আপনি মানুন চায় না মানুন, এক্সট্রাক্লাসা এখন ইউরোপের সবচেয়ে রোমাঞ্চকর লিগ। প্রতিটি ম্যাচই এখানে ফাইনাল।

গ্রাফিক্স: দিব্যেন্দু দাস
শেষ আপডেট: 16 March 2026 15:24
দ্য ওয়াল ব্যুরো: কোন ফুটবল লিগ সর্বাধিক প্রতিযোগিতামূলক, কোথায় রেষারেষি সবচেয়ে কাঁটায়-কাঁটায়? সমর্থক মহলে এই প্রশ্ন রাখলে একাধিক জবাব মিলতে পারে। কেউ বলবেন, ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগ ধারে-ভারে আর সবাইকে টেক্কা দেবে। এখানে যে কোনও লিলিপুট ক্লাব নিজেদের দিনে দৈত্যাকার দলকে নাকানিচোবানি খাওয়ায়। নিশ্চিত জয় বলে কোনও বস্তুই নেই!
বিরোধিতা করবেন কেউ কেউ৷ জানাবেন, আজকাল লা লিগায় যথেষ্ট টক্কর চলে। পিছিয়ে নেই ফরাসি লিগও৷ সেরি আ-তেও প্রতি মরসুম চ্যাম্পিয়ন বদলে যায়৷ বুন্দেসলিগায় সাম্প্রতিক সময়ে বেশ কয়েকবার চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে বায়ার্ন মিউনিখ৷
অনেক নামই উঠে আসবে৷ বিতর্ক জমবে৷ কিন্তু কেউ পোলিশ লিগের নামটুকু করবে না। অথচ ইদানীং এই ফুটবল টুর্নামেন্ট-ই দুনিয়ার নজর কেড়েছে৷ সাম্প্রতিকতম পরিসংখ্যান বলছে, আঠারো টিমের এই প্রতিযোগিতা আপাতত যে পরিস্থিতিতে দাঁড়িয়ে, তাতে যে কেউ খেতাব জিততে পারে, তলিয়ে যেতে পারে অবনমনের চোরাবালিতেও৷ পয়েন্টের হিসেব এতটাই ভয়ঙ্কর, টানটান!
লেজিয়া রেলিগেশন জোনে, শীর্ষে লুবিনের ছোট্ট ক্লাব!
পোলিশ শীর্ষ লিগের নাম এক্সট্রাক্লাসা (Ekstraklasa)। ৩৪ ম্যাচের মরসুমে এখনও এক তৃতীয়াংশ বাকি। এই মুহূর্তে লিগ টেবিলের শীর্ষে জাগলেবিয়ে লুবিন (Zaglebie Lubin)—যে শহরের জনসংখ্যা মাত্র ৭০ হাজার, পোল্যান্ডের সবচেয়ে বড় ৫০টি শহরের তালিকাতেও নেই। গত সিজনে ছিল ১৫তম স্থানে, রেলিগেশন জোন থেকে মাত্র এক ধাপ উপরে।
যদিও সমর্থকদের সবচেয়ে অবাক করেছে লেজিয়া ওয়ারশ (Legia Warsaw)। পোল্যান্ডের সবচেয়ে বড়, সবচেয়ে সফল ক্লাব—৪৩টি শিরোপা, ১৫খানা লিগ খেতাব। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে কখনো রেলিগেট হয়নি। সেই লেজিয়া-ই এখন অবনমন বৃত্তে! গত মরসুমে কনফারেন্স লিগের কোয়ার্টার ফাইনালে নামে, স্ট্যামফোর্ড ব্রিজে চেলসিকে হারিয়ে দেয়! এক দশক আগে চ্যাম্পিয়নস লিগের গ্রুপ পর্বেও জায়গা করে নিয়েছিল। তারাই এখন টিকে থাকার লড়াইয়ে।
পোলিশ সাংবাদিক ইয়াকুব বালচের্স্কি এই পরিস্থিতিকে তুলনা করেছেন জুভেন্তাস বা বায়ার্ন মিউনিখের রেলিগেশনের সম্ভাবনার সঙ্গে। তাঁর কথায়, ‘এটা অকল্পনীয়… কিন্তু হতেই পারে!’
