চিরটাকাল গর্ব করতেন পান্নালালের (Pannalal Bhattacharyay) মতো ভাই পেয়েছেন বলে! তবু সেই ভালবাসার আগল কেন সরে গিয়েছিল সে দিন? ধনঞ্জয়ের (Dhananjay Bhattacharyay) পুত্র দীপঙ্করের কাছে শুনেছিলেন দেবশঙ্কর মুখোপাধ্যায়।

পান্নালাল ও ধনঞ্জয় ভট্টাচার্য।
শেষ আপডেট: 18 October 2025 15:10
পুত্রবৎ স্নেহ করতেন। গুরুমশাইয়ের মতো শাসন করতেন। আবার ভাই পান্নালালকে এক বার ঈর্ষাও করে ফেলেছিলেন সঙ্গীতসাধক ধনঞ্জয়! আর একবার তো এমন হল, কিছুকালের জন্য দাদার সঙ্গে কথা বলা অবধি বন্ধ করে দেন ভাই পান্না।
এ কথা আমায় নিজের মুখে বলেছেন ধনঞ্জয় ভট্টাচার্যের মধ্যম পুত্র দীপঙ্কর ভট্টাচার্য। গোটা বাংলার সাংস্কৃতিক জগৎ, এমনকি ময়দানের ফুটবল-পাড়াও যাঁকে ‘দীপা’ নামে চেনে। বছর কয়েক আগে প্রয়াত হয়েছেন তিনি।
বাবার ছায়াসঙ্গী শুধু নন, বাংলা ও হিন্দি পুরনো গান এবং ছায়াছবির এক কথায় ‘চলমান এনসাইক্লোপিডিয়া’ ছিলেন দীপাদা। থাকতেন তাঁর বাবার কলকাতার আবাস কলেজ স্ট্রিটের ‘সিসিল হোটেল’ থেকে ক’টা গলি পরে। সারদা ভবন, ৬৮/৬ শ্রীগোপাল মল্লিক লেনে।
ঈর্ষার কথা, মন কষাকষির কথায় নয় পরে আসা যাবে। গোড়ায় স্নেহ ও শাসনের ঝাঁপি থেকে অজস্র গল্পের ক’খানি অন্তত শোনানো যাক।
পান্নার জন্মের সময়কাল থেকেই ভটচায-পরিবারে দুর্যোগের কালো মেঘ! এর কিছুকাল আগে শরিকি বিবাদে হাওড়ার আমতায় পায়রাটুঙ্গির অগাধ সম্পত্তির জমিদারি খুইয়েছেন ধনঞ্জয়ের পিতা সুরেন্দ্রনাথ। সেই সঙ্গে ভিটে-বাড়ি থেকে বিতাড়িতও।

পিতা সুরেন্দ্রনাথ
ভাগ্যিস রেলওয়ের বড়বাবু ছিলেন তিনি! তাই রামরাজাতলায় ভাড়া বাড়ি নিয়ে উঠে গিয়ে আবার সংসার পাতলেন নতুন করে। ভাড়ায় থাকতে থাকতেই বারেন্দ্রপাড়ায় জমি কিনলেন। স্বস্তি নামছিল পরিবারে। তখনই হঠাৎ হার্টফেল করে মারা গেলেন সুরেন্দ্রনাথ। সে আঘাত সইতে না সইতে বড় ছেলে লক্ষ্মীকান্তর অকাল মৃত্যু দেখলেন তাঁর বিধবা ঘরণী অন্নপূর্ণা।
অন্নপূর্ণার অষ্টম গর্ভের পুত্র ধনঞ্জয় তখন সবে সাত বছরের বালক। কনিষ্ঠ পান্না পেটে। হাতে কানাকড়ি নেই। এর-তার সাহায্যটুকু সম্বল। বনবাদাড় থেকে ঘাসপাতা এনে সেদ্ধ করে অন্নপূর্ণা ছেলেপুলেদের মুখে দিতেন। নিজে খেতেন তারই ছাঁকনি করা জল।
এই সময়েই জন্ম নেওয়া পান্না আত্মীয়-পরিজনের চোখে হয়ে যান ‘অপয়া’! তাই ছোট থেকে শিশু পান্নার অনাদর-অবহেলা ছিল বলতে গেলে নিত্যসঙ্গী। কিন্তু মা অন্নপূর্ণা আর দাদা ধনঞ্জয়ের আদর, আগল তাকে ঘিরে রাখত সবটা সময়।

