
গলৌতি হোক বা কলমি, সুগন্ধী হোক বা মাহি, অউধের কাবাব মানেই কামাল!
শেষ আপডেট: 11 July 2024 18:50
ওয়ার্ল্ড কাবাব ডে! ১২ জুলাই দিনটা পালন করা হয় কাবাবের ঐতিহ্য ও ইতিহাসকে মনে করতে। কিন্তু 'কাবাব' শব্দটা একবার কানে এলে কি আর ইতিহাস-পাতিহাঁস মনে আসে? জিভের জলটাকে সামলানোই তখন একটা চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায়।
বিশ্ব কাবাব দিবসের খোঁজে দ্য ওয়াল হাজির হয়েছিল দেশপ্রিয় পার্কের অউধ ১৫৯০-তে। আওয়ধি নবাবি ঘরানার মুঘলাই খানার কথা ভাবলেই কলকাতাবাসীর মনে প্রথমে এই রেস্তোরাঁর নাম তো মাথায় আসবেই। অন্দরে ঢুকলেই মনে হবে, যেমন টাইম মেশিনে করে সটান পৌঁছে গিয়েছেন নবাব আসফ উদ দৌলার হাভেলিতে। খানিক পরেই এসে হাজির এই রেস্তোরাঁর বিখ্যাত আকর্ষণ, ধোঁয়া ওঠা গোশত গলৌতি কাবাব। একেবারে পেষাই করা মাটনে নানাবিধ সুস্বাদু আওয়ধি স্পেশ্যাল মশলা মাখিয়ে হালকা করে তাওয়ায় ফ্রাই করা। রসুইখানা থেকে টেবিলে আসার আগেই বাতাসে ভেসে ভেসে হাজির হয় মনমাতানো গন্ধ।
১৭৭৫ সালে লখনৌয়ের নবাবের তখতে বসেন মির্জা আসফ-উদ দৌলা। লখনৌ শহরের বহু ইতিহাসের সঙ্গে এই নবাবের নাম ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে রয়েছে। বড়া ইমামবড়ার বিখ্যাত ভুলভুলাইয়া তাঁর আমলেই তৈরি হয়। শোনা যায়, শেষ দিকে নবাবের বয়স হয়ে যায়, দাঁত দিয়ে শক্ত কিছু চিবিয়ে খেতে পারতেন না। কিন্তু মধ্যাহ্নভোজে একটু কাবাব না হলে কি আর নবাবি ভোজন ঠিকমত হয়? খবর গেল নবাবের বাবুর্চিদের কাছে। অনেক ভেবেচিন্তে শেষে বৃদ্ধ নবাবের জন্য তাঁরা পেষাই করা মাংসে একশোরও বেশি মশলাপাতি মিশিয়ে এই বিশেষ ধরণের কাবাব বানান। 'গলৌতি', অর্থাৎ যা জিভে গেলেই গলে যায়!
১৫২৬ সালে পানিপথের প্রান্তরে ইব্রাহিম লোদীর বাহিনীকে পরাস্ত করে প্রথম হিন্দুস্তানে নিশান উড়িয়েছিলেন জহিরউদ্দিন মুহম্মদ বাবর। তখনও তিনি ফরগনার শাসনকর্তা, কাবুল-কান্দাহার জিতেছেন। স্বপ্ন, একদিন সমরখন্দের অধিবাসী হবেন। কিন্তু সমরখন্দে ফেরা না হলেও, দিল্লি-আগ্রা থেকেই দক্ষিণ এশিয়ায় পৃথিবীর অন্যতম সমৃদ্ধ সাম্রাজ্য তৈরি করেছিলেন তাঁর উত্তরসূরিরা। এই মুঘল সাম্রাজ্যের হাত ধরে ভারতে রকমারি মুঘলাই খানার সূত্রপাত। কিন্তু বাবরের আত্মজীবনী 'বাবরনামা' পড়লে দেখা যাবে, আদতে বাবরের মাতৃভূমিতে এসব কিছুই পাওয়া যেত না। তবে মধ্য এশিয়ার ঊষর প্রান্তর বিভিন্ন বাহারি তরমুজ, ফুটি আর আঙুরের জন্য বিখ্যাত ছিল। বাবরের নিজেরও বড় প্রিয় ছিল তরমুজ। পরে হুমায়ূন শের শাহের তাড়া খেয়ে পারস্যে আশ্রয় নিলে তাঁর হাত ধরেই চাঘতাই তুর্কি খানাদানার সঙ্গে সমৃদ্ধ পারস্যের রসুইয়ের মেলবন্ধন হয়।
