
শেষ আপডেট: 22 December 2023 17:04
দ্য ওয়াল ব্যুরো: দু-এক প্রজন্ম আগে রূপকথার দেশ বেড়িয়ে আসা লোক ছিল হাতেগোনা। বাঙালির দীপুদা থুরি দিঘা-পুরী-দার্জিলিং-এর বাইরে নিদেনপক্ষে কাশ্মীর, লাদাখ, দক্ষিণ ভারতই ছিল গড় বাঙালির বেড়ানোর জায়গা। এখন অবস্থা বদলে গিয়েছে। মিশরের মমি, স্ফিংস, তুতেনখামেনের সমাধি দেখে এসেছেন— কেবল কলকাতাতেই সে রকম পর্যটকের সংখ্যা কয়েক হাজার। ইউরোপ, , মার্কিন মুলুক, চিন, শ্রীলঙ্কা, দূর প্রাচ্যে যাওয়ার ইচ্ছুকের সংখ্যাও এখন অনেক।
কিন্তু অনেক সময়ই বিদেশ দর্শনে প্রতিবন্ধকতা হয়ে দাঁড়ায় খরচ। তার উপর ভিসার ঝক্কি তো আছেই। ভ্রমণ বিশেষজ্ঞরা কিন্তু বলছেন এমন বেশ কিছু দেশ রয়েছে যেগুলি ঘুরতে মাথাপিছু চল্লিশ-পঞ্চাশ হাজার টাকার বেশি খরচ হওয়ার কথা নয়। অনেকেই এখন ৪০-৫০ হাজার টাকার ফোন কিনতেও দ্বিধা করেন না। কাজেই সে দিক থেকে চিন্তা করলে, একটা স্মার্টফোন কিনতে যে খরচ হয়। তার চেয়েও কম খরচে ঘুরে নেওয়া যেতে পারে বিদেশ।
২০২৩ শেষ হতে চলল। এ বছর দেশ-বিদেশ মিলিয়ে ছুটি কাটানোর জন্য সবচেয়ে বেশি যে জায়গাগুলো সার্চ করা হয়েছে তার মধ্যে ১০ টা নাম তো খুবই চেনা। বছর শেষের আগে আপনিও হয়ত ঘুরে আসতে চান তেমনই কয়েকটি জায়গায়। তাহলে জেনে নিন খুঁটিনাটি।
১) ভিয়েতনাম
বিমানপথে কলকাতা থেকে হ্যানয় কিংবা হো-চি-মিন শহরে যাওয়া-আসা বাবদ খরচ শুরু ১৬ হাজার টাকা থেকে। থাকা খাওয়ার খরচ মাথাপিছু হাজার তিনেক। ভিয়েতনামের রাজধানী হ্যানয় শহর থেকে ১৬৫ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত ‘হা লং বে’ বা হা লং উপসাগর, প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের নিরিখে যে অঞ্চলটির খ্যাতি জগৎজোড়া। ১৯৯৪ সালে ইউনেস্কো হা লং উপসাগরকে ‘ওয়র্ল্ড হেরিটেজ সাইট’ হিসেবে ঘোষণা করে।
২) গোয়া
গোয়া অবশ্য শুধু সৈকতের জন্য পর্যটকদের টানে তা নয়। সেখানকার সংস্কৃতি, ঐতহ্য এবং জীবনশৈলীও বড় আকর্ষণের। গোয়ায় ঘোরার চার দিন, পাঁচ রাতের প্যাকেজ আছে আইআরসিটিসির। বিমানে কলকাতা থেকে রওনা এবং কলকাতায় ফেরা। যাতায়াতের সঙ্গে থাকা, খাওয়ার দায়িত্বও নেবে আইআরসিটিসি। খরচ প্যাকেজ অনুযায়ী ২৫ থেকে ৩৫ হাজারের মধ্যেই।
নির্জন সমুদ্রের সান্নিধ্য চাইলে দক্ষিণ গোয়া যেতেই হবে। পানজিম থেকে ঘণ্টা তিনেকের পথ। সাদা বালি, নীলচে-সবুজ জল আর নারকেল গাছের সারিতে সাজানো পালোলেম বিদেশি পর্যটকদের ভীষণ প্রিয়। অক্টোবর থেকে ফেব্রুয়ারির ভরা মরসুমে এখানে অ্যাডভেঞ্চার স্পোর্টসের বন্দোবস্ত থাকে। স্রেফ শুয়ে-বসে দিন কাটানোর জন্যেও পালোলেম চমৎকার।
