সমর্থকরা আশঙ্কায়। কারণ তাঁকে ঘিরে প্রত্যাশা ছিল গোলমেশিনের! কিন্তু বাস্তব সত্যিটা হল, কোনও স্ট্রাইকারই প্রতিটি ম্যাচে গোল করেন না। এমনকি ইউরোপের মহাতারকারাও অফ-ফর্মে যান। আসল পার্থক্যটা গড়েন তাঁরা, যাঁরা খারাপ সময় কাটিয়ে আবার ফিরতে জানেন।

দিমিত্রিয়স দিয়ামানতাকোস
শেষ আপডেট: 18 August 2025 12:54
দ্য ওয়াল ব্যুরো: ডার্বির রাত মানেই আবেগের বিস্ফোরণ, শহরজোড়া আলোড়ন আর ময়দানি লড়াইয়ের উত্তাপ। আর এমন আবেগঘন রাতে ইস্টবেঙ্গলের (East Bengal) নায়ক হয়ে উঠলেন দিমিত্রিয়স দিয়ামানতাকোস (Dimitrios Diamantakos)। একটি নয়, করলেন জোড়া গোল। আর ফেরালেন প্রায় দেড় বছর বাদে মোহনবাগানকে (Mohun Bagan) সিনিয়র ডার্বিতে হারানোর স্মৃতি!
এ পর্যন্ত তবু মেনে নেওয়া যায়। ইস্ট-মোহন ম্যাচে হ্যাটট্রিকের নজিরও অপ্রতুল নয়। হাসন মুস্তাক থেকে পিকে ব্যানার্জি হয়ে শেখ আজমল—অনেক নায়ক তিন গোল মেরেছেন, কেউ কেউ তিন গোল করে নায়ক বনেছেন।
কিন্তু দিমিত্রিয়সের গল্পটা এখানেই আলদা। কয়েক মাস আগেই প্রশ্নচিহ্ন জমেছিল। মরশুম শুরু হওয়ার আগে গুঞ্জন ওঠে—তাঁকে ছেঁটে নতুন স্ট্রাইকার আনা হোক। শেষমেশ তা হয়নি। চুক্তি ভাঙলে মোটা ক্ষতিপূরণ গুনতে হত, তাই রেখে দেওয়া ছাড়া উপায় ছিল না। গতকালের ডার্বিতেও হামিদ আহদাদ চোট পেয়েছেন বলেই মাঠে নামলেন। আর নামামাত্র প্রমাণ করলেন কোচ অস্কার ব্রুজোর অনীহার সিদ্ধান্ত হওয়া সত্ত্বেও কেন তিনিই ইস্টবেঙ্গলের তুরুপের তাস হয়ে ওঠার ক্ষমতা রাখেন!
আসলে দিয়ামানতাকোসকে বাতিল জঞ্জাল ভেবে নিচ্ছিলেন যাঁরা, তাঁদের অনেকেই বছর বত্রিশের স্ট্রাইকারের ‘কেরিয়ার ম্যাপিং’ ভালভাবে দেখেননি। লম্বা কেরিয়ারে তিনি বারবার দেয়ালে পিঠ ঠেকে যাওয়ার পরেও ফিরে এসেছেন। গ্রিসে পিএওকে-র জুনিয়র দলে শুরু। তারপর বড় ক্লাবের ডাকে ভেসে যাওয়া, প্রত্যাশার চাপ, চোট, ফর্মহীনতা—সব মিলিয়ে অনেকবারই মনে হয়েছে এবার হয়তো সব শেষ। আর বুঝি ঘুরে দাঁড়াতে পারলেন না। কিন্তু সন্দেহবাদীদের মুখে ছাই দিয়ে প্রতিবার কামব্যাক করেছেন দিমিত্রিয়স। নতুন ক্লাব, নতুন পরিবেশে মানিয়ে নিতে সময় নিয়েছেন ঠিকই। কিন্তু একবার ধাতস্থ হতেই আবার গোল করে জায়গা ছিনিয়ে নিয়েছেন। এটাই তাঁর চরিত্র। ভেতরের অটুট জেদই দীর্ঘদেহী স্ট্রাইকারের আসল ইউএসপি, যেটা বড় ম্যাচে বড় মাপের ফরোয়ার্ডদের আসল অস্ত্রও বটে!