কাবাবেরও শুরু সম্ভবত মধ্য এশিয়ায়। ঠিক কোন দেশে, তা নিয়ে অবশ্য কোনও খাঁটি খবর পাওয়া যায় না। অনেকে বলেন, প্রাচীন ইরান কাবাবের আঁতুড়ঘর। পারস্য থেকে কাবাব এসে পা রাখে মুঘল হেঁশেলে। অনেকে বলেন, আদতে কাবাবের জন্ম বাগদাদে। মধ্য এশিয়ায় উজবেগিস্তান, তুর্কমেনিস্তানেও অনেকে কাবাবের শিকড় খোঁজার চেষ্টা করেন। কিন্তু মোটের ওপর বেশিরভাগ খাদ্যবিশারদদের মতে, কাবাব আসলে প্রথম তৈরি হয়েছিল তুরস্কের বরফশীতল আনাতোলিয়ার রুক্ষভূমিতে। বারো-তেরো শতকে, অটোমান রাজত্বেরও আগে, তুরস্কে সৈন্যরা ভেড়া বা ছাগলের মাংস পিষে নুন-লেবু-মশলা মিশিয়ে তরোয়ালের ওপর লেপ্টে খোলা আঁচে ঝলসাত। ওই থেকেই প্রথম শিক কাবাবের ধারণা আসে।
কলকাতার অউধের কর্ণধার শিলাদিত্য চৌধুরী একবার একান্তে দ্য ওয়ালকে বলেছিলেন, স্রেফ এই মশলা ও রান্নার ধরণের সন্ধানেই তিনি দিনের পর দিন লখনৌতে পড়ে থেকেছেন। যার ফল, আওধি ধাঁচের গলৌতি বা মুর্গ কালমি কাবাব। 'কাবাব' মানেই সবাই জানেন, একেবারে হাড় ছাড়া, মখমলের মত হবে। 'কাবাব মে হাড্ডি' তো কথায় কথায় জনপ্রিয়। কিন্তু কালমি কাবাবের আসল উপাদানই হল, মুরগির ঠ্যাং। সেই হাড়ের গায়ে লেগে থাকা নরম মাংসে টক দই, কাঁচালঙ্কা বাটা, আদা-রসুন বাটা দিয়ে ম্যারিনেট করে, তন্দুরে ঝলসে ধনেপাতার কুচি ছড়িয়ে সার্ভ করা হয়। যারা আমিষভোজী নন, বা শনি-মঙ্গলবারে হয়ত অউধে গিয়ে পড়েছেন, তাঁদের জন্যও নিরামিষ কাবাবের বন্দোবস্ত আছে। যেমন, পনীর সুগন্ধি কাবাব। ম্যারিনেটের মশলার সঙ্গে পনীরের ওপর আসে তন্দুর করা ক্যাপসিকাম, টমেটো। বা, হরা-ভারা কাবাব। সবুজ সবজিকেই কাবাবের মত করে তন্দুর করা।
মুঘল সাম্রাজ্যের আনুষ্ঠানিক গোড়াপত্তন বাবরের আমলে হলেও, বস্তুত তাকে শক্তপোক্ত ভিত্তিতে বাঁধার কাজটা করে যান সম্রাট আকবর। তাঁর জীবনীকার আবুল ফজলের লেখায় সম্রাটের খাবারের শখ নিয়ে চমৎকার বিবরণ পাওয়া যায়। 'আকবরনামা'-তে ফজল লিখেছেন, সম্রাটের তিন রকমের খাবারের রুটিন ছিল। কখনও কখনও বাদশাহ আমিষ খেতেন না। তখন ডাল, গম, ভাতের নানা নিরামিষ পদ বানানো হত। কিন্তু যেদিন আকবর আমিষ খেতেন, সেদিন মুঘল পাকশালায় বানানো হত ইয়াখনি, দো-পিয়াজা, ঢাকা দেওয়া মাটির পাত্রে দম-পখতে বানানো মাংস, কালিয়া বা মাংসের মোটা গ্রেভি আর তার সঙ্গে বাহারি নানা জাতের কাবাব। আবুল ফজল অবশ্য এগুলো কীভাবে বানানো হত তার বিস্তারিত বিবরণ দেননি। কিন্তু খাদ্যবিষয়ক ঐতিহাসিক কলিন টেলর সেন জানাচ্ছেন, মুঘল আমলে বাদশাহের রান্নাঘর ছিল সরাসরি প্রধানমন্ত্রীর দফতরের অধীন।
তবে মজার কথা, কাবাব নয়, আকবরের আমলে খানাদানার সবচেয়ে বাহারি রেসিপি ছিল মুর্গ মুসললম!
আঠারো উনিশ শতকে উপনিবেশের যুগে কাবাব পাড়ি দেয় ইউরোপে। অটোমান সৈন্যদের থেকে কাবাব গিয়ে পৌঁছয় স্পেন, ব্রিটেন ও ফ্রান্সে। পরে লেবাননের অভিবাসীরা কাবাব নিয়ে পৌঁছন অতলান্তিকের ওপারে, আমেরিকায়। এই ইতিহাসকে সম্মান জানাতেই অউধের আয়োজন, বিশ্ব কাবাব দিবস সেলিব্রেশনের। ২০১৩ সালে প্রথম যাত্রা শুরু করেছিল অউধ। কলকাতার দেশপ্রিয় পার্কে। সেখানেই পৌঁছে গিয়েছিল দ্য ওয়াল। আজ শুধু কলকাতার নানা প্রান্তে নয়, দিল্লির নয়ডাতেও পৌঁছে গিয়েছে অউধ। চালু হচ্ছে তাদের নতুন রেসিপি, গলৌতি রোল। যাতে রোলের ভেতরেই পুরে দেওয়া থাকবে সুস্বাদু গলৌতির স্বর্গীয় স্বাদ।