৩) বালি
ইন্দোনেশিয়া অর্থাৎ দ্বীপের দেশ। অনেকেই হয়তো জানেন না যে গোটা দেশটি জুড়ে রয়েছে ১৭,০০০ -এরও বেশি দ্বীপ। আর ইন্দোনেশিয়ার কথা বললে, প্রথমেই যে জায়গার কথা মনে পড়ে, সেটি হল বালি। কেন না বালির প্রাকৃতিক সৌন্দর্য্য, পরিবেশ, এখানকার মন্দির, অধিবাসী, তাঁদের সংস্কৃতি ও জীবনপদ্ধতি মানুষকে বিশেষভাবে আকর্ষণ করে। মূলত ১৯৮০-এর পরে থেকে এই এলাকার চেহারাটাই পাল্টে যায়। বর্তমানে এখানে সারা বছর ধরেই এত পর্যটক আসে যে এই এলাকা ইন্দোনেশিয়ার সবচেয়ে বড় বাণিজ্যিক এলাকায় পরিণত হয়েছে।
সমুদ্র যারা ভালবাসেন, তাঁদের কাছে বালির বিকল্প খুঁজে পাওয়া মুশকিল। ওয়াটার অ্যাডভেঞ্চারের অন্যতম সেরা ঠিকানা এই বালি। বালির তানাহ লট মন্দির, উলুয়াতু মন্দির, বিশাখী মন্দির, বালির সংস্কৃতির প্রাণকেন্দ্র উবুদ ঘুরতেই হবে।
৪) শ্রীলঙ্কা
বর্তমানে অস্থির রাজনৈতিক পরিস্থিতির মধ্যে থাকলেও পর্যটকদের পকেটের জন্য শ্রীলঙ্কা কিন্তু বেশ স্বাস্থ্যকর। কলকাতা থেকে যাওয়া-আসা মিলিয়ে শ্রীলঙ্কার বিমান খরচ শুরু হয় প্রায় ২০ হাজার টাকা থেকে। দিন প্রতি থাকা খাওয়ার খরচ কম বেশি দু-আড়াই হাজার টাকার মতো।
হাতে খুব বেশি সময় না থাকলে ক্যান্ডি, নুয়েরাএলিয়া, সীতাএলিয়া, গ্রেগরি লেক ঘুরে দেখা যেতে পারে। পিনাওয়ালা এলিফ্যান্ট অরফ্যানেজ না দেখলে ঘোরাটাই অসম্পূর্ণ থাকবে। সেখানে একসঙ্গে প্রায় ৫০-৬০টি হাতির বাস। শ্রীলঙ্কা কিন্তু বিখ্যাত দারুচিনির জন্য। তাই মাড়ু নদীর ধারে দারুচিনি দ্বীপ থেকে ঘুরে আসাই যায়। ফিরতি পথে রাজধানী শহর কলম্বো ঘুরে দেখে নিতে পারেন।
৫) তাইল্যান্ড
সমুদ্র সৈকত, পাহাড় কিংবা ইতিহাসে মোড়া প্রাচীন সব মন্দির। তাইল্যান্ডে দেখার জিনিসের শেষ নেই। প্লেনের টিকিট কেটে রাখতে হবে আগে থেকে। যাতায়াত মিলিয়ে বিমানভাড়া পড়বে মাথাপিছু হাজার পনেরো। থাকা-খাওয়ার খরচ ভারতের যে কোনও পর্যটনস্থলের মতোই। দিন পাঁচেকের জন্য ব্যাঙ্কক-পাটায়া ঘুরে আসতে চাইলে মাথাপিছু তিরিশ হাজারের বেশি খরচ হওয়ার কথা নয়।
মধুচন্দ্রিমার জন্য তাইল্যান্ডকে রাখতে পারেন পছন্দের তালিকায়। ফিফি দীপপুঞ্জ, ক্রাবি দীপপুঞ্জ, কোহ লান্তার সৈকতের সৌন্দর্য উপভোগ করতে পারেন আপনি। ব্যাংককের ক্যাসিনো এবং ক্লাব, কোহ সামুইতে বিচ পার্টি, এবং চিয়াং মাই আদিবাসী গ্রাম দেখলে চোখ জুড়িয়ে যাবে।
৬) কাশ্মীর
গুজরাতের পরে পশ্চিমবঙ্গ, বিশেষত কলকাতা থেকে সব চেয়ে বেশি পর্যটক ভূস্বর্গে বেড়াতে যান। উপত্যকার সৌন্দর্য আলাদা করে বলার কিছু নেই। গুলমার্গ, সোনমার্গ দেখলে চোখ জুড়িয়ে যাবে। পাহাড়-নদীঘেরা ছোট্ট গ্রাম পহেলগাঁও যেতেই হবে। শ্রীনগর গেলে ডাল লেকের হাউসবোটে কদিন থাকতে পারেন। এখন হাউসবোটগুলিতেও পর্যটকদের জন্য রাজকীয় আয়োজন করা হয়।
