শরীরে সুচ ফোটালে কি খুব ব্যথা লাগে? আকুপাংচার পদ্ধতি ঠিক কীভাবে কাজ করে এবং কোন কোন কঠিন অসুখে এটি কার্যকর, জানালেন বিশেষজ্ঞরা।

আকুপাংচার চিকিৎসা একেবারেই ব্যথাদায়ক নয়
শেষ আপডেট: 28 February 2026 12:56
দ্য ওয়াল ব্যুরো: শরীরে সুচ ফোটানো—শুনলেই অনেকের গা শিউরে ওঠে। “ইচ্ছা করে কেউ সুচ ফোটায় নাকি?”—এ প্রশ্নও অস্বাভাবিক নয়। কিন্তু হাজার বছরের প্রাচীন চিকিৎসাপদ্ধতি আকুপাংচার (Acupuncture) আজও সমান জনপ্রিয়, বরং সময়ের সঙ্গে তা আরও বিস্তৃত হয়েছে। তাহলে কি এতে সত্যিই উপকার আছে? আর সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—ব্যথা লাগে কি?
ক্লেভল্যান্ড ক্লিনিক (Cleveland Clinic)-এর লাইসেন্সপ্রাপ্ত আকুপাংচার বিশেষজ্ঞ টিম সোবর কথায়, “কখনও কখনও সুচ ঢোকানোর সময় হালকা চিমটি লাগার মতো অনুভূতি হতে পারে। কিন্তু সামগ্রিকভাবে বলতে গেলে, আকুপাংচার খুব একটা ব্যথাদায়ক নয়।”
একটি সামগ্রিক পর্যালোচনায় দেখা গিয়েছে, আকুপাংচার নেওয়া মানুষের মধ্যে মাত্র ৩.৭৫ শতাংশ সুচ ফোটানোর জায়গায় ব্যথার কথা জানিয়েছেন। শিশু-কিশোরদের (৮ থেকে ২১ বছর বয়সি) উপর হওয়া একটি গবেষণায় আকুপাংচারকে বলা হয়েছে “প্রায় ব্যথাহীন এবং বেশ গ্রহণযোগ্য” চিকিৎসাপদ্ধতি।
আকুপাংচার কীভাবে কাজ করে?
আকুপাংচার সুতোর মতো সরু স্টিলের সুচ শরীরের নির্দিষ্ট পয়েন্টে প্রবেশ করিয়ে স্নায়ুকে উদ্দীপিত করা হয়। এই প্রক্রিয়ায় শরীরের জৈব-রাসায়নিক প্রতিক্রিয়া সক্রিয় হয়, যার ফলে ব্যথা ও অন্যান্য উপসর্গ নিয়ন্ত্রণে আসে। আরও সহজ করে বললে, শরীরের বিভিন্ন কেমিক্যালের নিঃসরণ কমানো বা বাড়ানোর মাধ্যমে সমস্যাকে বাগে আনা সম্ভব হয়। এটি শরীরের প্রতিরোধক্ষমতা বাড়াতে, হরমোনের ভারসাম্য বজায় রাখতে এবং স্নায়ুতন্ত্রকে সঠিকভাবে কাজ করতে সহায়তা করে।এই পদ্ধতি রক্তসঞ্চালন বাড়ায়, প্রদাহ কমায় এবং শরীরের প্রাকৃতিক ব্যথানাশক প্রক্রিয়াকে সক্রিয় করে। ফলে দীর্ঘস্থায়ী ব্যথা, মাথাব্যথা, পেশির টান, স্ট্রেস ইত্যাদি সমস্যায় এটি ব্যবহৃত হয়।
কোন কোন সমস্যায় কার্যকর?
