সবসময় কি মন এক জায়গায় বসে না? কাজে মন বসাতে সমস্যা হচ্ছে বা অল্পতেই মেজাজ হারাচ্ছেন? একে সাধারণ অস্থিরতা ভেবে ভুল করছেন না তো?
ব্রিটেনের সাম্প্রতিক গবেষণা থেকে আমাদের রাজ্যের চিকিৎসকদের মতামত—শিশু থেকে বয়স্ক, অজান্তেই থাবা বসাচ্ছে ADHD! জেনে নিন এই রোগের ৯টি 'লুকানো' লক্ষণ এবং সঠিক সময়ে সতর্ক হওয়ার উপায়।

এডিএইচডি থাকলে শিশুদের মন বসে না কোনও কিছুতেই!
শেষ আপডেট: 9 March 2026 14:08
দ্য ওয়াল ব্যুরো: বর্তমানে ব্রিটেনে ADHD (Attention Deficit Hyperactivity Disorder) নিয়ে শোরগোল চরমে। সম্প্রতি ৩২ জন বিশেষজ্ঞের একটি প্যানেল 'ব্রিটিশ জার্নাল অফ সাইকিয়াট্রি'-তে একটি চাঞ্চল্যকর রিপোর্ট প্রকাশ করেছেন। তাঁদের দাবি, ব্রিটেনে ADHD-র দাপট যতটা ভাবা হচ্ছে, আসলে পরিস্থিতি তার চেয়েও জটিল। অনেক ক্ষেত্রেই রোগ নির্ণয় হচ্ছে না (Underdiagnosed), যার ফলে সঠিক চিকিৎসা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন লক্ষ লক্ষ মানুষ। বিশেষ করে শিশুদের মধ্যে এই সমস্যা বাড়ছে। অন্যদিকে এদেশেও শিশুদের মধ্যে এই অসুখ সমানভাবে বাড়ছে বলেই মত রাজ্যের চিকিৎসকমহলের।
আসল তথ্য কী বলছে?
গবেষকদের মতে, ব্রিটেনে প্রতি ২০ জন শিশুর মধ্যে ১ জন (৫.৪ শতাংশ) এবং ৩.৩ শতাংশ প্রাপ্তবয়স্ক এই সমস্যায় আক্রান্ত। যদিও এখন এই সমস্যা নিয়ে ক্লিনিকে যাওয়ার হার বাড়লেও, তা মোট আক্রান্তের সংখ্যার তুলনায় সেই প্রবণতা অনেক কম। অর্থাৎ, সচেতনতা বাড়লেও এখনও বহু মানুষ চিকিৎসকের নাগালের বাইরে। এদেশের চিত্রটা আরও জটিল। শিশুদের মধ্যে এই সমস্যা আছে সেটা অধিকাংশ বাবা-মায়েরা বোঝেন না। তাই চিকিৎসা করানো অতীত।
ব্রিটেনের মতো দেশেই এই অসুখ নিয়ে শিশু ছাড়াও বয়স্করা ভুগছেন কিন্তু ঠিক সময়ে রোগ নির্ণয় করেন না অধিকাংশই। প্রথম বিশ্বের দেশেই যদি এই অবস্থা হয় তা হলে আমাদের দেশ তথা রাজ্যে এই অসুখ কতটা অবহেলিত তা বলার অপেক্ষা রাখে না।
জানুন, ADHD ঠিক কী?