৭) কুর্গ
মন চাইছে এমন কোথাও যেতে, যেখানে মিল হবে প্রকৃতির সঙ্গে। নিরিবিলিতে কাটানো যাবে বিশেষ মুহূর্ত। এমন টুরিস্ট স্পট খোঁজার জন্য দেশের বাইরে যাওয়ার প্রয়োজন নেই। ভারতের ‘স্কটল্যান্ড’ই আপনার স্বপ্ন পূরণ করবে। এটা আবার কোথায়? এমনটাই ভাবছেন তো? দক্ষিণ ভারতের জনপ্রিয় পর্যটন কেন্দ্র কুর্গকে বলা হয় ভারতের স্কটল্যান্ড।
১৯৫০ সাল থেকে ১৯৫৬ সাল পর্যন্ত কেন্দ্রীয় সরকারের তত্ত্বাবধানে ছিল কুর্গ। এরপর তৎকালীন মাইসোর স্টেটের সঙ্গে যুক্ত হয়। কুর্গের শান্ত, শীতল পরিবেশ মন কেড়ে নেয় ছোট থেকে বড় সবার। যদি দক্ষিণ ভারত যাওয়ার প্ল্যান করে থাকেন, তাহলে কুর্গকে অবশ্যই রাখুন বাকেট লিস্টে। কুর্গের জনপ্রিয়তার পিছনে রয়েছে এখানের জলপ্রপাত। এর মধ্যে জনপ্রিয় হল আব্বি জলপ্রপাত। কুর্গ থেকে মাত্র পাঁচ কিলোমিটার দূরে রয়েছে এই জলপ্রপাত। মন্দিকেরি দুর্গও কুর্গের একটি জনপ্রিয় পর্যটন কেন্দ্র। ঘুরে আসতে পারেন ব্রক্ষ্মগিরি হিলস থেকে। এখানে কুর্গকে আরও সুন্দর দেখায়।
৮) আন্দামান ও নিকোবর দ্বীপপুঞ্জ
ঘন নীল উত্তাল সমুদ্র। তার মাঝখানে ভেসে রয়েছে আন্দামান ও নিকোবর দ্বীপপুঞ্জ। গহীন অরণ্য, সমুদ্রসৈকত, সমুদ্রতলের প্রবালরাজ্য, প্রাচীন গাছ, ফুল, পাখি, ফল এবং জারোয়া গোষ্ঠীর মানুষ নিয়ে আন্দামান ও নিকোবর যেন অজানা এক পৃথিবী। আপনি পোর্ট ব্লেয়ার, হ্যাভলক দ্বীপ এবং বারাটাং-এর মতো দ্বীপের সুন্দর এবং অত্যাশ্চর্য জায়গাগুলি ঘুরে দেখতে পারেন। এখন অনেক ভ্রমণ সংস্থা খুব ভাল ভাল ট্যুর প্য়াকেজ দিচ্ছে।
৯) ইতালি
ইউরোপের ইতিহাস, ঐতিহ্য ও শিল্প-সংস্কৃতির এক অনন্য তীর্থভূমি ইতালি। প্রাচীনকালে এখানে ছোট্ট জনপদ গড়ে উঠেছিল, যাকে গ্রিকরা ‘ইতালিয়া’ বলে ডাকতো। প্রাচীন সভ্যতা ও আধুনিকতার পাশাপাশি মনোরম সমুদ্র সৈকত, আলপাইন লেক, আল্পস পর্বতমালার সমন্বয়ে গঠিত ইতালি এককথায় মনোমুগ্ধকর।
১০) সুইৎজারল্যান্ড
বরফ ঘেরা উঁচু উচুঁ পাহাড়, সবুজ ঢালু আলপাইন উপত্যকা। আর সেই উপত্যকায় দাঁড়িয়ে ‘সাউন্ড অফ মিউজিক’-এর মারিয়া গান গেয়ে ওঠে ‘পাহাড়গুলো আজ যেন জীবন্ত- সঙ্গীতের মূর্ছনায়’।
ইউরোপের প্রধান শিল্প ও অর্থনৈতিক রাজধানীগুলোর মধ্যে জুরিখ পর্যটকদের জন্য সবচেয়ে আনন্দদায়ক এবং আকর্ষণীয় স্থান। সাংস্কৃতিপ্রেমীদের জন্য এখানে আছে বেশকিছু জাদুঘর এবং মধ্যযুগীয় স্থাপনা। গ্লোবাল পিস ইনডেক্স (জিপিআই) অনুযায়ী সুইজারল্যান্ড বিশ্বের সপ্তম শান্তিপূর্ণ দেশ।