তিন মাস অন্তর একটি ইঞ্জেকশন—যা কিশোরী বয়সে অনিচ্ছাকৃত গর্ভধারণ রুখতে পারে, পাশাপাশি প্রথম ও দ্বিতীয় মাতৃত্বের মধ্যে প্রয়োজনীয় ব্যবধান বজায় রাখতে সাহায্য করে। ইতিমধ্যেই হাজার হাজার তরুণী এই পদ্ধতির আওতায় এসেছেন, এবং স্বাস্থ্য দফতরের দাবি—এর ইতিবাচক প্রভাবও ধীরে ধীরে চোখে পড়ছে। আর কারা নিতে পারেন এই ইঞ্জেকশন?

অন্তরা ইনঞ্জেকশন কারা নিতে পারেন?
শেষ আপডেট: 17 March 2026 16:33
দ্য ওয়াল ব্যরো: দক্ষিণ ২৪ পরগনার নানা অঞ্চলে বাড়ছে নাবালিকাদের অন্তঃসত্ত্বা হওয়ার ঘটনা। স্কুলের গণ্ডি পেরোনোর আগেই বিয়ের পিঁড়িতে বসা, আর তার কিছুদিনের মধ্যেই মাতৃত্বের ভার কাঁধে তুলে নেওয়ার ঘটনা প্রতি নিয়ত ঘটছে। ২০২৬ -এ দাঁড়িয়েও এই ঘটনা নিত্যদিনের। টিনএজ প্রেগন্যান্সি (Teenage pregnancy) বা কিশোরী বয়সে গর্ভধারণ তাই এই জেলার স্বাস্থ্য দফতরের কাছে দীর্ঘদিনের উদ্বেগের বিষয়। নানা সচেতনতা শিবির, প্রচার, পরামর্শ — সবই চলছে, তবুও সমস্যার শিকড় যে কত গভীরে, তা বারবার সামনে আসছে।
এই প্রেক্ষাপটে গতবছর এক নতুন কৌশল নেয় স্বাস্থ্য দফতর। শুধুমাত্র সচেতনতা নয়, সরাসরি প্রতিরোধের (Prevention) দিকেও জোর দেওয়া হয়। এই অঞ্চলে চিহ্নিত করা হয় হাজার হাজার কিশোরী বধূকে, তাঁদের সঙ্গে কথা বলে বোঝানো হয় অল্প বয়সে গর্ভধারণের ঝুঁকি—রক্তাল্পতা, অপুষ্টি, প্রসব জটিলতা থেকে শুরু করে নবজাতকের স্বাস্থ্যের ঝুঁকি পর্যন্ত। এই কথোপকথনের মধ্য দিয়েই উঠে আসে এক গুরুত্বপূর্ণ সমাধান—দীর্ঘমেয়াদি ও কার্যকর জন্মনিয়ন্ত্রণ (Contraception)।
সেই সমাধানের নামই ‘অন্তরা’। তিন মাস অন্তর একটি ইঞ্জেকশন—যা কিশোরী বয়সে অনিচ্ছাকৃত গর্ভধারণ রুখতে পারে, পাশাপাশি প্রথম ও দ্বিতীয় মাতৃত্বের মধ্যে প্রয়োজনীয় ব্যবধান বজায় রাখতে সাহায্য করে। ইতিমধ্যেই হাজার হাজার তরুণী এই পদ্ধতির আওতায় এসেছেন, এবং স্বাস্থ্য দফতরের দাবি—এর ইতিবাচক প্রভাবও ধীরে ধীরে চোখে পড়ছে।
কিন্তু কী এই ‘অন্তরা’ ইঞ্জেকশন (Injection)? কীভাবে কাজ করে এটি?
সরকারি হাসপাতাল থেকে মহিলাদের বিনামূল্যে এই গর্ভনিরোধক দেওয়া বেশ কয়েক বছর আগে থেকেই শুরু হয়েছে। এটি একটি ইঞ্জেকশন। মূলত প্রথম ডেলিভারির পর মহিলাদের এই ইঞ্জেকশন দিয়ে দেওয়া হয়। কারণ সেই সময়টা আবার অন্তঃসত্ত্বা হয়ে পরার সম্ভাবনা থাকে সর্বাধিক। যা বেশ ঝুঁকিরও । তাই দেওয়া হয় এই ইঞ্জেকশন। এই ইঞ্জেকশনের সবচেয়ে সুবিধা হল, একবার নিলে তিনমাস নিশ্চিন্ত। চিকিৎসা বিজ্ঞানে এই ইঞ্জেকশনের নাম, ‘ডেপো মেডরক্সি প্রোজেস্টেরন অ্যাসিটেট’ (ডিএমপিএ)৷ কয়েক বছর আগেই কেন্দ্রীয় সরকার স্বাস্থ্য ও পরিকল্যাণ মন্ত্রককে ডিএমপিএ ব্যবহারের ব্যাপারে নির্দেশিকা জারি করেছিল।
কতটা নিরাপদ?
