দেশের বাজারে জ্বালানির পরিস্থিতি (Fuel Crisis) মোটের উপর ঠিক থাকলেও ইরানের সঙ্গে আমেরিকা ও ইজ়রায়েলের সংঘর্ষের (US Israel Iran War) জেরে সিঁদুরে মেঘ কিন্তু দেখছে ভারতের গাড়ি শিল্পমহল।

প্রতীকী ছবি
শেষ আপডেট: 7 April 2026 12:19
পশ্চিম এশিয়ায় যুদ্ধের (West Asia Conflict) জেরে ভারতে রান্নার গ্যাসের (এলপিজি) দাম বাড়লেও এখনও সরাসরি বাড়েনি গাড়ির জ্বালানি- তেলের দাম। যদিও তেল সংস্থাগুলি (Oil Company) দাম বাড়িয়েছে। কিন্তু কেন্দ্রীয় সরকার উৎপাদন শুল্ক কমানোয় আপাতত সেই দর বৃদ্ধি বাজারে ক্রেতাদের পকেটের উপরে কোনও চাপ তৈরি করেনি। তবে ক্রেতামহলের একাংশ যে বিকল্প জ্বালানির দিকে ঝুঁকছেন, গত অর্থবর্ষে, বিশেষ করে গত মাসে ডিলারদের (বিক্রেতা) শোরুম থেকে গাড়ি বিক্রির হিসাবে তা স্পষ্ট হচ্ছে। গত মাসে শুধু বৈদ্যুতিকই নয়, সিএনজি (CNG) জ্বালানি নির্ভর গাড়ির বিক্রিও বেড়েছে। মোট গাড়ির মধ্যে এমন সব ধরনের বিকল্প জ্বালানির গাড়ির অংশীদারী বেড়েছে।
২০২৫-২৬ ও গত মার্চে খোলা বাজারে, অর্থাৎ, শোরুম থেকে সরাসরি ক্রেতার গাড়ি কেনার খতিয়ান সোমবার প্রকাশ করেছে ডিলারদের জাতীয় সংগঠন ফাডা (FADA, Federation of Automobile Dealers Association)। এমনিতে দেশের গাড়ি বাজার সম্পর্কে বেশ আশাবাদী ডিলারেরা। গত অর্থবর্ষের প্রথম দিকটা (এপ্রিল-অগস্ট) ব্যবসা তেমন না হলেও গাড়ির উপরে কিছু ক্ষেত্রে জিএসটি-র (GST) হার হ্রাসের পরের পর্বে (সেপ্টেম্বর-মার্চ) ব্যবসার চাকা গড়গড় করে গড়িয়েছে। সেই গতির ফলেই কোনও একটি অর্থবর্ষে সব ধরনের গাড়ি (দু চাকা, তিন চাকা, যাত্রীবাহী, বাণিজ্যিক ও ট্র্যাক্টর) মিলিয়ে প্রায় তিন কোটির কাছাকাছি গাড়ি বিক্রি করে সর্বোচ্চ বিক্রির রেকর্ড গড়েছে গাড়ি শিল্প।
তার মধ্যেই বিকল্প জ্বালানির গাড়ির অংশীদারী বৃদ্ধির ছবি ধরা পড়ল ফাডার হিসাবে। সরকারি তথ্যকে একজোট করে ফাডা জানাচ্ছে, ২০২৫-২৬ সালে দু'চাকার গাড়ি বাজারে বৈদ্যুতিকের অংশীদারী বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৬.৫৪ শতাংশ। যাত্রীবাহী গাড়ির ক্ষেত্রে তা ৪.২৫ শতাংশ। এবং মোট বিক্রি হওয়া বাণিজ্যিক গাড়ির ১.৮৩ শতাংশই এখন বৈদ্যুতিক। ওই বছরে মোট বৈদ্যুতিক গাড়ি বিক্রি হয়েছে ২৪.৫২ লক্ষটি। আবার ওই সময়ে মোট যাত্রীবাহী গাড়ির প্রায় ২২ শতাংশই ছিল সিএনজি-চালিত। এই জ্বালানির বাণিজ্যিক গাড়ি বিক্রি হয়েছে ১১.৭৯ শতাংশ।
এটা তো গেল গোটা একটি বছরের কথা। গত মাসের বিক্রির ছবিটা কেমন ছিল? ফাডা-র তথ্য বলছে, গত ফেব্রুয়ারির চেয়ে মার্চে দুই চাকা ও তিন চাকার বৈদ্যুতিক গাড়ির অংশীদারী বেড়েছে যথাক্রমে তিন শতাংশেরও বেশি। অর্থাৎ, ওই ধরনের বৈদ্যুতিক গাড়ির বিক্রি বেড়েছে। এ বারের ফেব্রুয়ারির (৩.৪৮ শতাংশ) চেয়ে গত মাসে বৈদ্যুতিক যাত্রাবীহী গাড়ির অংশীদারি বেড়ে হয়েছে ৫.১১ শতাংশ। সামান্য বেড়েছে সিএনজি নির্ভর এমন গাড়ির বিক্রি। বৈদ্যুতিক ও সিএনজি-চালিত বাণিজ্যিক গাড়ির বিক্রিও সামান্য বেড়েছে।
