
শেষ আপডেট: 8 February 2023 12:07
সুপ্রাচীন ভাস্করদের হাতের স্পর্শ ছড়িয়ে আছে বিশ্বজুড়ে। রক আর্টের শত শত প্রাচীন নিদর্শনের দেখা মিলবে ইউরোপ, আমেরিকা, লাতিন আমেরিকা, আফ্রিকা, এশিয়া এবং অস্ট্রেলিয়াতে। গোলান হাইট থেকে আমরা খুঁজে পেয়েছি ৩-৫ লক্ষ বছরের প্রাচীন প্রস্তর শিল্প'ভেনাস অফ বেরেখাট রাম'। এভাবেই আমরা আবিষ্কার করেছি ইস্টার আইল্যান্ডের মোয়াই স্ট্যাচু। চেক রিপাবলিকের 'দ্য ডেভিল হেড'। রোমানিয়ার ডিসেবালাস রেক্স। বুলগেরিয়ার 'মারদারা রাইডার'। মেক্সিকোর 'ওলমেক হেড'। তুরস্কের 'নেমরুট ডাগ' কিংবা কম্বোডিয়ার বেয়ান মন্দির সহ আরও কত শত সুপ্রাচীন রক আর্ট।
[caption id="attachment_2428688" align="aligncenter" width="1052"]
ভেনাস অফ বেরেখাট রাম[/caption]
তবে নান্দনিকতার দিক থেকে রক আর্টে সেরা ছিলেন ভারতীয়রা। এছাড়া সহায়ক ভূপ্রকৃতির জন্য প্রাচীনকাল থেকেই ভারত ছিল ভাস্করদের স্বর্গ রাজ্য। তাইতো ভারতের অজন্তা, ইলোরা, খাজুরাহো,এলিফ্যান্টা, বিদিশার উদয়গিরি গুহা, বাদামি গুহা, বরাহ গুহা,মহিষমর্দিনী মণ্ডপ, পুরী মন্দির, কোনারকের সূর্য মন্দির, ধর্মশালার কাংড়া দুর্গ সহ আরও শত শত রক আর্ট দেখার জন্য সারা বিশ্ব থেকে আজও ছুটে আসেন লক্ষ লক্ষ পর্যটক।
[caption id="attachment_2428691" align="aligncenter" width="883"]
একটিই পাথর কুঁদে তৈরি করা ইলোরার নয়নাভিরাম কৈলাশ মন্দির[/caption]
রহস্যের কুয়াশা ঘেরা রঘুনন্দন পাহাড়[/caption]
উত্তর ত্রিপুরার কৈলাশহর থেকে ৮ কি মি দূরে আছে দুর্গম রঘুনন্দন পাহাড়। স্থানটির নাম একসময় ছিল সুবরাই খুঙ। কিন্তু কালের হেঁয়ালিতে স্থানটির নাম আজ ঊনকোটি। সেখানেই আছে একদল অজ্ঞাতপরিচয় ভাস্করের অবিশ্বাস্য কিছু শিল্পকর্মের নিদর্শন। পাহাড় কুঁদে বের করা সেইসব বিশালকায় অবয়বগুলিকে দেখে মনে হবে, আপনি বুঝি চলে এসেছেন, প্রাচীন মায়া সভ্যতার কোনও মায়াবী নগরে।
মোহিত হয়ে যাবেন পাহাড় কুঁদে তৈরি করা প্রায় তিরিশ ফুট উচ্চতার ঊনকোটিশ্বর কাল ভৈরবের মুখাবয়বটি দেখে। মহাদেবের মাথার দু'দিকে ফোয়ারা আকৃতির জটা। কপালে সাতটি পুর্ণচন্দ্রখচিত পটি। দুই কানে বিশালকায় দুটি কর্ণকুণ্ডল। এছাড়াও ঘন সবুজে ঘেরা শান্ত নির্জন পাহাড়ের গায়ে খোদাই করা আছে অজস্র দেবদেবীর মূর্তি। আছে আরও অজস্র মুখ। সেই মুখগুলির অধিকাংশই দেবাদিদেব মহাদেবের। গণেশকুণ্ড সংলগ্ন পাথরে খোদাই করা আছে তিনটি গণেশ মূর্তি। তার পাশেই রয়েছে চতুর্ভুজ বিষ্ণু মূর্তি। এভাবেই পাথর কুঁদে তৈরি করা হয়েছে দুর্গা, রাম, রাবণ, যমুনা, হিড়িম্বা, হনুমান, ঐরাবত ও শিবের বাহন নন্দীর মূর্তি। আছে আরও অনেক অজানা মূর্তি। সে মূর্তিগুলি কাদের আজও তা আবিষ্কার করা সম্ভব হয়নি।