টাকা দিয়ে সাফল্য কেনা যায় না
এই লিগের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য—বিত্তবান ক্লাবও নিরাপদ নয়। ধনবান উইদজেউ লডজ (Widzew Lodz) এক্সট্রাক্লাসার ইতিহাসে চলতি সিজনে তিনটি সবচেয়ে দামি ট্রান্সফার সেরেছে। আন্তর্জাতিক তারকা ওসমান বুকারিকে অস্টিন এফসি থেকে আনা হয়েছে সাড়ে পঞ্চাশ লক্ষ ইউরোয়। তবু দলটি রেলিগেশন জোনে।
পোলিশ ফুটবল সাংবাদিক পাভেল উইলকোউইচ বলেন, ‘পোল্যান্ডে কখনও ইউক্রেন বা রোমানিয়ার মতো অলিগার্ক হেজিমনি ছিল না। এখানে বুদ্ধিমান ক্লাব টাকাওয়ালা ক্লাবকে হারায়। ধৈর্য ও দূরদর্শিতা টাকার চেয়ে বেশি কাজ দেয়!’
২০১৯ থেকে ২০২৪-এর মধ্যে তিনটি নতুন চ্যাম্পিয়ন দেখেছে পোল্যান্ড—পিয়াস্ট গ্লিউইৎসে, রাকোউ চেস্তোখোভা ও ইয়াগেলোনিয়া বিয়ালিস্তোক। এই শতাব্দীতে মোট ন’টি আলাদা ক্লাব চ্যাম্পিয়ন হয়েছে।
ইউরোপে পোলিশ ক্লাবের দাপট, দর্শকও বাড়ছে
শুধু ঘরোয়া মরসুমে নয়, সাম্প্রতিক সময়ে ইউরোপীয় মঞ্চেও মাথা তুলছে পোলিশ ফুটবল। উয়েফার এই সিজনের কো-ইফিশিয়েন্ট তালিকায় পোল্যান্ড ষষ্ঠ—পিছনে ঠেলেছে ফ্রান্সকেও! রাকোউ কনফারেন্স লিগের গ্রুপ পর্বে অপরাজিত থেকে দ্বিতীয় হয়েছে। লেখ পজনানও উঠেছে নকআউটে।
যে কারণে স্টেডিয়ামে দর্শকও ফিরছে দলে দলে। এই মরসুমে গড় উপস্থিতি ১৩ হাজার প্রতি ম্যাচে—এক দশক আগে যা ছিল মাত্র ছয় হাজারের কাছাকাছি। মোটের উপর ৬০ শতাংশ বৃদ্ধি। ২০১২ ইউরো আয়োজনের সুবাদে দেশজুড়ে স্টেডিয়াম পুনর্নির্মাণ। এখন পোল্যান্ডে ১৫ হাজারের বেশি ধারণক্ষমতার ময়দানের সংখ্যা ২৩। সাংবাদিক উইলকোউইচের নজরে, ‘পোলিশ সংগীত ও চলচ্চিত্র ইদানীং বিশ্বমঞ্চে জায়গা করে নিচ্ছে। ফুটবলও সেই পথে হাঁটছে!’
কে শেষ হাসি হাসবে?
শীর্ষে জাগলেবিয়ের ৪১ পয়েন্ট। ১০ পয়েন্টের মধ্যে আরও ১২টি দল। ইয়াগেলোনিয়া ও লেখ পজনান ৩৮ পয়েন্টে, রাকোউ ৩৭-এ। মরসুম শেষ না হওয়া পর্যন্ত কিছুই নিশ্চিত নয়—শিরোপা কে পাবে, অবনমনে কে যাবে, ইউরোপের টিকিট কোন দলের হাতে আসবে!
আপনি মানুন চায় না মানুন, এক্সট্রাক্লাসা এখন ইউরোপের সবচেয়ে রোমাঞ্চকর লিগ। প্রতিটি ম্যাচই এখানে ফাইনাল।