দেয়ালের আড়ালেও মানুষের নড়াচড়া ধরতে পারছে ওয়াইফাই, নতুন প্রযুক্তিতে চমক ও উদ্বেগ দুটোই।
ব্যক্তিগত গোপনীয়তা নিয়ে প্রশ্ন তুলে দিল এই গবেষণা, ভবিষ্যতে কতটা সুরক্ষিত থাকব আমরা?

প্রতীকী ছবি
শেষ আপডেট: 6 January 2026 16:34
দ্য ওয়াল ব্যুরো: ক্যামেরা নেই। সেন্সর নেই। তবু চার দেওয়ালের ভেতরে থাকা মানুষজনের নড়াচড়া ধরা পড়ছে—শুনতে অবিশ্বাস্য লাগলেও এটাই বাস্তব। সাধারণ ওয়াই-ফাই (WiFi) নেটওয়ার্ক ব্যবহার করেই চার দেওয়ালের ভিতরে মানুষের উপস্থিতি ও চলাফেরা শনাক্ত করার প্রযুক্তি তৈরি করলেন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কার্নেগি মেলন বিশ্ববিদ্যালয়ের (Carnegie Mellon University) গবেষকরা। ২০২২ সালে তৈরি এই পদ্ধতি সম্প্রতি ফের আলোচনায় এসেছে, আর তা ঘিরেই শুরু হয়েছে কৌতূহল ও উদ্বেগ—দুটোই।
ওয়াই-ফাই দিয়েই মানুষের নড়াচড়া শনাক্ত করা
গবেষকদের দাবি, এই প্রযুক্তির মাধ্যমে ওয়াই-ফাই সিগন্যাল (WiFi signals) ব্যবহার করে ঘরের ভিতরে থাকা মানুষের অবস্থান, চলাচল এমনকি বসে থাকা না দাঁড়িয়ে থাকা—সবই শনাক্ত করা সম্ভব। তাও আবার দেওয়াল ভেদ করে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ঘরোয়া সুরক্ষা (home security), প্রবীণদের পরিচর্যা (elderly care) কিংবা বিপর্যয়ের সময় উদ্ধারকাজে (search and rescue) এই প্রযুক্তি যুগান্তকারী ভূমিকা নিতে পারে।
কীভাবে কাজ করে এই প্রযুক্তি?
গবেষকরা কোনও নতুন যন্ত্র তৈরি করেননি। বরং বাড়ি বা অফিসে থাকা সাধারণ ওয়াই-ফাই রাউটারকেই (WiFi router) ব্যবহার করা হয়েছে।
এর সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) ও ডিপ লার্নিং (deep learning) অ্যালগরিদম। মানুষের শরীরে ধাক্কা খেয়ে বা শরীর ঘিরে ঘুরে ওয়াই-ফাই সিগন্যাল যেভাবে বদলে যায়, সেই বিকৃতি বিশ্লেষণ করেই প্রয়োজনীয় তথ্য তৈরি হচ্ছে।
এই তথ্য নিউরাল নেটওয়ার্ক (neural network) মডেলের মাধ্যমে বদলে ফেলা হচ্ছে চলমান থ্রি-ডি ছায়ামূর্তিতে (3D silhouette)। পরীক্ষায় দেখা গিয়েছে, একাধিক মানুষকে আলাদা করে শনাক্ত করা যাচ্ছে, বোঝা যাচ্ছে তাঁদের গতিবিধি, এমনকি ভঙ্গি—বসা না দাঁড়ানো—পর্যন্ত। গবেষণায় ডেন্সপোজ (DensePose) মডেলের ব্যবহারও করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন বিজ্ঞানীরা।
ক্যামেরা ছাড়াই নজরদারি, খরচও কম
সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বিষয়, এই ব্যবস্থায় কোনও ক্যামেরা (camera) বা আলাদা সেন্সরের (sensor) প্রয়োজন নেই। শুধুই ওয়াই-ফাই ও সফটওয়্যার। ফলে খরচও তুলনামূলক অনেক কম। বিশেষ করে প্রবীণদের দেখভালের ক্ষেত্রে, যেখানে ক্যামেরা বসানো অনেক সময় অস্বস্তিকর বা অনধিকার প্রবেশ বলে মনে হয়, সেখানে এই প্রযুক্তি কার্যকর হতে পারে বলে মত গবেষকদের।
গোপনীয়তা নিয়ে বাড়ছে উদ্বেগ
তবে সব সুবিধার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে উঠছে গোপনীয়তার প্রশ্ন (privacy concerns)। ক্যামেরা না থাকলেও যদি বাইরের কেউ ওয়াই-ফাই সিগন্যাল ব্যবহার করে ঘরের ভিতরের নড়াচড়া জানতে পারে—এই ভাবনাই অনেকের কাছে আতঙ্কের।
নজরদারি (surveillance) বা অপব্যবহারের আশঙ্কা উড়িয়ে দিচ্ছেন না গবেষকরাও।
গবেষকদের ব্যাখ্যা ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা
কার্নেগি মেলনের গবেষক দল জানিয়েছে, প্রযুক্তিটি এখনও প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে এবং গোপনে নজরদারির উদ্দেশ্যে এটি তৈরি করা হয়নি। ভবিষ্যতে এতে গোপনীয়তা-রক্ষাকারী (privacy-protecting features) ব্যবস্থাও যুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে, যাতে সংবেদনশীল জায়গায় এই প্রযুক্তির ব্যবহার দায়িত্বশীলভাবে করা যায়।
শেষ প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে
ওয়াই-ফাই দিয়ে দেওয়াল ভেদ করে ঘরের খুঁটিনাটি ‘দেখা’—বিজ্ঞান যে কত দূর এগিয়েছে, তারই আর এক প্রমাণ এই গবেষণা। তবে একই সঙ্গে প্রশ্নও থেকেই যাচ্ছে—এই ক্ষমতার লাগাম থাকবে কার হাতে?