[caption id="attachment_2428707" align="aligncenter" width="800"]
ঊনকোটিশ্বর কাল ভৈরব[/caption]
রঘুনন্দন পাহাড়ে আসা এক কোটি দেবতার মধ্যে, ৯৯ লক্ষ ৯৯ হাজার ৯৯৯ জন দেবদেবী, সেই ভোরে রূপান্তরিত হয়ে গিয়েছিলেন পাথরের মূর্তিতে। একমাত্র মহাদেব এগিয়ে গিয়েছিলেন কাশীর দিকে। সেইদিন থেকে জায়গাটির নাম হয়ে গিয়েছিল ঊনকোটি (Unakoti)। শব্দটির অর্থ এক কোটির থেকে এক কম।
কালক্রমে রঘুনন্দন পাহাড় হয়ে গিয়েছিল হিন্দুদের পবিত্র শৈবতীর্থ ঊনকোটি। আজও শিবরাত্রি ও মকর সংক্রন্তিতে ঊনকোটিতে সমবেত হন হাজার হাজার ধর্মপ্রাণ হিন্দু। চৈত্র মাসের শুক্লপক্ষের অষ্টমী তিথিতে ঊনকোটিতে সাড়ম্বরে অনুষ্ঠিত অশোকাষ্টমী মেলা। ভক্তদের মনে প্রশ্ন জাগে, বছরের পর বছর ঘাম রক্ত ঝরিয়ে কারা রঘুনন্দন পাহাড়ের গায়ে খোদাই করে গিয়েছিলেন এই সব হিন্দু দেবদেবীর মূর্তি!
কিন্তু কোথায় হারিয়ে গেলেন বাস্তবের কারিগরেরা!
ভারতকে এহেন অবিশ্বাস্য শিল্পকর্ম উপহার দিয়ে গেলেও, কালু কুমোরের নাম লেখা নেই পুরাণ বা ইতিহাসে। কালু কুমোরের কোনও হদিশ পাননি পুরাতাত্ত্বিক, প্রত্নতত্ত্ববিদ ও ইতিহাসবিদেরা। তাই তিনি বাস্তবের কোনও মানুষ না কাল্পনিক চরিত্র তাও জানা যায় না। তবে এটা বাস্তব, এই বিশাল কর্মযজ্ঞ সমাপ্ত করা একজন মানুষের পক্ষে সম্ভব নয়। কয়েক শত প্রশিক্ষিত ও পেশাদার ভাস্কর বানিয়েছিলেন এই অত্যাশ্চর্য রক আর্ট গ্যালারি। কিন্তু তাঁরা কারা! সে উত্তর আজও পাওয়া যায়নি।
অনেকে অনুমান করেন, এই বিশালকায় রক আর্ট গ্যালারি কোনও না কোনও রাজা বা সম্রাটের আমলে তৈরি। সাধারণ কোনও ধনী বা জমিদারের পক্ষে এই বিপুল পরিমাণ অর্থ ব্যয় করা সম্ভব নয়। কিন্তু সেখানেই ওঠে প্রশ্ন, রাজা, মহারাজা বা সম্রাটেরা নিজেদের শাসনকালের সেরা অবদানগুলি ধরে রাখতেন তাঁদের লেখানো ইতিহাসের পাতায়। কিন্তু ঊনকোটির নাম নেই কেন!
ইতিহাসবিদদের মতে ঊনকোটির এই অভিনব ভাস্কর্যগুলি তৈরি হয়েছিল অষ্টম বা নবম শতাব্দীতে। সেই সময় এই এলাকা সহ সমগ্র ত্রিপুরা শাসন করতেন হিন্দু ফা- রাজারা। ষষ্ঠ শতাব্দীতে রাজা প্রতীত এই রাজবংশের পত্তন করেছিলেন। ফা রাজারা শৈব ছিলেন। তাঁরা যদি ঊনকোটির অনবদ্য রক আর্ট ভারতবর্ষকে উপহার দিয়ে থাকেন, সেকথা কেন লেখা নেই রাজা ধর্ম মানিক্যের শাসনকালে লেখা, ত্রিপুরা সম্পর্কিত আকরগ্রন্থ রাজমালায়!
