হার মানেনি 'অর্বরি', আঁকে বাঁকে চলা ছোট্ট নদীতে বইছে আশার স্রোত।

গ্রাফিক্স: শুভ্র শর্ভিন
শেষ আপডেট: 25 October 2025 19:41
'আবার দেখা হোক নদীর মোহনায়
যেখানে উচ্ছ্বল স্রোতের পদাবলী
সহসা খুলে ফেলি সমূহ শৃঙ্খল
যদিও ধেয়ে আসে বেদনাঘনপলি...'
বিকেলের শেষ আলোটা তখন ঢলে পড়ছে অর্বরির জলে। নদীর ধারে দু'জন বসে, নীরব। হাওয়ায় মাটির গন্ধ ভাসছে, দূর থেকে শোনা যাচ্ছে পাখির ডাক। জলটা আস্তে আস্তে বয়ে চলেছে, যেন সময়ও একটু থেমে গেছে তাঁদের জন্যই। কে জানে, হয়তো এমনই কোনও নদীর পারে বছর দশেক আগে প্রথম দেখা হয়েছিল তাঁদের। যেখানে নদীও জানত, হারিয়ে গেলেও আবার ফিরে আসা যায়। যেমনভাবে অর্বরি এসেছে...
রাজস্থানের শুকনো, ধুলোমাখা পাহাড়ের বুক চিরে একসময় বয়ে যেত এক সরু নদী। নাম তার অর্বরি। গ্রীষ্মে যখন চারদিক পুড়ে যেত, তখনও গ্রামের মানুষ জানত, অর্বরি আছে বলেই জীবন আছে। কিন্তু একদিন সেই নদীই হারিয়ে গেল। শুকিয়ে গেল তার বুকের জল। কয়েক দশক ধরে তার বালুচরে কেবল ধুলো উড়েছে, হাওয়ায় ভেসেছে হাহাকার। কেউ তার খোঁজ নেয়নি। ঘাটে এসে প্রিয়জনকে নিয়ে বিকেল হতে দেখেনি। কেউ আর বছর দশেক পরে অপেক্ষা করেনি ফিরে পাওয়ার।

আমাদের ছোটনদী চলে বাঁকে বাঁকে
অর্বরি নদী রাজস্থানের আলওয়াড় জেলার থানাগাজি ব্লকের ভানেতা গ্রাম থেকে জন্ম নিয়েছিল। ছোট্ট এই নদী প্রায় ৯০ কিলোমিটার পথ পেরিয়ে সাহিবি নদীতে মিশে ছিল। কিন্তু একসময় সে পুরোপুরি শুকিয়ে যায়। ৬০ বছর ধরে অর্বরির বুক শুকনোই পড়ে ছিল। চাষবাস বন্ধ, গাছপালা উধাও, গ্রামগুলোও পরিণত হয়েছিল মরুভূমিতে। অর্বরিতে থেকে গেছিল শুধু শুকনো কয়েকটা স্মৃতি।

শুকনো বুকেও স্রোত জাগে
আশির দশকের শেষ দিকে গ্রামের মানুষ আর চুপ করে বসে থাকেনি। তাঁরা বুঝেছিল ভারতের সবচেয়ে ছোট নদীর গুরুত্ব। তাঁদের পাশে দাঁড়ায় স্থানীয় এক স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা তরুণ ভারত সংঘ। সবাই মিলে সিদ্ধান্ত নিলেন, নদী ফিরিয়ে আনতেই হবে। তাঁরা ব্যবহার করলেন পুরনো, প্রাচীন পদ্ধতি। তৈরি করলেন ছোট ছোট মাটির বাঁধ, যেখানে বর্ষার জল জমে থাকবে।
বছর কেটে গেল। ধীরে ধীরে মাটির নীচে জলের স্তর বাড়তে শুরু করল। তারপর একদিন গ্রামবাসীরা দেখলেন, শুকনো খাত বেয়ে আবার জল বয়ে চলেছে! বহু বছর পর অর্বরির বুক ভরে উঠল জলে।

আশার স্রোত বইছে অর্বরিতে
জল ফিরে আসতেই বদলে গেল পুরো অঞ্চল। চাষের জমি আবার সবুজ হল, গম, সর্ষে আর শাকসবজির ফলন বাড়ল। পাখিরা ফিরল, মাছেরা ফিরল, গাছেরা আবার ছায়া দিল। যেন মৃত মরুভূমির বুকে প্রাণ ফিরে এল।
নদী ফিরে এলেও, গ্রামবাসীরা জানতেন— অর্বরির যত্ন না নিলে আবার সব হারিয়ে যাবে। তাই তাঁরা গঠন করলেন ‘অর্বরি নদী সংসদ’। প্রতি বছর এই সংসদে গ্রামের মানুষ একত্র হন, ঠিক করেন কে কত জল ব্যবহার করবেন, কীভাবে নদীকে পরিষ্কার ও টিকিয়ে রাখা হবে। কোনও সরকার নয়, এই সংসদের সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত।

আজ অর্বরি শুধু ভারতের সবচেয়ে ছোট নদী নয়, এটি এক আশার প্রতীক। যেখান থেকে বিশ্ব শিখেছে, মানুষ চাইলে প্রকৃতিকে আবার জাগিয়ে তুলতে পারে। আজ এই নদীর কথা সবাই জানে। পড়ানো হয় স্কুলে, গবেষণা হয় বিশ্ববিদ্যালয়ে। তাই অর্বরি হার মানেনি! মানুষ পাশে ছিল যে...
৯০ কিলোমিটারের ছোট্ট নদী অর্বরি আজ বারবার বলে— “আমি বেঁচে আছি, কারণ মানুষ একসঙ্গে লড়েছে...”