জার্মানিতে ভিএফএল বোহুমের দিনগুলো করা যাক। সেকেন্ড ডিভিশনের টিমের হয়ে গাদা গাদা গোল করেই দিয়ামানতাকোস শিরোনামে উঠে এসেছিলেন। তখন থেকেই তাঁকে বলা শুরু হয় ‘বিগ-ম্যাচ প্লেয়ার’। গুঞ্জন জোরালো হওয়ায় অলিম্পিয়াকোস সই করায়। কিন্তু গ্রিক লিগের বড় দলে জায়গা পাকা হয়নি। লোনে ফের ছোট দলে যাওয়ামাত্র ফর্ম ফিরে পান। বারবার নিজের অস্তিত্ব প্রমাণ করাটাই যেন নেশার মতো চেপে বসে!
কেরিয়ারের মধ্যপর্ব কিছুটা স্তিমিত। ২০১৮ সালে শালকের বিরুদ্ধে প্রি-সিজন ম্যাচে গোল করে ফের ইউরোপের আলোয় উঠে আসা। ভারতীয় ফুটবলে পা রাখার পর কেরালা ব্লাস্টার্সের জার্সিতে গোলসংখ্যা আহামরি কিছু না হলেও গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তে বল জালে জড়িয়ে নজর কাড়েন। সেই স্মৃতিই উসকে উঠেছে গতকাল।
দিমিত্রিয়সের বয়স এখন ৩২। এই আয়ুষ্কালে ইউরোপীয় স্ট্রাইকারদের বাজারমূল্য কমতে থাকার কথা। কিন্তু দিয়ামানতাকোস সে নিয়ম ভেঙেছেন। যার প্রধান কারণ, তিনি এখনও ম্যাচের চাপ সামলাতে পারেন। জানেন, কীভাবে বড় মঞ্চে ঝলসে উঠতে হয়! এখানেই তিনি প্রাসঙ্গিক। উপরন্তু নজরকাড়া ফিটনেস, নিয়ন্ত্রিত জীবনযাপন তাঁকে চোট-আঘাতের ভয় থেকে বাঁচাচ্ছে। ফলে দীর্ঘ মরশুমে দলের ভরসাযোগ্য স্ট্রাইকার হিসেবে কার্যকরী হয়ে উঠতে পারেন।
টেকনিক্যাল দিক দিয়ে দেখতে গেলে সবচেয়ে বড় ব্যাপার, শুধু গোল করা নয়, গ্রিক স্ট্রাইকার বিল্ড আপ প্লে-তেও ছাপ রাখতে দড়। গতকালের ম্যাচের কথাই ধরা যাক। দেখা গেল, মাঝমাঠে নেমে এসে বল কন্ট্রোল করছেন, ডিফেন্ডারদের টেনে জায়গা বানাচ্ছেন, উইঙ্গারদের দৌড়নোর রাস্তা খুলে দিচ্ছেন। ইউরোপে খেলে আসা স্ট্রাইকাররা সাধারণত এই বহুমুখিতা নিয়ে আসে, যা ভারতীয় ফুটবলে দুর্লভ। দিমিত্রিয়সের অভিজ্ঞতা আনকোরা দেশীয় ফুটবলারদেরও সাহায্য করছে। বোঝাপড়া গড়ে উঠছে। যা ইস্টবেঙ্গলের আগামী দিনের সম্পদ হয়ে উঠতে পারে।
তবু সমর্থকরা আশঙ্কায়। কারণ তাঁকে ঘিরে প্রত্যাশা ছিল গোলমেশিনের! কিন্তু বাস্তব সত্যিটা হল, কোনও স্ট্রাইকারই প্রতিটি ম্যাচে গোল করেন না। এমনকি ইউরোপের মহাতারকারাও অফ-ফর্মে যান। আসল পার্থক্যটা গড়েন তাঁরা, যাঁরা খারাপ সময় কাটিয়ে আবার ফিরতে জানেন। দিয়ামানতাকোস সেই বিরল গোত্রের ফুটবলার। সমালোচনাকে এড়িয়ে মাঠে নিজের দাপটে উত্তর দিতে মন্ত্রসিদ্ধ। ডার্বির মতো মঞ্চে যিনি ঠান্ডা মাথায় ফিনিশিং করতে পারেন, তাঁর উপর ভরসা না রাখাটা বড় ভুল।
তাই ইস্টবেঙ্গল সমর্থকদেরও দিমিত্রিয়স দিয়ামানতাকোসকে নিয়ে সংশয় সরিয়ে রাখা উচিত। তিনি সাময়িক সমাধান নন, দীর্ঘমেয়াদি ভরসা। অভিজ্ঞতা, মানসিক দৃঢ়তা, পেশাদারি—সব মিলিয়ে এখনই লাল-হলুদ শিবিরের সম্পদ। ফিনিক্স পাখির মতো ছাই থেকে উঠে আসা তাঁর অভ্যাস। এই অভ্যাসে আস্থা রাখা জরুরি!