দ্য ওয়াল ব্যুরো: পাঁচ দিনের সফরে লন্ডনে গিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় (Mamata Banerjee London Tour)। প্রথম দিন সকালে নিজের অভ্যেসমতো মর্নিং ওয়াকে বেরোন তিনি। শীতের সকালে শাড়ির উপরে চাপিয়ে নেন কালো জ্যাকেট। তবে পায়ে অবশ্য হাওয়াই চটিই ছিল। অতিরিক্ত বলতে একজোড়া মোজা। সঙ্গীসাথীদের সঙ্গে বেশ খানিকটা হাঁটার পরে, দেখা যায়, খানিকটা পথ পিছন দিকে হাঁটছেন মুখ্যমন্ত্রী। উল্টোদিকে তাঁর এই হাঁটার ভিডিও ছড়িয়েও পড়েছে সোশ্যাল মিডিয়ায়। যা দেখে অনেকেরই প্রশ্ন, কেন এমন করলেন মুখ্যমন্ত্রী?
হাঁটা বা মর্নিং ওয়াকের সময়ে আমরা সাধারণত সামনের দিকে হাঁটাই স্বাভাবিক মনে করি। কিন্তু বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পিছনের দিকে হাঁটাও শরীরের জন্য দারুণ উপকারী হতে পারে। কারণ উল্টো দিকে হাঁটা শুধুমাত্র শরীরের শক্তি বাড়ায় না, বরং এটি মানসিক স্বাস্থ্যের উন্নতি ঘটায়, পেশি দৃঢ় করে এবং ওজন কমাতে সাহায্য করে।
অনেকে হয়তো ভাবতে পারেন, এভাবে হাঁটার কোনও বাস্তব উপযোগিতা নেই। কিন্তু গবেষণা বলছে, উল্টো হাঁটার মাধ্যমে মস্তিষ্ক ও শরীরের মধ্যে সমন্বয় তৈরি হয়, যা স্বাভাবিক হাঁটার চেয়ে বেশি কার্যকরী।
উল্টো হাঁটার শারীরিক উপকারিতা
১. পায়ের পেশির উন্নতি ও ব্যথা কমানো
সাধারণত আমরা হাঁটার সময় সামনের দিকের পেশিগুলি বেশি ব্যবহার করি। কিন্তু উল্টো হাঁটলে, বিশেষ করে পায়ের পেছনের দিকের পেশিগুলোর ওপর চাপ পড়ে। এতে করে কাঁধ, কোমর ও হাঁটুর সংযোগস্থলে থাকা পেশিগুলি শক্তিশালী হয়। যারা দীর্ঘ সময় বসে কাজ করেন বা হাঁটুর ব্যথায় ভুগছেন, তাদের জন্য এটি বিশেষভাবে উপকারী হতে পারে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নিয়মিত উল্টো দিকে হাঁটা হাঁটুর চাপ কমিয়ে আর্থ্রাইটিসের ঝুঁকি কমাতে সাহায্য করতে পারে। এছাড়া, যারা পিঠ ও কোমরের ব্যথায় কষ্ট পাচ্ছেন, তারা যদি প্রতিদিন ১৫-২০ মিনিট উল্টো হাঁটার অভ্যাস করেন, তাহলে ব্যথার উপশম পেতে পারেন।
২. ওজন কমাতে সাহায্য করে
উল্টো হাঁটলে শরীরকে বেশি শক্তি খরচ করতে হয়। সাধারণভাবে সামনের দিকে হাঁটার তুলনায় উল্টো হাঁটায় ৩০-৪০% বেশি ক্যালোরি বার্ন হয়। এটি শরীরের বিপাক হার বাড়ায়, ফলে ওজন কমানোর প্রক্রিয়া দ্রুততর হয়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ১০০ পা পিছনে হাঁটার ফলে যে পরিমাণ ক্যালোরি বার্ন হয়, তা প্রায় ১,০০০ পা সামনের দিকে হাঁটার সমতুল্য। এটি ওজন কমানোর সহজ ও কার্যকর উপায় হতে পারে, বিশেষ করে যারা খুব ব্যস্ত জীবনযাপন করেন এবং আলাদা করে ব্যায়ামের সময় বের করতে পারেন না।
৩. হৃদ্যন্ত্রের কার্যকারিতা বাড়ায়
উল্টো হাঁটা শুধু পেশির জন্য ভাল নয়, এটি কার্ডিওভাসকুলার স্বাস্থ্যও ভাল রাখে। যেহেতু এতে শরীর বেশি পরিশ্রম করে, তাই হৃদযন্ত্রকে বেশি কার্যকরভাবে কাজ করতে হয়। এর ফলে রক্তসঞ্চালন বৃদ্ধি পায়, রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে থাকে এবং হার্টের কর্মক্ষমতা বাড়ে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রতিদিন ২০-৩০ মিনিট উল্টো হাঁটলে হৃদরোগের ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে কমতে পারে।