পুরুলিয়া মেডিক্যাল কলেজের অধ্যাপক ও গাইনকোলজির প্রধান (Gynecologist) ডা. তারাশঙ্কর বাগ বলেন, “অন্তরা ইঞ্জেকশন হল প্রোজেস্টেরন হরমোনের ইঞ্জেকশন। এটি একবার নিলে তিন মাস পর্যন্ত গর্ভধারণ প্রতিরোধ করা সম্ভব। সন্তান হওয়ার পর গর্ভনিরোধক হিসেবে অনেক সময় ট্যাবলেট খেলে ব্রেস্ট মিল্ক উৎপাদনে প্রভাব পড়তে পারে। সেই জায়গায় অন্তরা ইঞ্জেকশন তুলনামূলকভাবে বেশি নিরাপদ। ‘অন্তরা’ অর্থাৎ প্রতি তিন মাস অন্তর একটি করে ইঞ্জেকশন নিতে হয়। বর্তমানে অনেকেই এটি নিতে পারেন। কারণ আমাদের রাজ্যে এখনও কিশোরী বধূর সংখ্যা কম নয়, পাশাপাশি অল্প বয়সে বিবাহ-পূর্ব গর্ভধারণের ঝুঁকিও বাড়ছে। এই পরিস্থিতিতে গর্ভনিরোধক বড়ির তুলনায় এই ইঞ্জেকশন বেশি কার্যকর ও নিরাপদ। ইঞ্জেকশনটি হাতে বা নিতম্বের পেশিতে দেওয়া হয়।"
সাধারণত গর্ভনিরোধক ট্যাবলেট (Oral contraceptive pills) ব্যবহার করলে মহিলাদের প্রতি মাসে টানা ২১ দিন ওষুধ খেতে হয়। অনেক ক্ষেত্রে টানা দু’দিন ওষুধ খেতে ভুলে গেলে গর্ভধারণের সম্ভাবনা থেকে যায়। ফলে এই পদ্ধতি সবসময় শতভাগ সফল হয় না। এছাড়া দূরবর্তী এলাকার মহিলাদের প্রতি মাসে স্বাস্থ্যকেন্দ্রে গিয়ে ওষুধ সংগ্রহ করতে গিয়ে নানা অসুবিধার সম্মুখীন হতে হয়। সেই দিক থেকে ইঞ্জেকশন পদ্ধতি এই ঝামেলা অনেকটাই কমায়।
আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল, গর্ভনিরোধক ট্যাবলেট গ্রহণ করলেও কিছু ক্ষেত্রে গর্ভধারণ হয়ে যেতে পারে। কিন্তু ইঞ্জেকশনের ক্ষেত্রে সেই আশঙ্কা অনেকটাই কম। তবে এই ইঞ্জেকশন নেওয়ার ফলে তিন মাস মাসিক বন্ধ থাকতে পারে, মাঝে মধ্যে হালকা স্পটিং হতে পারে। এর বাইরে তেমন উল্লেখযোগ্য পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া সাধারণত দেখা যায় না। তিন মাস পর পুনরায় ইঞ্জেকশন না নিলে শরীর স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসে এবং অন্য কোনও দীর্ঘমেয়াদি সমস্যা হয় না।
অবিবাহিতদের ক্ষেত্রে অনেকেরই প্রশ্ন থাকে এই ইঞ্জেকশন নিয়ে মাসিক বন্ধ থাকলে কোনও সমস্যা হবে কিনা? গাইনোকোলজিস্ট ডা. সুরজিৎ ঘোষের কথায়,কে কী উপায়ে কন্ট্রাসেপশন নেবেন বা জন্মনিয়ন্ত্রণ করবেন সেটা নির্ভর করে একেক জনের নিজস্ব সিদ্ধান্তের উপর। এখানে জোড় করার কোনও ব্যাপার নেই। তবে অন্তরা ইঞ্জেকশন অবিবাহিতরাও নিতে পারে, মাসিক বন্ধ থাকলে শারীরিক অন্যান্য সমস্যা কিছু হয় না। এই ইঞ্জেকশন নেওয়া বন্ধ করলে আবার আগের অবস্থাতেই সবকিছু ফিরে আসে। পরবর্তীকালে স্বাভাবিক নিয়মে গর্ভধারণ করতেও কোনও সমস্যা নেই। তবে কেউ যদি টানা ৪-৫ বছর ধরে এইভাবে ইঞ্জেকশন নেন তবে তার একটা সাইডএফেক্ট থাকে। তখন কোলেস্টেরল বাড়তে পারে ও অনান্য সমস্যা হয়। তখন সেইসব আনুষঙ্গিক টেস্ট করার প্রয়োজন পড়ে। তবে ৬মাস-একবছর এই পদ্ধতিতে কন্ট্রাসেপশন নেওয়াই যাই চিকিৎসকের পরামর্শ মতো ।
কারা নিতে পারবেন?
যাঁরা সদ্য মা হয়েছেন, নাবালিকা বধূ, অথবা অল্পবয়সি যাঁরা সঙ্গীর সঙ্গে শারীরিক সম্পর্কে যুক্ত, যাঁরা মা হতে চাইছেন না — তাঁরা চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী এই ইঞ্জেকশন নিতে পারেন। কন্ট্রাসেপ্টিভ পিল অনেক সময় ব্যর্থ হতে পারে, কিন্তু এই ইঞ্জেকশন অত্যন্ত কার্যকর। অনেক ক্ষেত্রে ইঞ্জেকশন নেওয়ার আগে কাউন্সেলিং করা হয়, যাতে ব্যবহারকারী বিষয়টি ভালভাবে বুঝতে পারেন।
ইঞ্জেকশন নিলে মাসিক কিছু সময়ের জন্য বন্ধ থাকলেও এতে স্থায়ীভাবে মোটা হয়ে যাওয়া বা ব্রণ বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা নেই। ভবিষ্যতে গর্ভধারণের ক্ষেত্রেও কোনও সমস্যা হয় না। তাই টিনএজারদের ক্ষেত্রেও কন্ট্রাসেপ্টিভ পিলের বিকল্প হিসেবে এই পদ্ধতি নিয়ে সচেতন হওয়া জরুরি। যেকোনও সরকারি স্বাস্থ্যকেন্দ্রে এই ইঞ্জেকশন উপলব্ধ।