
শেষ আপডেট: 3 February 2024 23:27
দ্য ওয়াল ব্যুরো: এই জরায়ুমুখের ক্যানসার ক্রমেই ভারতীয় মহিলাদের কাছে আতঙ্কের কারণ হয়ে উঠছে। গতকাল বাজেট পেশের সময়েই কেন্দ্রীয় অর্থমন্ত্রী নির্মলা সীতারমন সার্ভিক্যাল ক্যানসার বা জরায়ুমুখের ক্যানসার নিয়ে সচেতন করেছিলেন। এমনকী মারণ রোগ ঠেকাতে ৯ থেকে ১৪ বছর বয়সিদের খুব তাড়াতাড়ি টিকা দেওয়ার কথাও ঘোষণা করেছিলেন।
জরায়ুমুখের ক্যানসার বা সার্ভিকাল ক্যানসার নিয়ে সচেতনতা চলছে নানা দিকেই। ভারতীয় মহিলাদের সব থেকে বেশি এই ক্যানসারই হয়। জরায়ুর একেবারে নীচের অংশকে বলে জরায়ুর মুখ বা ‘সার্ভিক্স অব দ্য ইউটেরাস’। এখানেই ক্যানসার হয়। একেই সার্ভিকাল ক্যানসার বলে। জরায়ুমুখের ক্যানসার হচ্ছে কিনা তার কিছু সাধারণ উপসর্গ আছে। অনেক সময়েই মেয়েরা সেটা বুঝতে পারেন না। ডাক্তারবাবুরা বলছেন, এই লক্ষণ সবচেয়ে আগে ধরা পড়ে। সেটা খেয়াল করেই সতর্ক হতে হবে।
জরায়ুমুখের ক্যানসার কেন হয়?
জরায়ুর একেবারে নীচের অংশকে বলে জরায়ুর মুখ বা সার্ভিক্স অব দ্য ইউটেরাস। এখানেই ক্যানসার হয়। জরায়ুর নীচের অংশ যোনির সঙ্গে সংযুক্ত। হিউম্যান প্যাপিলোমা ভাইরাস (এইচপিভি)এখানেই সংক্রমণ তৈরি করে। যৌন সংসর্গের সময় এই সংক্রমণ ছড়াতে পারে। এইচপিভি ভাইরাস শরীরে প্রতিরোধ ক্ষমতাকে ভেঙে তছনছ করে দেয়। বহুদিন অবধি টিকে থাকতে পারে এই ভাইরাস। জরায়ুর কোষের অস্বাভাবিক বিভাজন ঘটিয়ে ক্যানসার তৈরি করতে পারে।
ভারতীয় মহিলাদের ১৬ শতাংশই জরায়ুর ক্যানসারে ভোগেন। স্তন ক্যানসারের পরে সবচেয়ে বেশি জরায়ুর ক্যানসারে ভোগেন ভারতের মা-বোনেরা। ১৫ বছরের পর থেকে ৩০ বছর অবধি মহিলাদের জরায়ু মুখের ক্যানসারের ঝুঁকি বেশি। ত্রিশের পরেও মহিলারা এই রোগ থেকে সম্পূর্ণ নিরাপদ নন। অনেকক্ষেত্রেই যোনিতে সংক্রমণ হলে, লজ্জা ও অস্বস্তির কারণে রোগ জানাতে চান না মহিলারা। ডাক্তারের কাছে যেতে দেরি হয়। ফলে চিকিৎসাও দেরিতে শুরু হয়। ক্যানসার তার অন্তিম পর্যায়ে পৌঁছে যায়। তাই সচেতনতা সবচেয়ে আগে দরকার। বিশ্বে প্রায় এক তৃতীয়াংশ মহিলার মৃত্যুর কারণ জরায়ুর ক্যানসার।
অস্বাভাবিক রকমের ভ্যাজাইনাল ব্লিডিং হলে সতর্ক হতে হবে। মাসে এক বার পিরিয়ডের সময়ে ব্লিডিং স্বাভাবিক। কিন্তু দু’টি পিরিয়ডের মাঝে এক বার ব্লিডিং হলে সতর্ক হতে হবে।