মা অন্নপূর্ণা
কিশোরবেলা থেকেই পান্নার গানের গলা মিঠে। আপন খেয়ালে সে গান গেয়ে বেড়ায়। দাদা ধনঞ্জয় আর প্রফুল্লর কাছে গান শেখে। একটু বড় হতেই তাকে শাস্ত্রীয় সঙ্গীত শেখাতে ধনঞ্জয় নিয়ে গেলেন প্রখ্যাত সঙ্গীতকার যামিনী গঙ্গোপাধ্যায়ের কাছে। পান্নার আরেক ‘গুরু’ হলেন স্বনামধন্য সঙ্গীতজ্ঞ জ্ঞানপ্রকাশ ঘোষ। সে’ও দাদা ধনঞ্জয়ের ইচ্ছেয়।
দাদা তাঁকে নিয়ে গেলেন রেকর্ড কোম্পানি এইচএমভি-তে। আরেক দাদা প্রফুল্ল তাঁকে হাজির করলেন মেগাফোনে জেএন ঘোষের দরবারে। তাতেও ধনঞ্জয়ের মদত।

এক কালীপুজোর অনুষ্ঠানে ধনঞ্জয়
ধনঞ্জয়ের বুদ্ধিতেই ভক্তিগীতি গেয়ে গেয়ে আসর মাতাতে লাগলেন ভাই পান্না। ধনঞ্জয় বুঝেছিলেন কে মল্লিক, ভবানী দাস, মৃণালকান্তি ঘোষের পর বাংলায় ভক্তিগীতেতে ভাটা পড়েছে। ভাই পান্না সেই ভাটাতে জোয়ার আনবে! নিজে অসংখ্য ছবিতে হিট গান দেওয়ার পর, বহু অনুরোধেও ভক্তিগীতি গাইতেন না। বলতেন, ‘‘ওটা পানুর (পান্নালালের আদরের ডাক নাম) জায়গা, আমার নয়।’’
অন্য দিকে পান্না? দাদাকে এমনই সম্ভ্রম করতেন যে, জলসায় গেলে কিছুতেই দাদার পরে গাইতে চাইতেন না। এমনকি দাদার সামনেও না। সে কোন সময়? যখন তিনি ‘পান্নালাল’ হয়ে বাঙালি-শ্রোতার হৃদয়াসনে ঠাঁই নিয়েছেন! তা’ও!
এ নিয়ে দীপাদার কাছে শোনা পান্নালালের একটি রেকর্ডিঙের গল্প মনে পড়ল। ১৯৬৬ সাল। পুজোর জন্য ‘অপার সংসার নাহি পারাপার’ রেকর্ড করলেন পান্নালাল। বাড়ি ফিরতে বৌদি রেখাদেবী বললেন, ‘‘কী রে, কেমন হল পানু?’’

ধনঞ্জয় ভট্টাচার্যের স্ত্রী রেখা দেবী।
সে কথার উত্তর না দিয়ে কাছের বসন্ত কেবিনের চারটে ফিশ ফ্রাই অর্ডার করতে বলে বারান্দায় দাঁড়িয়ে পড়লেন। ফিশ ফ্রাই খেতে হলে একটা নয়, এক সঙ্গে চারটে খাওয়াই ছিল তাঁর দস্তুর।
রেখাদেবী এ বার কর্তা ধনঞ্জয়ের কাছে জানতে চাওয়ায় উত্তর পেলেন, ‘‘বাঁদরটার কাছে যা চেয়েছিলাম, তার ষাট ভাগ পেলাম।’’ কথা কানে যেতেই বারান্দা ছেড়ে ঘরে ঢুকে পান্নার সটান জবাব, ‘‘শোনো মেজদা, (এ নামেই ডাকতেন), তুমি যেটা চেয়েছিলে, সেটা যদি পেতে, তা হলে আমি হতাম ধনঞ্জয়, আর তুমি হতে পান্না!’’
দাদা বলতে পান্না অজ্ঞান। দাদাকে পুঙ্খানুপুঙ্খ নকল করতেন! গানে তো বটেই, হাঁটাচলায়, কথা বলায়, হাতের লেখায়, ধুতির কোঁচা হাতে নেওয়ায়, হাতা গুটিয়ে সাদা শার্ট পরায়, সবেতে। দাদাটিও তেমনি। গানে তো বটেই, জীবনের ওঠাপড়ার কত কিছুতেই যে তিনি ভাইয়ের রক্ষাকর্তা!
ফুটবল খেলতেন পান্নালাল। বারেন্দ্রপাড়ার মাঠে এক বার খেলতে খেলতেই চোখে বলের ‘মরণ’ ধাক্কা। স্থানীয় হাসপাতালের চিকিৎসায় কোনও কিচ্ছু হচ্ছিল না। তড়িঘড়ি ভাইকে কলকাতায় নিয়ে আসার হুকুম দিলেন। তার পর সোজা মেডিকেল কলেজ। ডাক্তাররা বলেছিলেন, দু’টো চোখই চলে যেতে পারে। শেষে দেড় মাসের যুদ্ধে একটা চোখ বাঁচল! কিন্তু সেই থেকে মণিটা গেল একটু সরে! এমন দাদার ভক্ত হবেন না, কোন ভাই!

