১৯৪৬ সালের ৯ ডিসেম্বর। ভেনেতোর লুসিয়ানা গ্রামে জন্ম সোনিয়া মাইনোর। বাবা স্তেফানো মাইনো ও মা পাওলা প্রেদেবনের তিন কন্যার মধ্যে তিনি ছিলেন মেজো।
.jpeg.webp)
সনিয়া গান্ধী।
শেষ আপডেট: 6 January 2026 14:40
দ্য ওয়াল ব্যুরো: ইতালির উত্তর-পূর্বের একটি সমৃদ্ধশালী, ঐতিহাসিক অঞ্চল ভেনেতো। একসময় এই এলাকায় খুবই প্রসিদ্ধ একটি প্রবাদ ছিল- “La piasa, la tasa e la sia dona de casa” অর্থাৎ, স্বামীকে খুশি রাখো, সংসারে চুপ করে থাকো আর ভালো গৃহিণী হও। আজ ভেনেতো ইউরোপের অন্যতম শিল্পসমৃদ্ধ অঞ্চল। কিন্তু দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী সময়ে এটি ছিল দরিদ্র কৃষিপ্রধান এক জনপদ। যে অঞ্চল থেকে উঠে এসেছিলেন সনিয়া মাইনো। যিনি অনেক পরে বিশেষ করে ভারতে পরিচিত হয়েছিলেন নেহরু-গান্ধী পরিবারের বড় বউ সনিয়া গান্ধী নামে। গত ৯ ডিসেম্বর, রাহুল ও প্রিয়ঙ্কা গান্ধীর মা সনিয়া ৭৯ বছরে পা দিলেন।
ভেনেতোর মেয়ে, যুদ্ধফেরত বাবার স্মৃতি
১৯৪৬ সালের ৯ ডিসেম্বর। ভেনেতোর লুসিয়ানা গ্রামে জন্ম সোনিয়া মাইনোর। বাবা স্তেফানো মাইনো ও মা পাওলা প্রেদেবনের তিন কন্যার মধ্যে তিনি ছিলেন মেজো। অনুশকা ও নাদিয়ার মাঝের বোন। স্তেফানোর প্রথম দুই কন্যার নাম রাখা হয়েছিল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে তাঁর রাশিয়া অভিযানের স্মৃতিবাহী। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সবচেয়ে রক্তক্ষয়ী অধ্যায়গুলোর একটিতে নাৎসিদের মিত্র হিসেবে ইতালির সেনাবাহিনীর ফৌজে ছিলেন তিনি। সেখানে রাশিয়ার হাতে বন্দিও হন স্তেফানো। তাঁকে রাখা হয় একটি গির্জায়। সেখানে তিনটি মেয়ে তাঁকে পালিয়ে যেতে সাহায্য করে। তাতেই বেঁচে ফেরেন স্তেফানো। যুদ্ধ শেষে বাড়ি ফিরে স্তেফানো স্ত্রীকে জড়িয়ে ধরে বলেছিলেন— এই মেয়েরা সেই নক্ষত্রযোগে এসেছে, যে তাঁকে জীবিত ফিরিয়ে এনেছে।
ভেনেতো তখনও গরিব। তবে মানুষ পরিশ্রম জানে। কাজের সন্ধানে মাইনো পরিবার পাড়ি দেয় তুরিনের উপকণ্ঠে। ১৯৫০-এর দশক, ইতালির অর্থনৈতিক জোয়ার শুরু হয়েছে। ফিয়াট গাড়ি, শহরের চারপাশে নতুন বাড়ি। নির্মাণকাজ জানতেন স্তেফানো। কয়েক বছরের মধ্যেই তিনি নিজের বাড়ি তৈরি করেন—ওরবাসানো শহরে, কৃষক আর শ্রমিকদের এলাকায়।
কনভেন্ট স্কুলে বেড়ে ওঠা
সনিয়ার শৈশব কেটেছে এখানেই। প্রথমে নার্সারি, পরে সেলেসিয়ান সন্ন্যাসিনীদের পরিচালিত স্কুলে পড়াশোনা— যা ছিল ৩০ কিলোমিটার দূরে। তখন সর্বত্র সরকারি স্কুল ছিল না। অধিকাংশ পরিবার নিরাপত্তা ও কঠোর শাসনের জন্য ক্যাথলিক স্কুলই বেছে নিত। মাইনো পরিবারও ব্যতিক্রম নয়। জন্মসূত্রে ইতালির প্রায় ৯০ শতাংশ মানুষ ক্যাথলিক। ছোট শহরে আজও প্রবীণরা প্রতিদিন সকালে মেসে যান। এই খ্রিস্টান ব্যবস্থা ছিল কঠোর— বিশেষ করে নারীদের জন্য। লাতিন ভাষায় প্রার্থনা, যার অর্থ অধিকাংশ মানুষই বুঝতেন না।