মেয়েদের অত্যধিক সাদা স্রাবও একটি অন্যতম লক্ষণ। অস্বাভাবিক সাদা স্রাব, থকথকে সাদা এবং দুর্গন্ধযুক্ত স্রাব হলে সতর্ক হতে হবে। ডাক্তারবাবুরা বলছেন, সাদা স্রাবের দুর্গন্ধ কিন্তু জরায়ুমুখ ক্যানসারের একটি বড় ইঙ্গিত। মেয়েদের এটা খেয়াল করতেই হবে। এমন উপসর্গ দেখা দিলে সঙ্গে সঙ্গে ডাক্তারের কাছে যেতে হবে।
জরুয়ুমুখ ক্যানসার যদি বাড়তে থাকে শরীরে, তবে আরও একটি কথা মনে রাখতে হবে। সাদা স্রাবের সময়ে সাধারণত এমন ক্ষেত্রে তলপেটে বেশ ব্যথা হয়। দুর্গন্ধ এবং ব্যথা, দু’টি জিনিস ইঙ্গিত দিতে পারে শরীরের ভিতরে ক্যানসার বাড়ছে।
পিরিয়ডের দিনগুলিতে প্রস্রাবের সময় ব্যথা হলেও সতর্ক হতে হবে।
জরায়ুর ক্যানসারের চারটি পর্যায়ে আছে। শুরুতেই রোগ ধরা পড়লে দ্রুত চিকিৎসা সম্ভব। কিন্তু চার ধাপে বাড়াবাড়ি হলে সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়তে পারে সারা শরীরে।
প্রথম পর্যায়ে ক্যানসার কোষ ছোট থাকে। লিম্ফ নোডে শুধু ছড়িয়ে পড়তে পারে।
দ্বিতীয় পর্যায়ে বিভাজন ঘটিয়ে ক্যানসার কোষ আরও বড় হয়। তখন জরায়ুর বাইরেও ধীরে ধীরে ডালপালা মেলতে পারে।
তৃতীয় ধাপে ক্যানসার কোষ আরও পরিপুষ্ট হয়। যোনির নীচের অংশেও সংক্রমণ দানা বাঁধে। মূত্রাশয় থেকে মূত্রনালীতে সংক্রমণ ছড়াতে পারে। সেই সময় প্রস্রাব করতে গেলে ব্যথা হয়।
চতুর্থ পর্যায়ে পেলভিসের বাইরেও ছড়িয়ে পড়ে ক্যানসার। ফুসফুস, লিভারে সংক্রমণ বাসা বাঁধতে পারে।
সার্ভিক্যাল ক্যানসার রুখতে টিকা আসছে দেশে
জরায়ুমুখের ক্যানসার ঠেকাতে এইচপিভি ভ্যাকসিন তৈরি করেছে পুণের সেরাম ইনস্টিটিউট অব ইন্ডিয়া। এই টিকার নাম কোয়াড্রিভ্যালেন্ট হিউম্যান প্যাপিলোমাভাইরাস (Quadrivalent Human Papillomavirus vaccine (qHPV)) । তিন পর্যায়ের ট্রায়ালের পরে এই টিকায় অনুমতি দিয়েছে কেন্দ্রীয় ড্রাগ কন্ট্রোল।
সেরাম ইনস্টিটিউট ও কেন্দ্রীয় সরকারের নেতৃত্বীধান ডিপার্টমেন্ট অফ বায়োটেকনোলজি যৌথ ভাবে এই টিকা তৈরি করেছে। ৯ থেকে ১৪ বছর বয়সি কিশোরীদের টিকাকরণ কর্মসূচীতে অন্তর্ভুক্ত করা হবে। সেরামের একজন শীর্ষ আধিকারিক প্রকাশ কুমার সিং বলছেন, CERVAVAC ভ্যাকসিন জরায়ুমুখের ক্যানসার সারাতে ১০০০ গুণ বেশি ভাল কাজ করবে। এই ভ্যাকসিনের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়াও কম বলে দাবি করেছেন সেরামের বিজ্ঞানীরা।
সেরামের কর্ণধার আদর পুনাওয়ালা বলছেন, এই টিকা বাজারে এলে বিদেশের উপর নির্ভরশীলতা অনেকটাই কমবে। এখন বাজারে যে ওষুধ পাওয়া যায়, তার দাম অনেক বেশি। ভারতে তৈরি টিকা বাজারে এলে দামও কমবে বলেই আশা।