
শেষ আপডেট: 14 October 2021 12:38
শৈশবের স্মৃতি রোমন্থনে সেই দিনগুলির কথা মনে পড়ে। সপ্তাহে একদিন নিয়ম করে নাপিত বৌ আসতেন ছোট্ট বাক্স বগলে করে। বৃহস্পতিবার লক্ষ্মীবার, তার আগের দিনই তাঁর জন্য নির্দিষ্ট ছিল। মা-ঠাকুমা থেকে কচিকাঁচা, সব মেয়েদের হাত আর পায়ের নখ কেটে তার পর ভালে করে ঝামা দিয়ে পায়ের গোড়ালি থেকে চারপাশ ঘষে ঘষে আরামদায়ক করে তোলা হত। সর্বশেষে তার ঝুলি থেকে বেরোত আলতা পাতা (aalta), সেটিকে ভিজিয়ে তৈরি হত গাঢ় লাল রং, ছোট্ট আলতার কিউট একটা বাটিও ছিল, যাতে আলতা ঢেলে তারের মুখে লাগানো তুলো বা স্পঞ্জ দিয়ে নিপুণ হাতে সরু রেখায় রাঙানো হত পা দু-খানি। দুষ্টু মেয়েদের সুড়সুড়ি লাগলে পা শক্ত করে হাসি চাপতেই হত, কিন্তু পা শক্ত করে ফেললে নাপিত বৌয়ের বকুনি খাওয়া মাস্ট। আলতা রাঙানো পা নিয়ে বৃহস্পতিবারের লক্ষ্মীপুজো করতে যেতেন মা-ঠাকুমারা।
নাপিত বৌয়ের দিন বহুকাল আগেই শেষ হয়েছে। এখন নিয়ম করে পায়ের যত্ন নেওয়া ও পরিচর্যা দেওয়ার কাজটি করেন বিউটি পার্লারের কর্মীরা। এখানে পেডিকিওর করা হয় বটে, কিন্তু আলতা বাধ্যতামূলক নয়। আগে পায়ের চর্চায় আলতার ব্যবহার হতই।
এর কিন্তু ব্যবহারিক দিকও রয়েছে। পায়ের যত্ন নিলে শরীর ভালে থাকে। চোখের জ্যোতিবৃদ্ধি পায়, তার সঙ্গে যারা ডায়বেটিকদের জন্যও এটি বিশেষভাবে ভালে। পায়ের যত্নগ্রহণের সঙ্গে আলতার সংযোজন একদিকে যেমন পাকে সুরক্ষিত রাখে, যাঁরা সারাদিন জলের মধ্যে কাজ করেন তাঁদের এই আলতার আবরণ রক্ষাকবচ রূপে পা দুটিকে রক্ষা করে, আবার অপরদিকে অলক্তরঞ্জিত পা নারীর সৌন্দর্যেও অতুলনীয়। লাল পাড় শাড়ি, পায়ে লাল আলতা, মাথায় লাল সিঁদুর, কপালে লাল টিপ, হাতে লাল মেহেন্দি! এই নিয়ে যেন এক বিবাহিত নারীর সুখী ও সম্পূর্ণ রূপ ফুটে ওঠে। কিন্তু এত লাল রঙের ছড়াছড়ি কেন? এর কারণ জানতে আলতা ব্যবহারের উৎসমুখটি জানতে হবে।
আলতা হল নারী সজ্জার বিশেষ উপকরণ। ভারতীয় উপমহাদেশের মেয়েরাই এর ব্যবহার বেশি করে। প্রাচীনকালে পানপাতার রস থেকে, বেল পাতা দিয়ে আলতা প্রস্তুত করা হত। বর্তমানে আলতা লাক্ষা থেকে এবং কৃত্রিমভাবে প্রস্তুত রঙ থেকে তৈরি করা হয়। বাংলার মেয়েরা উৎসবে ও বিশেষ বিশেষ তিথিতে আলতা ব্যবহার করেন। হাত-পা রাঙিয়ে তোলাই এর মূল উদ্দেশ্য। গৃহের কোনও শুভকাজেও এর ব্যবহার হয়।
আলতা রাঙানো চরণ নিয়ে কত কবি কত কবিতাই না রচনা করেছেন। তবে অলক্তকে রাঙানো পা যতই কাব্য সৃষ্টি করুক না কেন, পুরাণে বা মহাকাব্যে কিন্তু সিঁদুর বা আলতা কোনওটিই বিবাহিত নারীর আবশ্যিক সাজ বলে লেখা নেই। সেদিক দিয়ে মহাভারতের দ্রৌপদীর সাজসজ্জার প্রসঙ্গটি তুলে ধরলে মন্দ হয় না।