এরাজ্যের পেন ম্যানেজমেন্ট ও আকুপাংচার বিশেষজ্ঞ ডা. সৈকত ঘোষ জানান, ব্যথা নিরাময়ে এই পদ্ধতি সবচেয়ে কার্যকর। তা হাড়-পেশিজনিত হোক বা স্নায়ুজনিত ব্যথা—উভয় ক্ষেত্রেই উপকার মেলে। যে কোনও ব্যথা দীর্ঘদিন ধরে থাকলে (ক্রনিক পেইন), তখন এই পদ্ধতি অনেক সময় সুরাহা দেয়। এছাড়া ভাসক্যুলার সমস্যা, অর্থাৎ শিরা-ধমনিতে রক্ত চলাচলের সমস্যা থাকলেও আকুপাংচার সহায়ক হতে পারে। ফুসফুসজনিত কিছু সমস্যাতেও এটি প্রয়োগ করা হয়। সঙ্গে আরও অজস্র অসুখে কার্যকর এই চিকিৎসা পদ্ধতি।
এরাজ্যে থেকেই ডা. ডা. বিজয়কুমার বসু সারাদেশকে চিনিয়ে ছিলেন আকুপাংচার চিকিৎসার সুবিধা। এই চিকিৎসার উৎপত্তি চিন দেশে। সুচ ছাড়াও কিছু বিশেষ ধরনের তাপ প্রয়োগের পদ্ধতি ব্যবহার করেও চিকিৎসা করা হয়। রোগীর সমস্যার ধরন অনুযায়ী পদ্ধতি নির্ধারিত হয়।
শুধু এরাজ্যে নয়, বিশ্বজুড়ে আগ্রহ
প্রায় পাঁচ হাজার বছরের পুরনো এই চিকিৎসাপদ্ধতির জন্ম চিনে। বর্তমানে বিশ্বের ১২০টিরও বেশি দেশে এটি চর্চিত। World Health Organization (হু) ১৯৭৯ সালে আকুপাংচারকে স্বীকৃতি দেয়। ২০০৩ সালে ‘হু’ একটি তালিকা প্রকাশ করে, যেখানে ১০৩টি শারীরিক সমস্যায় আকুপাংচার কার্যকর বলে উল্লেখ করা হয়।
ভারতে আকুপাংচারের প্রবর্তক ছিলেন এ রাজ্যের চিকিৎসক ডা. বিজয়কুমার বসু। তাঁকে ভারতের ‘ফাদার অফ আকুপাংচার’ বলা হয়। বর্তমানে রাজ্যে ৩৩টি সরকারি আকুপাংচার সেন্টার রয়েছে। কলকাতায় ডা. বি কে বসু মেমোরিয়াল রিসার্চ অ্যান্ড ট্রেনিং ইনস্টিটিউট অফ আকুপাংচার সরকারি আকুপাংচার চিকিৎসা ব্যবস্থার প্রধান কার্যালয়।
এই পদ্ধতিতে কি ইঞ্জেকশনের মতো ব্যথা হয়?
আকুপাংচারে ব্যবহৃত সুচ ইঞ্জেকশনের সুচের তুলনায় অনেক বেশি সূক্ষ্ম। এবং খুব গভীরে প্রবেশ করানোর প্রয়োজন হয় না। ত্বকের নিচে অল্প গভীরতায় সুচ প্রবেশ করিয়েই চিকিৎসা করা হয়। তাই আকুপাংচার করলে ইঞ্জেকশনের মতো ব্যথা লাগবে—এ ধারণা ঠিক নয়।
ভয় কাটাবেন কীভাবে?
অনেকেই সুচভীতিতে ভোগেন। বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ, চিকিৎসা শুরুর আগে খোলাখুলি কথা বলুন। পুরো প্রক্রিয়াটি বুঝে নিলে এবং সুচের আকার দেখলে অধিকাংশ মানুষের ভয় অনেকটাই কমে যায়। অনেক রোগীর অভিজ্ঞতা—প্রথমবার ভয় পেলেও পরে বুঝেছেন, বিষয়টি ততটা ভীতিকর নয়। বরং আরাম পেলে তাঁরা নিয়মিত চিকিৎসা নিতে ফিরে আসেন।
সব মিলিয়ে, আকুপাংচার সাধারণত কম ব্যথাযুক্ত একটি চিকিৎসাপদ্ধতি। তবে যেকোনও চিকিৎসার আগে প্রশিক্ষিত ও প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়াই নিরাপদ।