
পান্তাভাত
শেষ আপডেট: 19 April 2024 18:04
পান্তাভাত, সারা বছর এই বিশেষ ধরনের ভাতের কথা শুনে থাকলেও, গরমকালে যেন একটু বেশি করেই শুনি। আসলে এই সময় এর কৌলিন্য অনেকটাই বেড়ে যায়। এখন আবার বিভিন্ন জায়গায় খাদ্য উৎসবে ঢুকে পড়েছে পান্তাভাতের স্টল। হরেক রকমের পান্তাভাতের প্রিপারেশন পাওয়া যায় সেখানে। নববর্ষের উৎসবেও এখন স্থায়ী স্থান করে নিয়েছে পান্তাভাত। হঠাৎ কী এমন ঘটল যে গরীব খেটে খাওয়া মানুষের আটপৌরে এই ভাতের ডিশ, মধ্যবিত্ত-উচ্চবিত্ত পরিবারেও ঢুকে পড়ল!
আসলে এই গরমকালে শরীর ঠান্ডা রাখার জন্য নানা পদ্ধতি অনুসরণ করি আমরা। সেটা পোশাক, খাদ্যাভ্যাস, দৈনিক কাজকর্ম–সবকিছুতেই প্রতিফলিত হয়। এই সময় ঠান্ডা খাওয়ার খুব বাতিক দেখা যায় আমাদের মধ্যে। নানা ধরনের ঠান্ডা পানীয়, ঠান্ডা ফল, ঠান্ডা দই, এমনকী নিম-বেগুন, উচ্ছে চচ্চড়ি, তেঁতুলের টক–সবকিছুকেই ঠান্ডা খাবারের তালিকাভুক্ত করি আমরা। আর একটা জিনিস এ সময়ে সবাই খুব খেতে চান বা খেতে পছন্দ করেন, সেটা হল পান্তাভাত। সেটাও কিন্তু এক ধরনের ভাত, বলা যায় বিশেষ ধরনের ভাত। যে ভাত আমরা খাই সেই ভাত সারারাত জলে ভিজিয়ে রেখে দিলে সেটা কিছুটা আয়তনে বাড়ে। তার মধ্যে একটু গন্ধরাজ লেবু, সামান্য নুন, কাঁচা লঙ্কা, কাঁচা পেঁয়াজ, কাঁচা তেল মিশিয়ে দিলেই সেটা হয়ে যায় পান্তাভাত। গ্রামেগঞ্জে এখনও খেটে খাওয়া মানুষেরা সক্কালবেলা এক থালা পান্তা ভাত খেয়ে কাজে বেরিয়ে যান। এ গরম ভাতের থেকে পান্তাভাতে অনেক বেশি এনার্জি বা ক্যালরি পাওয়া যায়। সেই জন্যই শ্রমজীবী মানুষদের কাছে পান্তাভাত প্রিয় খাদ্য। শুধু যে বাঙালিরাই পান্তা ভাত খায়, তা কিন্তু নয়। বিহার ওড়িশা অসমেও পান্তাভাত খুব জনপ্রিয় একটি খাদ্য। আর বাংলাদেশে নববর্ষের অনুষ্ঠানের প্রধান অনুষঙ্গ হল পান্তা ভাত।
সংস্কৃতে পান্তাভাতকে বলা হয় কাঞ্জিকা। এছাড়া পাখাল, পোখালো,পাখালা, পাখাল ভাত নামেও বিভিন্ন রাজ্যে পান্তাভাত পরিচিত। আমরা সবাই জানি যে ভাত কার্বোহাইড্রেট প্রধান একটি খাদ্য। কার্বোহাইড্রেটের প্রধান ভাগ তিনটি। শর্করা বা সুগার, শ্বেতসার বা স্টার্চ এবং সেলুলোজ বা খাদ্য ফাইবার। ভাত-সহ নানা ধরনের খাদ্যশস্যে