কেশবিন্যাস ও সাজের ক্ষেত্রে পাঞ্চালীর একটা নিজস্ব ঘরানা ছিল। যেমন এখন আমরা বিখ্যাত বিউটিশিয়ানদের কথা বলি, ঠিক তেমনই হস্তিনাপুরে দ্রৌপদী তৈরি করেছিলেন নিজস্ব সজ্জার ধারা। তাঁর সাজের বর্ণনা দিতে গিয়ে বলা হচ্ছে, প্রতিদিন সীমন্তে সিঁদুর দেন না তিনি। যখন খুব সাজেন তখনই তার ব্যবহার করেন।
আবার দক্ষকন্যা সতীর কাহিনিতে কোথাও তাঁকে আলতা-সিঁদুর পরা গৃহবধূ রূপে দেখা যায়নি। পুরাণের সুব্বর্চলা নামে এক নারীর কাহিনিতে দেখি বিবাহের সময় সিঁদুর নয় , হাতে দুর্বা ঘাসের গুচ্ছ বেঁধে দেওয়াই ছিল প্রথা।
তবে আলতা ও সিঁদুর এল কোথা থেকে? নৃতাত্ত্বিকদের মতে তা এসেছে আদিম ট্রাইবাল সমাজ থেকে। প্রতিষ্ঠিত হয়েছে সামাজিক কারণে। আগে সমাজে নারী ও পুরুষের সমান অধিকার ছিল। কৃষিব্যবস্থার উদ্ভাবনে নারী এল গৃহে, পুরুষ গেল বাইরের কাজে। আর সঙ্গে সঙ্গে নারী পুরুষের ব্যক্তিগত সম্পত্তিতে পরিণত হল। নিজ সম্পত্তিকে চিহ্নিত করতে সীমন্তে উঠল সিঁদুর, পায়ে এল আলতা। তার সঙ্গে মিশে গেল সিঁদুর আর আলতা ব্যবহারে স্বামীর আয়ু বৃদ্ধি হয় এমন মিথও। যা ছিল টিপের মতো বিশেষ সাজে ব্যবহারের দ্রব্য, তা নারীর আইডেন্টিটি তৈরির অস্ত্র হয়ে উঠল। শাস্ত্রীয় নিয়মের সঙ্গে যার কোনও সম্পর্কই নেই, তা হয়ে উঠল শাস্ত্রীয়।
তবে বর্তমান যুগে দাঁড়িয়ে মনে হয়, সাজার জিনিসকে সাজার জিনিস ভাবাই মঙ্গলজনক। তাতে আর্ট সৃষ্টি হয়, মুক্ত চিন্তার জন্ম হয়। আমরা দুই পথে চলি , একদল বলি মানি না! কুসংস্কার! আরেক দল, পাপের ভয়ে আঁকড়ে ধরে থাকি। স্বামী প্রেমের নিদর্শন হিসেবে এ এক রক্ষাকবচ যেন। কিন্তু সত্যিই কি রক্ষা করা যায়? তবে পুরোপুরি কুসংস্কারই বা বলি কীভাবে? এই আলতার লাল রঙ কত নারীর আব্রু রক্ষা করেছে। সামাজিক অবস্থানের চিহ্ন নিের্দশ করেছে। তাই দুটি দিকেই আছে কিছু ইতিবাচক চিহ্ন।
উৎসের দুই মুখকে জেনে, অলক্ত রঙকে আমাদের উৎসবের অঙ্গ করেই না হয় আমরা সাজি। লাল শক্তির প্রতীক, দেবী মহাশক্তির আরাধনা ক্ষণে আমরা সেই শক্তির আরাধনা করি অঙ্গের রক্তিম সজ্জার মাধ্যমে। কবি গাইবেন, ‘ফিরে রক্ত-অলক্তক-ধৌত পায়ে ধারা সিক্ত বায়ে, মেঘ-মুক্ত সহাস্য শশাঙ্ককলা সিঁথি প্রান্তে জ্বলে।’
এ হল সেই অলক্ষ্য রঙ, যা অশোক-কিংশুকের মতো রাঙা। যা নারীর অকারণ সুখের উৎস। এ ভালবাসার চিহ্ন অশোক আর কিংশুকের মতোই লাল হয়ে ফুটুক আমাদের জীবনের অঙ্গনে। আমরা রক্ত-অলক্তক ধৌত পায়ে রাঙিয়ে দিই জীবনের রঙ।
(লেখিকা ধর্মীয় প্রবন্ধকার, মতামত তাঁর নিজস্ব।)