৪. ভারসাম্য ও মস্তিষ্কের কর্মক্ষমতা বাড়ায়
উল্টো হাঁটার সবচেয়ে আকর্ষণীয় দিক হল, এটি মস্তিষ্কের কর্মক্ষমতা বাড়াতে সাহায্য করে। সামনে হাঁটার সময় আমাদের মস্তিষ্ক মূলত আশপাশের পরিবেশের ওপর মনোযোগ দেয়। কিন্তু পিছনের দিকে হাঁটতে গেলে পুরো মনোযোগ দিতে হয় শরীরের নড়াচড়া ও ভারসাম্য রক্ষার ওপর।
এই প্রক্রিয়ায় আমাদের স্নায়ুতন্ত্র আরও সক্রিয় হয়, মস্তিষ্ক ও শরীরের মধ্যে সমন্বয় বাড়ে এবং স্মৃতিশক্তি উন্নত হয়। গবেষণায় দেখা গেছে, যারা নিয়মিত উল্টো হাঁটার অনুশীলন করেন, তাদের স্মৃতিশক্তি ও প্রতিক্রিয়া সময় (reaction time) অন্যদের তুলনায় ভাল হয়।
এক গবেষণায় বলা হয়েছে, উল্টো হাঁটা অ্যালঝাইমার ও ডিমেনশিয়ার ঝুঁকি কমাতে সাহায্য করতে পারে। এটি মস্তিষ্কের নিউরোন সংযোগ উন্নত করে, যা বার্ধক্যজনিত স্মৃতিভ্রংশের বিরুদ্ধে কার্যকরী ভূমিকা রাখে।
কারা উল্টো হাঁটার ক্ষেত্রে সতর্ক থাকবেন?
উল্টো হাঁটার প্রচুর উপকারিতা থাকলেও এটি সবার জন্য উপযুক্ত নয়। কিছু বিষয়ে সতর্ক থাকতে হবে। যেমন, যাঁদের ভারসাম্য রক্ষার সমস্যা রয়েছে, তাঁরা উল্টো হাঁটার সময় সাবধানতা অবলম্বন করুন। যাঁদের স্নায়ুতন্ত্রজনিত সমস্যা আছে, তারা চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া উল্টো হাঁটবেন না। যাঁদের পায়ের জয়েন্ট বা হাঁটুর ব্যথা খুব বেশি, তাঁরা ধীরে ধীরে এই অভ্যাস শুরু করুন।
কোথায় এবং কীভাবে করবেন?
উল্টো হাঁটার অভ্যাস করতে চাইলে কিছু সতর্কতা মেনে চলতে হবে। যেমন, সমতল জায়গা বেছে নিন। পার্ক, খোলা মাঠ বা বাসার লিভিং রুমের মতো জায়গায় হাঁটুন, যেখানে বাধা কম থাকবে। ধীরে ধীরে শুরু করুন এই হাঁটা। প্রথমে ৫-১০ মিনিট হাঁটুন, তারপর ধীরে ধীরে সময় ও গতি বাড়ান। হালকা জুতা পরুন, যাতে ভারসাম্য রক্ষা সহজ হয় এবং পিছলে যাওয়ার ভয় না থাকে। আয়নার সামনে বা বন্ধুর সাহায্যে অভ্যস্ত হন প্রথমদিকে। পেছনে দেখে হাঁটার চেয়ে আয়নার সামনে অনুশীলন করলে সহজ হবে।
উল্টো হাঁটলে কতক্ষণ করবেন?
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দৈনিক ১৫-২০ মিনিট উল্টো হাঁটলেই পর্যাপ্ত উপকারিতা পাওয়া সম্ভব। তবে যদি একবারে বেশি সময় হাঁটতে না পারেন, তাহলে ৫ মিনিট করে তিনবার করলেও হবে।
উল্টো হাঁটার অনুশীলন শুরু করুন আজই!
ব্যস্ত জীবনে আলাদা করে ব্যায়ামের জন্য সময় বের করা কঠিন হয়ে যায়। কিন্তু উল্টো হাঁটা এমন এক অভ্যাস, যা সহজেই দৈনন্দিন জীবনে যুক্ত করা যায়। সামান্য পরিবর্তন আনলেই শরীর ও মনের জন্য এটি হতে পারে এক দারুণ স্বাস্থ্যকর অভ্যাস।
তাহলে আর দেরি কেন? আগামীকাল থেকে উল্টো হাঁটার অভ্যাস শুরু করে দিন এবং নিজের শরীরের পরিবর্তন নিজেই অনুভব করুন!