সবথেকে বেশি থাকে শ্বেতসার জাতীয় কার্বোহাইড্রেট এবং অবশ্যই সেলুলোজ। আমাদের দেহের চালিকাশক্তি ৬০ থেকে ৭০ শতাংশই আসে কার্বোহাইড্রেট জাতীয় খাদ্য উপাদান থেকে। পূর্ণবয়স্ক মানুষের দেহে প্রায় ৫০০ গ্রাম কার্বোহাইড্রেট সঞ্চিত থাকে। দেহে ঘাটতি দেখা দিলে এই সঞ্চয় থেকে পূরণের চেষ্টা করা হয়। প্রকৃতিজাত কার্বোহাইড্রেট দেহের পক্ষে সবথেকে বেশি উপকারী , যেমন নানা ধরনের খাদ্যশস্য, শাকসবজি ও ফলমূল।
ভাত শুধু যে শুধু সহজপাচ্য খাদ্য তাই নয়, দেহের পক্ষে প্রচন্ড উপকারীও বটে। ১০০ গ্রাম ঢেঁকি ছাঁটা চাল থেকে শক্তি পাওয়া যায় ৩৪৯ কিলো ক্যালরি। কলে ছাঁটা চাল থেকে ৩৪৫ কিলো ক্যালরি। কার্বোহাইড্রেট মেলে যথাক্রমে ৭৯ এবং ৭৭.৪ গ্রাম, প্রোটিন যথাক্রমে ৬.৪ এবং ৮.৬ গ্রাম, ফ্যাট ০.৪ এবং ০.৬ গ্রাম। এছাড়া নানা ধরনের ভিটামিন এবং মিনারেলস ভাতে প্রচুর পরিমাণে থাকে। সাধারণ ভাতকে জল দিয়ে গেঁজিয়ে বা ফার্মেনটেড করে তৈরি হয় পান্তাভাত। এর ফলে এর পুষ্টি মূল্য অনেক বেড়ে যায়। যেমন ১০০ গ্রাম সাধারণ ভাতে যেখানে ৩.৪ মিলিগ্রাম আয়রন থাকে, সেখানে পান্তাভাতে থাকে ৭৩.৯১ মিলিগ্রাম আয়রন,মানে প্রায় ২১ গুণ বেশি। এছাড়া নানা ধরনের মিনারেলস যেমন পটাশিয়াম, ম্যাগনেসিয়াম, জিংক– এগুলোর পরিমাণও পান্তা ভাতে বেড়ে যায়। কিছুটা কমে যায় সোডিয়ামের পরিমাণ। বেড়ে যায় বিভিন্ন মাইক্রো নিউট্রিয়েন্টস এবং অ্যান্টিঅক্সিডেন্টের পরিমাণও। কিছুটা হলেও কমে যায় কার্বোহাইড্রেট এবং ফ্যাটের পরিমাণ। পান্তা ভাতের সঙ্গে শরীরে অনেক জলপ্রবেশ করে বলে, গরম কালে শরীরে কখনও জলাভাব দেখা দেয় না। যে জন্য আমাদের ত্বক থাকে সজীব এবং সতেজ।
পান্তাভাত খেলে কতটা শরীর ঠান্ডা হয় সেটা কেউ থার্মোমিটার দিয়ে কখনও মেপে দেখেনি। এখানে শরীর ঠান্ডা বলতে শরীরে পান্তার বিভিন্ন পুষ্টিকর উপাদান এবং জল বেশি করে প্রবেশ করা এবং শরীরের এনার্জি বেড়ে যাওয়া– এমনটাই বোঝানো হয়ে থাকে। আমরা যারা শহুরে মানুষ, এই গরমকালে সপ্তাহে দুই-এক দিন পান্তাভাত খেতেই পারি। সঙ্গে শাকসবজি, ঝুরো আলু ভাজা, মাছ ভাজা, কাসুন্দি, শুকনো ডাল, শুঁটকি মাছ, আলু সেদ্ধ, বেগুন পোড়া–মিলিয়ে মিশিয়ে সবই চলতে পারে।