পান্নালাল ভট্টাচার্য
পান্নার সবটা সময় ছিল দাদার কাজে নজর। সে নজর দাদার জীবনের কত দিকে যে! দাদা ভালবাসতেন মাছ ধরতে। এক বার দমদমের বি কে পালের বাগান বাড়িতে পুকুরে ছিপ ফেলে তাগড়াই মাছ উঠেছে ধনঞ্জয়ের। অনেক খেলিয়ে কিছুতেই বাগে আনতে পারছেন না। দোতলার ছাদে বসে লক্ষ করছিলেন পান্নালাল। ওখান থেকেই এক ঝাঁপ! ঢাউশ মাছটা জাপটে ধরে পাড়ে তুলে, এনে দিলেন দাদার জিম্মায়!
কিন্তু দাদাকে নকল করতে গিয়ে এক বার ‘কাল’ হয়েছিল পান্নার। উত্তম-মধ্যম জুটেছিল দাদার কাছেই। কী সেই ঘটনা? তখন গানের পাশাপাশি ধনঞ্জয় ছবিতে অভিনয়ও করে নাম কুড়িয়েছেন। ‘পাশের বাড়ি’, ‘শ্বশুরবাড়ি’, ‘লেডিস সিট’, ‘নববিধান’ সমেত আরও গোটা কতক ছবিতে! ‘নববিধান’-এ আবার ডাক পেয়েছেন স্বয়ং কাননদেবীর কাছ থেকে। এ সব দেখে পান্নারও শখ হয়েছিল দাদার মতো, ছবিতে অভিনয়ের।
৫১-’৫২ সালের কথা। ‘সাড়ে ৭৪’-এর কাস্টিং-পর্ব চলছে। পান্না তখন বড়জোর ২১, কী ২২। ছবিতে তাঁর তিন প্রাণের বন্ধু ‘চান্স’ পেয়েছে! সনৎ সিংহ, মানবেন্দ্র মুখোপাধ্যায়, শ্যামল মিত্র। ওঁরাই বোধ হয় তাতিয়েছিলেন তাঁকে। পান্না তো মুহূর্তে রাজি। শুধু বাড়ির সম্মতি চাই। মা’কে জিজ্ঞেস করলেন। তিনি সোজা বলে দিলেন, ‘‘তুই ধনাকে বলে দ্যাখ।’’ ভাইয়ের আব্দার এক কথায় ‘না’ করে দিলেন ধনঞ্জয়। তার পরও ভাই নাছোড় দেখে, কষে এক চড় গালে! ভাই আর টুঁ শব্দ করার চেষ্টা করেনি।

মেজো ছেলে দীপঙ্করের সঙ্গে ধনঞ্জয়
এ ঘটনা তা’ও এ ভাবে থেমেছিল। এক বার কিন্তু অন্য রূপ নিল। দাদার সঙ্গে চরম কাণ্ড করে ফেলেছিলেন ভাই পান্নালাল। দীপাদা গল্প বলেছিলেন তারও।
পান্নালাল খুব চাইতেন আধুনিক গান করতে। যে জন্য সুধীরলাল চক্রবর্তী বা অভিজিৎ বন্দ্যোপাধ্যায়ের সুরে কিছু আধুনিক গান রেকর্ড করেন তিনি। খ্যাতিও পান একই রকম। এ বার কারা বেশ তাঁকে বোঝায়, ‘‘তোর মেজদা কখনওই চায় না, তুই ওকে আধুনিক গানে টপকে যাস!’’
কাঁকড়ার দলের তো সমাজে অভাব নেই, এও তেমন! কিন্তু সেই দলের কথার বিষ ভয়ানক কাজ করেছিল। সিসিল হোটেলের বাড়িতে আসা ত্যাগ করেছিলেন পান্নালাল। বিজয়ায় কোনও ক্রমে প্রণাম সেরে চলে যেতেন। দাদার সঙ্গে কথা বলা বন্ধ। ফোন করে অন্যদের কাছে খবর নিতেন, এই যা! প্রায় দু’-তিন বছর এমন চলেছিল। তার পর অবশ্য ভুল ভাঙে তাঁর!
দাদা ধনঞ্জয়ের কিন্তু তখন আবার করে ভাইকে বুকে টেনে নিতে এতটুকু বাধেনি! তবে জীবনে এক বার হলেও ঈর্ষা করে ফেলেছিলেন ভাই পান্নাকে।