ADHD-এর লক্ষণগুলি শৈশব থেকেই দেখা দিতে শুরু করে এবং প্রাপ্তবয়স্ক হওয়া পর্যন্তও চলতে পারে। মনোযোগ ঘাটতি হাইপারঅ্যাকটিভিটি ডিসঅর্ডার হল একটি স্নায়ুবিক বিকাশজনিত অবস্থা। ADHD-র কোনও প্রতিকার নেই। ওষুধ এবং আচরণগত থেরাপি এই রোগের লক্ষণগুলি ম্যানেজ করতে সাহায্য করতে পারে।
প্রাপ্তবয়স্কদের মধ্যে ৯টি 'লুকানো' লক্ষণ:
ADHD মানেই কেবল দুরন্তপনা বা এক জায়গায় স্থির হয়ে বসে থাকতে না পারা নয়। প্রাপ্তবয়স্কদের ক্ষেত্রে এর লক্ষণগুলো বেশ সূক্ষ্ম হতে পারে। বিশেষজ্ঞরা ৯টি বিশেষ লক্ষণের কথা বলছেন:
১. সময়ের ধারণা হারানো (Time Blindness): কাজ শেষ করতে কত সময় লাগবে বুঝতে না পারা বা সবসময় দেরি করে ফেলা।
২. অগোছালো জীবন: বাড়ি বা টেবিল সবসময় অগোছালো থাকা, প্রয়োজনীয় জিনিস খুঁজে না পাওয়া।
৩. হাইপার-ফোকাস: কোনও কাজ ভাল লেগে গেলে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অন্য সব ভুলে ডুবে থাকা।
৪. গড়িমসি করা (Procrastination): কাজের চাপে খেই হারিয়ে ফেলা এবং জরুরি কাজ ফেলে রাখা।
৫. আবেগ নিয়ন্ত্রণহীনতা: হুট করে রাগ করা, অতিরিক্ত আনন্দ বা অল্পতেই ভেঙে পড়া।
৬. না বলতে না পারা: নিজের ব্যস্ততার মাঝেও অন্যকে খুশি করতে সব কাজে 'হ্যাঁ' বলে দেওয়া।
৭. অধৈর্য হওয়া: কথা বলার মাঝে অন্যকে থামিয়ে দেওয়া বা লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে চরম অস্বস্তি।
৮. অস্থিরতা: হাত-পা নাড়ানো, অকারণে পায়চারি করা বা ভেতরে ভেতরে ছটফট করা।
৯. মনঃসংযোগের অভাব: বাইরের আওয়াজ বা নিজের মনের ভেতরের চিন্তায় বারবার কাজে ব্যাঘাত ঘটা।
বিপদ কোথায়?
অধ্যাপক কর্টেস সাবধান করেছেন যে, সঠিক চিকিৎসা না হলে ADHD আক্রান্তদের পথ দুর্ঘটনার ঝুঁকি, আত্মহত্যার প্রবণতা এবং নেশার প্রতি আসক্তি বেড়ে যায়। কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ট্যামসিন ফোর্ড জানান, দীর্ঘ অপেক্ষার কারণে অনেকেই প্রাইভেট ক্লিনিকে ছুটছেন, যেখানে অনেক সময় ভুল চিকিৎসা বা 'মিস-ডায়াগনসিস'-এর ভয় থাকে।
কেন বাড়ছে?
কেন শিশুদের মধ্যে এডিএইচডি-র সমস্যা হয় তার কোনও সঠিক উত্তর বিজ্ঞানসম্মতভাবে এখনও বলা সম্ভব হয়নি। তবে গত বছর ল্যানসেট অবস্টেট্রিকস অ্যান্ড গাইনোকোলজি–তে প্রকাশিত একটি গবেষণাপত্রে গর্ভাবস্থায় মায়ের কিছু ভুল থেকে শিশুদের মধ্যে এই রোগের প্রবণতা তৈরি হয় তা বলা হয়। বিশেষ করে গর্ভাবস্থায় মায়েরা বেশি প্যারাসিটামল সেবন করলে সন্তানের এই সমস্যার ঝুঁকি বাড়তে পারে। এমনকি হতে পারে অটিজমও। কারণ এই ধরনের অনিয়মের পাশাপাশি জিনগত কারণও থাকতে পারে। শুরুতেই সতর্ক হলে আজীবন বয়ে বেড়াতে হয় না এই অসুখ।
চিকিৎসা কী?
বিশেষজ্ঞদের মতে, সাইকোলজিক্যাল থেরাপি, সোশ্যাল স্কিল ট্রেনিং এবং প্রয়োজনে ওষুধের মাধ্যমে এই সমস্যা নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব। তবে তার জন্য প্রয়োজন সঠিক সময়ে সঠিক রোগ নির্ণয়। অসুখ ফেলে রাখলে বিপদ।
ব্রিটেনের ন্যাশনাল হেলথ সার্ভিস (NHS)-এর তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে বহু রোগী এই অসুখ নিয়ে ঘুরছেন কিন্তু সময়ে রোগ নির্ণয় হচ্ছে না। বিবিসি-র এক তদন্তে দেখা গেছে, অনেক জায়গায় এই জট কাটতে ৮ বছর পর্যন্ত সময় লাগতে পারে। তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কেবল ব্যক্তিত্বের বৈশিষ্ট্য নয়, যদি এই লক্ষণগুলো আপনার কর্মজীবন বা সম্পর্কে অন্তত ৬ মাস ধরে নিয়মিত নেতিবাচক প্রভাব ফেলে, তবেই এটি ADHD হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। তাই শুধু ব্রিটেনবাসীরাই নন, এদেশেও কারও যদি এমন লক্ষণ থাকে, তবে শুরুতেই সজাগ হন।