ঊনকোটির রহস্য এক সময় পৌঁছে গিয়েছে ত্রিপুরার উত্তর থেকে দক্ষিণে। গভীর থেকে গভীরতর হয়ে সে রহস্য প্রবাহিত হয়েছে গোমতী নদীর স্রোতধারায়। দক্ষিণ ত্রিপুরায় আছে ৮৫ কিলোমিটার দৈর্ঘের দেবতামুড়া পর্বতমালা। তারই একটি অংশ ছবিমুড়া। গোমতী নদীর তীর থেকে খাড়া উঠে যাওয়া পাথুরে কালাঝারি পাহাড়ে কারা যেন অসীম মমতায় কুঁদে রেখে গিয়েছে দেবী দুর্গা, গণেশ ও কার্তিক সহ আরও অনেক দেবদেবীর মূর্তি। কারা বানিয়েছিলেন এই দৃষ্টিনন্দন মূর্তিগুলি, কারা করেছিলেন পৃষ্টপোষকতা, সে বিষয়েও বিস্ময়করভাবে নিশ্চুপ ইতিহাস। তবে ইতিহাসবিদেরা বলেন দেবতামুড়ার ভাস্কর্যগুলি ঊনকোটির থেকে পাঁচ সাতশো বছর পরে তৈরি।
[caption id="attachment_2428718" align="aligncenter" width="636"]
দেবতামুড়া পাহাড়ের গায়ে খোদাই করা মা দুর্গা[/caption]
কালের ফারাক থাকলেও, ইতিহাস কিছু লিখে না রাখায় সন্দেহ হয়, ঊনকোটি ও দেবতামুড়ার মধ্যে কোনও যোগসূত্র নেইতো! ইচ্ছাকৃতভাবে সব তথ্য মুছে দেওয়ার চেষ্টা করা হয়নি তো! অনেকে ঊনকোটির ভাস্কর্যগুলির মধ্যে ট্রাইবাল আর্টের স্পর্শ খুঁজে পান। তাঁদের মনে প্রশ্ন জাগে, ঘন অরণ্য ও পাহাড়ে হারিয়ে যাওয়া কোনও অনাবিষ্কৃত সভ্যতা আমাদের ঊনকোটি উপহার দিয়ে যায়নি তো!
ভারতের প্রায় সমস্ত রক আর্টের সময়কাল ও পৃষ্টপোষক রাজা বা রাজবংশের হদিশ পাওয়া গেলেও ব্যতিক্রম ঊনকোটি। তাই ইতিহাসে উৎসাহী মানুষদের মনে জাগে হাজার প্রশ্ন। ভাস্কর্যের জন্য কেন নির্বাচন করা হয়েছিল জনবিচ্ছিন্ন ও দুর্গম এই এলাকা? শৈবতীর্থে শিবমন্দির না বানিয়ে আস্ত পাহাড়টিকেই কেন শিবমন্দিরে রূপান্তরিত করে ফেলা হয়েছিল?
[caption id="attachment_2428720" align="aligncenter" width="550"]
রঘুনন্দন পাহাড়ই হয়ে উঠেছে শিবমন্দির[/caption]
ঊনকোটি সম্পর্কিত কোনও প্রশ্নেরই অকাট্য ও বিশ্বাসযোগ্য উত্তর নেই। তাই আজও শ্যাওলার সোঁদা গন্ধভরা প্রাচীন অরণ্যের বুকে অবহেলায় পড়ে আছে ঊনকোটি। পুরাণের অহল্যার মতো। অপেক্ষা করছে কোনও এক মহামানবের। যিনি বিশ্বকে জানাবেন। কে বা কারা, রক আর্টের ইতিহাসের অন্যতম সেরা নিদর্শনটি উপহারটি দিয়ে, নীরবে বিদায় নিয়েছিলেন পৃথিবী থেকে। যাদের মনে রাখার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেনি ইতিহাস।
আরও পড়ুন: আফগান মোনালিসা, বিশ্ববিখ্যাত ছবি যাঁকে দিয়েছিল এক অভিশপ্ত জীবন