এখনও দেশের বাজারে জ্বালানির পরিস্থিতি (Fuel Crisis) মোটের উপর ঠিক থাকলেও ইরানের সঙ্গে আমেরিকা ও ইজ়রায়েলের সংঘর্ষের (US Israel Iran War) জেরে সিঁদুরে মেঘ কিন্তু দেখছে ভারতের গাড়ি শিল্পমহল। অক্ষয় তৃতীয়া, বিয়ের মরসুম, ইত্যাদির জন্য এপ্রিলে গাড়ি বিক্রিতে হয়তো কিছুটা গতি থাকবে, মনে করছেন ফাডা-র কর্তারা। কিন্তু সার্বিকভাবে গাড়ির ব্যবসার পরিবেশ পশ্চিম এশিয়ার পরিস্থিতির (West Asia Conflict) জন্য কানিকটা মেঘাচ্ছন্ন, বলছেন তাঁরা। অনেক ডিলারই জানিয়েছেন, যুদ্ধের জেরে গাড়ি সংস্থাগুলির কাছ থেকে কিছু ক্ষেত্রে গাড়ি পেতে দেরি হয়েছে। ৩৬.৫ শতাংশ ডিলার জানিয়েছেন, তেলের দাম নিয়ে সংশয় ক্রেতাদের গাড়ি কেনার সিদ্ধান্তের উপরে কম-বেশি প্রভাব ফেলেছে। পরিস্থিতির উন্নতি না হলে হয়তো চাহিদা ধাক্কা খাবে এমন নয়, কিন্তু ফাডা-কর্তাদের মতে, গাড়ি কেনার আগ্রহের চক্র দীর্ঘায়িত হবে।
বস্তুত, ডিলারদের উদ্বেগের ক্ষেত্রে যে তিনটি মূল ঝুঁকির কথা ফাডা বলছেন, তার মধ্য অন্যতম তেলের দাম বাড়লে চাহিদা ধাক্কা খাওয়া। তাদের হিসাবে যে ঝুঁকির হার প্রায় ১৫ শতাংশ। সর্বোচ্চ ঝুঁকি (৪০.৫ শতাংশ) হল সার্বিক আর্থিক মন্দা ও ক্রেতার আগ্রহ (sentiment) ধাক্কা খাওয়ার আশঙ্কা। ৩০.৫ শতাংশ ঝুঁকি হল গাড়ি সংস্থার কাছ থেকে গাড়ির জোগান ব্যাহত হওয়া বা কোনও মডেলের গাড়ি না পাওয়া।
তেলের দাম (Global Oil Price) নিয়ে চারদিকেই একটা আশঙ্কা রয়েছে। কারণ এখন হয়ত তেলের দাম বাজারে বাড়েনি। অনেকেই সন্দিহান, যে হারে বিশ্ব বাজারে অশোধিত তেল ও গ্যাসের দাম বেড়েছে বা জোগান নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে, তাতে পরিস্থিতির উন্নতি না হলে কদ্দিন তা ঠেকিয়ে রাখা সম্ভব? অতীত অভিজ্ঞতার প্রেক্ষিতে ওয়াকিবহাল মহলের একাংশের আবার দাবি, দেশের যে প্রান্তেই ভোট থাকলে তেল-গ্যাসের দাম (Oil Gas Price) বাড়ে না। কিন্তু ভোট মিটলে অনেক সময়ই চড়চড় করে দাম বেড়েছে। ফলে অসম, পশ্চিমবঙ্গ-সহ দেশের যে কয়েকটি রাজ্যে ভোট আসন্ন, তা মিটলে এবং ইরানের পরিস্থিতির উন্নতি না ঘটলে তেলের দাম বৃদ্ধির সম্ভাবনা থেকেই যায়।
তবে এই আশা-আশঙ্কার মধ্যে ডিলারদের কাছে স্বস্তির হল, তেল নিয়ে সংশয়ের জন্য বিকল্প জ্বালানির প্রতি ক্রেতাদের আগ্রহ বৃদ্ধি। প্রায় ৫৭ শতাংশ ডিলার জানিয়েছেন, বৈদ্যুতিক ও সিএনজি গাড়ির ক্ষেত্রে আগ্রহ বাড়ছে। যা এই পরিবেশের পক্ষে একটি ইতিবাচক বার্তা দেয়। তেলের দাম বৃদ্ধির আশঙ্কার মধ্যে ক্রেতারা এমন গাড়ি কেনা ও তা চালানোর খরচের সঙ্গে গাড়ি কেনার তুলনামূলক হিসাব খতিয় দেখবে বলে মনে করছেন তাঁরা।