে ঊর্ধ্বমুখী সমস্যা
হু (World Health Organization)-এর নির্দেশিকা অনুযায়ী, ১৪০/৯০ mm Hg বা তার বেশি রক্তচাপকেই হাইপারটেনশন বা উচ্চ রক্তচাপ বলা হয়। স্বাভাবিক রক্তচাপ ১২০/৮০ mm Hg-এর নিচে।
বিশ্বে প্রায় ১৪০ কোটি মানুষ এই সমস্যায় ভুগছেন। এদের প্রায় ৪৪ শতাংশ জানেনই না যে তাঁদের উচ্চ রক্তচাপ রয়েছে। আর যাঁদের রোগ ধরা পড়েছে, তাঁদের মধ্যে চার জনে একজনও নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারছেন না।
ভারতে আইসিএমআর–ইন্ডিয়াব সমীক্ষা বলছে, এ দেশে প্রায় ৩১ কোটি ৫০ লক্ষ মানুষ উচ্চ রক্তচাপে আক্রান্ত।