ধনঞ্জয় ভট্টাচার্য
বিখ্যাত সঙ্গীতজ্ঞ ‘কে মল্লিকের’ গাঁয়ে অনুষ্ঠান। প্রসঙ্গত বলি, এই ‘কে মল্লিক’ ছিলেন আদপে মুসলিম। তাঁর নাম ছিল মুন্সী মহম্মদ কাশেম। হিন্দু ভক্তিগীতির রেকর্ড করার সময়, পাকে পড়ে কাশেমের ‘কে’ এবং তাঁর দুই শুভানুধ্যায়ী, গোরাচাঁদ মল্লিক ও শান্তি মল্লিকের ‘মল্লিক’ পদবি নিয়ে তাঁর নাম রাখা হয় ‘কে মল্লিক’। ১৯০৯ থেকে ১৯৪৮, গায়ক ‘কে মল্লিক’ ছিলেন খ্যাতির তুঙ্গে।
ফিরি তাঁর গাঁয়ের গল্পে। তখন বলতে গেলে, সব জলসারই নেপথ্য-কর্তা ধনঞ্জয় ভট্টাচার্য। সে বারও তাই। নামকরা প্রায় সব শিল্পীই এক সঙ্গে হয়ে চলেছেন কুসুমগ্রামে। জেলা বর্ধমান। মহকুমা কালনা। থানা মন্তেশ্বর। মূল রাস্তা থেকে নরম পথ ধরে একটু খানি হেঁটে যেতে লাগে। একে একে সবাই বাস থেকে নেমে চলেছেন হাঁটা পথে। মধ্যে ধনঞ্জয়। তাঁকে ঘিরে জনতার উচ্ছ্বাস একটু বেশিই।
হঠাৎ এক বৃদ্ধর আবির্ভাব। ধবধবে সাদা তাঁর চুল। এক মুখ দাড়ি। উনিই ‘কে মল্লিক’। সকলে দেখল, ইতিউতি চাইছেন তিনি। ভিড়ের মধ্যে কাকে যেন খুঁজে বেড়াচ্ছেন। সবাই ধনঞ্জয়কে দেখিয়ে বললেন, ‘‘এই তো ধনঞ্জয় ভট্টাচার্য! এই তো! দেখুন!’’
তাতে ভ্রূক্ষেপ নেই বৃদ্ধর। তন্ন তন্ন করে খুঁজে চলেছেন শুধু। আর কেবল বি বিড় করে বলছেন, ‘‘সে আসেনি? সে আসেনি?’’ হঠাৎ পান্নালালের নাম করতে কে বেশ দেখিয়ে দিলেন, ‘‘এই তো পান্নালাল!’’
এ বার বৃদ্ধকে পায় কে! দু’হাত ছড়িয়ে এগিয়ে গেলেন পান্নালালের দিকে। দাদা ধনঞ্জয় চেয়ে চেয়ে দেখলেন, তাঁর চোখের সামনে, তাঁকে নয়, তাঁর ভাইকে জাপটে ধরে প্রবাদপ্রতিম ‘কে মল্লিক’ অঝোরে কেঁদে চলেছেন আর বারে বারে বলছেন, ‘‘তুই এমন করে কী করে গাস, বল তো! কী করে গাস!’’
পরে জানা গিয়েছিল, ‘কে মল্লিকের’ এই আবেগতাড়িত হওয়ার আসল কারণটি। এর ঠিক আগে পান্নালালের ‘সাধ না মিটিল’ রেকর্ড বেরিয়েছে। সেই গান শুনে মথিত হয়েছিলেন বৃদ্ধ গানওয়ালা!
দীপাদার কাছে তাঁর পিতা ধনঞ্জয় বলেছিলেন, ‘‘সঙ্গীত জগতে আমি তখন উল্কা। আমাকে একটু ছোঁয়ার জন্য লোকে পাগল হয়। সেই আমাকে উনি ফুৎকারে উড়িয়ে দিয়ে আমারই সামনে পানুকে নিয়ে যা করলেন, আমার সত্যিই হিংসে হয়েছিল!’’
বাকি সারাটা জীবন কিন্তু ধনঞ্জয় ভট্টাচার্য গর্বিত ছিলেন, পান্নালালের দাদা হতে পেরেছিলেন বলে!
(ছবি: পারিবারিক অ্যালবাম থেকে)