১৯৬২ এশিয়ান গেমস সোনা পাওয়া দলেও বাংলার বিশেষ প্রভাব ছিল। সেই শহরেই মেসির সফর শুরু হওয়া মানে—ভারতের ফুটবল-মন্দাকিনীর গোমুখকে বন্দনা জানানো!

গ্রাফিক্স: দিব্যেন্দু দাস
শেষ আপডেট: 10 December 2025 13:35
দ্য ওয়াল ব্যুরো: সেলেব্রিটি ম্যাচ। তাবড় রাজনীতিক ব্যক্তিত্বের সঙ্গে সাক্ষাৎকার। মাঠে নেমে স্রেফ জালগিং নয়, প্রীতিম্যাচে গা ঘামানো, মূর্তি উন্মোচনের সাক্ষী থাকা... লিওনেল মেসিকে (Lionel Messi) নিয়ে আয়োজকদের দিস্তা দিস্তা পরিকল্পনা!
দেশের একাধিক মেট্রো সিটি ছুঁয়ে যাবেন তিনি৷ সাকুল্যে তিনদিনের সফর৷ আমদাবাদ, মুম্বই, দিল্লি। ভেন্যু, দিনক্ষণ পাকা। বরাদ্দ সময় কোথাও বেশি, কোথাও কম৷ কিন্তু জনজোয়ারের ঢেউ কোথায় বেশি ওঠে, সেই হিসেবে যাওয়ার আগে একটা কথা বুক ঠুকে বলে ফেলা যায়: মেসি-সফরের সূচনা যেখানে, সেই কলকাতাই হতে চলেছে গণ-উন্মাদনার এপিসেন্টার! বিলয় না হলেও সৃষ্টি এখানে। তীব্রতাও, অবধারিতভাবে, হতে চলেছে সর্বোচ্চ!
কেন এগিয়ে কলকাতা?
কারণটা কোনও ফ্যান-বয় আবেগ নয়। এ এক ইতিহাস, অভ্যাস, সংস্কৃতি এবং সমষ্টিগত ফুটবল-চেতনার এক বুনোট, যার সঙ্গে মেসির (Lionel Messi) গল্পটা অদ্ভুতভাবে মিলে যায়। আর সব শহর তাঁর সফরের গন্তব্য হতে পারে, কিন্তু কলকাতা উপস্থিতির আলাদা অর্থস্তর তৈরি করে। বাকি তিন জায়গায় জমকালো কর্পোরেট আয়োজন, কলকাতায় নিখাদ আবেগ! ফুটবল এখানে স্রেফ খেলা নয়, সাংস্কৃতিক পরিচয়! ১৯১১-এর ইস্ট ইয়র্কশায়ার রেজিমেন্টের বিরুদ্ধে মোহনবাগানের ঐতিহাসিক জয়—দেশীয় ফুটবলের প্রথম মহাকাব্য—যে শহরের রাস্তাঘাটে, আড্ডায়, চায়ের দোকানে, স্কুলের বেঞ্চে প্রজন্ম ধরে গল্প হয়ে বেঁচে, সেখানে মেসিকে নিয়ে উন্মাদনা হওয়ারই কথা!
আর্জেন্তিনীয় তারকার বেড়ে ওঠার লড়াই অসম্ভবকে সম্ভব করার নাম। কলকাতার ফুটবল ঐতিহ্যও তাই… বিপ্লব আর প্রতিরোধের দলিল। লাতিন আমেরিকার ঘরোয়া লিগে সংঘাত ছাপিয়ে যে তীব্র সংরাগ, তার অবিকল প্রতিবিম্ব কলকাতা ডার্বি। লিও-র সফর কল্লোলিনীতে শুরু হওয়া মানে দুই গল্প অনিবার্যভাবে একই বিন্দুতে এসে মিশে যাওয়া!
এই কারণে শুধু মেসি নন, পেলে (Pele), মারাদোনা (Diego Maradona), অলিভার কান (Oliver Kahn), লোথার ম্যাথাউস (Lothar Matthäus), এমিলিয়ানো মার্টিনেস (Emiliano Martinez)—যে তারকারাই ভারতে নেমেছেন, তাঁরা জার্নি পয়েন্ট হিসেবে শুরুতেই বেছে নিয়েছেন কলকাতাকে। ভাষা বদলেছে। মুখ বদলেছে। কিন্তু বক্তব্য পাল্টায়নি। বারবার সমস্বরে জানিয়েছেন, এই শহর বুঝতে পারে, চিনতে পারে, ফুটবলের স্পন্দন অনুভব করতে পারে!
মেসি নিজেও ২০১১ সালে গণ-উন্মাদনার স্বাদ পেয়েছেন। আর্জেন্তিনা–ভেনেজুয়েলা ম্যাচে (Argentina vs Venezuela) সল্টলেকের গর্জনে স্পন্দিত হয়েছিল কলকাতার আকাশ-বাতাস। এত বছর পরে ফিরে আসা তাই শুধু কেতাদুরস্ত অনুষ্ঠান নয়—অনুষ্ঠানিক পুনর্মিলনও বটে।
আকারে-প্রকারে মুম্বই, দিল্লি, আমদাবাদ—যতই বড় শহর হোক, ফুটবলের পালসে কলকাতা এখনও সবাইকে দশ গোল দেবে। মহানগরীর বাড়ির দেওয়াল মেসির ছবিতে রঙিন। বিশ্বকাপের সময় আর্জেন্তিনার (Argentina) পতাকা দিয়ে পাড়ার আনাচেকানাচে মুড়ে ফেলা হয়! নামে মিছিল, অনুরাগীদের ঢল। আর্জেন্তিনার সমার্থক হতে হতে সবার অজান্তে ফুটবল… এমনকী অস্তিত্বেরও কি সমর্থক হয়ে যান না মেসি? এহেন অনুরাগ আর কোন শহরে মেলে?
২০১৭-র ফিফা অনূর্ধ্ব-১৭ বিশ্বকাপ ফাইনাল (FIFA U-17 World Cup)। ইংল্যান্ড বনাম স্পেন। ভারতের কোনও স্বার্থ ছিল না। তবু গ্যালারি ভরেছিল ৬৬ হাজার মানুষে। ফিফা কর্তারা একবাক্যে স্বীকার করেছিলেন: ‘এমন প্যাশন আমরা কোনও বয়সভিত্তিক টুর্নামেন্টে দেখিনি!’ আসলে এই শহর ফুটবল শুধু উপভোগ করে না। এর ছন্দে শ্বাস নেয়। দৈনন্দিনতার সঙ্গে মিশিয়ে নেয় খেলার উত্থান-পতন! আর সেই কারণেই মেসির সফরের স্বর, সুর, তান কলকাতার আবেগের সঙ্গে জুড়ে যায়।
গোষ্ঠ পাল (Gostha Pal), শৈলেন মান্না (Sailen Manna), চুনী গোস্বামী (Chuni Goswami), পিকে ব্যানার্জি (PK Banerjee), সুভাষ ভৌমিক (Subhash Bhowmick)—ভারতীয় ফুটবলের অর্ধেক ইতিহাস তৈরি করেছেন বাঙালিরা। ১৯৬২ এশিয়ান গেমস সোনা পাওয়া দলেও বাংলার বিশেষ প্রভাব ছিল। সেই শহরেই মেসির সফর শুরু হওয়া মানে—ভারতের ফুটবল-মন্দাকিনীর গোমুখকে বন্দনা জানানো!