স্কুলের প্রধান সিস্টার মারিয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, সনিয়া ছিল পরিশ্রমী, তবে যতটা দরকার ততটাই পড়ত। ১৩ বছর বয়সে দশম উত্তীর্ণ হলে রিপোর্ট কার্ডে লেখা হয়— সনিয়া বুদ্ধিমতী, অধ্যবসায়ী, শিক্ষকতা ভালো করবে। অর্থাৎ, ভবিষ্যতের আদর্শ শিক্ষিকা।
সনিয়ার স্বপ্ন ছিল অন্য
সনিয়া ছিলেন দারুণ নৃত্যশিল্পী। ১৯৬০-এর দশকের জনপ্রিয় ‘টুইস্ট’ নাচে একাধিক প্রতিযোগিতায় জয় পান। ১৭ বছর বয়সে তিনি বাবা-মাকে রাজি করান বিদেশে গিয়ে ইংরেজি শেখার জন্য। লক্ষ্য— জাতীয় বিমানসংস্থা আলিতালিয়ার এয়ার হস্টেস হওয়া। জেদী আর দৃঢ়চেতা সনিয়া শেষ পর্যন্ত সম্মতি আদায় করেন। গন্তব্য— কেমব্রিজ।
ট্রিনিটি কলেজে ভর্তি হতে না পারলেও তিনি অ’পেয়ার হিসেবে কাজ শুরু করেন এবং অবসর সময়ে ইংরেজি শেখেন। সেখানেই, এক সস্তা গ্রিক রেস্তরাঁয় তাঁর দেখা হয় রাজীব গান্ধীর সঙ্গে। ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর বড় ছেলে এবং সেদেশের প্রথম প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরুর নাতি।
এক টেবিলে বসা চার তরুণ-তরুণীর সেই ছবি— কেমব্রিজের এক পাবের সামনে আজও ইতিহাসের দলিল হিসেবে রয়েছে। সেই ছবি সনিয়া নিজের মানিব্যাগে রেখে দিয়েছিলেন টানা ২০ বছর। এটাই ছিল প্রথম দর্শনের প্রেম।
‘আমি এক ভারতীয় রাজপুত্রকে পেয়েছি’
দু’মাসের রোমান্টিক কেমব্রিজ অধ্যায় শেষ হয়। সনিয়াকে ফিরতে হয় ইতালিতে। তবে যাওয়ার আগেই তিনি ফোন করেন বাড়িতে। বলেন, মা, বাবা, আমি এক ভারতীয় রাজপুত্রের সঙ্গে দেখা করেছি…। ১৯৬৬ সালের নভেম্বর। রাজীব হাজির হন ওরবাসানোতে— একটি জাগুয়ার গাড়িতে। গোটা শহর তোলপাড়। অবশেষে এক সন্ধ্যায় বসার ঘরে দাঁড়িয়ে স্তেফানোর উদ্দেশে রাজীব বলেন, আমি ইতালি দেখতে আসিনি। আমি আপনার মেয়েকে বিয়ে করতে চাই। সঙ্গে সঙ্গে নীরবতা নামে ঘরে।
দিল্লির পথে এক ইতালিয়ান কন্যা
১৯৬৭ সালের শেষে আমন্ত্রণ আসে দিল্লি থেকে। সনিয়া আসেন ভারতে। ফিরে যাওয়ার কথা ছিল কয়েক সপ্তাহে। কিন্তু ইতিহাস অন্য পথে বাঁক নেয়। ইন্দিরা গান্ধী তাঁকে কন্যার মতো গ্রহণ করেন। সনিয়া শাড়ি পরেন সহজাত ভঙ্গিতে, শিখতে শুরু করেন হিন্দি— স্বামীর চেয়েও ভালোভাবে। লম্বা ও সোজা চুল রাখা শুরু করে দেন। ফেব্রুয়ারি ২৫, ১৯৬৮—ইন্দিরার বাসভবনের বাগানে ভারতীয় রীতিতে বিয়ে। ক্যাথলিক পুরোহিত নেই। বাবার বদলে কন্যাদান করেন কাকা মারিও।
রূপান্তরের শুরু
এরপর শুরু হয় এক নিঃশব্দ রূপান্তর। সনিয়া ধীরে ধীরে ত্যাগ করেন মাতৃভাষা, প্রেয়ার, খাবার, পরিচয়। ইন্দিরা লিখেছিলেন পাওলাকে, আপনি আমাকে একটি মিষ্টি মেয়ে দিয়েছেন। রাজনীতির কথা তখনও ভাবেননি সনিয়া। মা হন দুই সন্তানের। কিন্তু ভাগ্য অপেক্ষা করছিল। রাজীব গান্ধী হত্যার পর ইতালিতে ফিরে যাওয়ার অনুরোধে তিনি বলেছিলেন— আমার নিয়তি এখানেই। আমাকে ফিরতে বলো না। ওরবাসানোর সেই ছোট বাড়িতে, ঝুলন্ত ঘণ্টা আর আলোকসজ্জিত স্প্রুস গাছের নীচে দাঁড়িয়ে, মাইনো পরিবার সেই সিদ্ধান্ত মেনে নেয়। নীরবে। গর্ব নিয়ে। তাদের বাগানের এই প্রিয় ‘ফুল’-কে আঁকড়ে ধরে।