
সুনীতা কৃষ্ণণ
শেষ আপডেট: 8 March 2025 14:29
মেয়েটি তখন আট বছরের কিশোরী। তখন থেকেই তার মন কাঁদতে শুরু করেছিল সমাজের প্রান্তিক শিশুদের জন্য। নাচ শিখতে শিখতে, সেই বয়েসেই নাচ শেখাতে শুরু করেছিল মানসিক প্রতিবন্ধী শিশুদের। মেয়েটির বয়েস যখন মাত্র বারো, বাড়ির কাছে থাকা এক বস্তির হতদরিদ্র পরিবারগুলির শিশুদের জন্য আস্ত একটা স্কুলই করে ফেলেছিল, বস্তিরই এক বাড়িতে। দলিত পরিবারে শিক্ষার আলো পৌঁছে দেওয়ার জন্য, 'নিও-লিটারেসি ক্যাম্পেন' শুরু করেছিল পনেরো বছর বয়েসে সুনীতা। ডাকাবুকো কিশোরী সুনীতা কৃষ্ণণ (Padma Shri Sunitha Krishnan)।
পুরুষের সমাজে বড় বেশি মাথা তুলে দাঁড়াচ্ছে একরত্তি এক মেয়ে! অতএব এমন শিক্ষা দাও, যাতে সারা জীবন মেয়েটা ঘরে মুখ লুকিয়ে থাকে। তাই আটজন পুরুষ মিলে একদিন ধর্ষণ করেছিল স্বাধীনচেতা মেয়েটিকে। জখম করেছিল ভয়ঙ্করভাবে মারধর করে। সেই আঘাতে সুনীতা কৃষ্ণণ আজ প্রায় বধির। কিন্তু সেই ঘটনাই সুনীতার জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছিল।
চোখ থেকে সেদিন ঝরেনি এক ফোঁটা জলও, বরং শক্ত হয়ে গিয়েছিল সুনীতার চোয়াল। সমাজের লেপে দেওয়া কলঙ্কের মুখে চুনকালি মাখিয়ে সুনীতা কৃষ্ণণ একা রাস্তায় নেমেছিলেন আবার। তাঁর সাহস আর জেদের উচ্চতার সামনে এবার মুখ লুকিয়ে ফেলেছিল পুরুষ শাসিত সমাজ। ব্যাঙ্গালোরের সেন্ট যোসেফ কলেজ থেকে পরিবেশ বিজ্ঞানে স্নাতক ও ম্যাঙ্গালোর থেকে এমএসডব্লিউ (medical & psychiatric) করে একাই ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন, সমাজের বিভিন্ন স্তরে নারীদের ওপর যৌন শোষণ ও নারীপাচার রুখতে।
১৯৯৬ সালে ব্যাঙ্গালোরে মিস ওয়ার্ল্ড কম্পিটিশন হয়েছিল। বাধা দিয়েছিলেন সুনীতা (Padma Shri Sunitha Krishnan)। আন্দোলন শুরু করেছিলেন, তাঁর পাশে এসে দাঁড়ানো সাথীদের নিয়ে। নারীদেহকে পণ্য হতে দেবেন না তিনি। কিন্তু প্রশাসনের চোখে সেটা ছিল অপরাধ। সেই অপরাধে সুনীতাকে জেলে যেতে হয়েছিল। দু’মাসের জেল খেটে বেরিয়ে দেখেছিলেন সুনীতা, নিজের বাড়ির দরজা তাঁর জন্য বন্ধ হয়ে গেছে। সুনীতার বাবা মা সুনীতার এই বিদ্রোহী জীবনযাত্রা পছন্দ করছিলেন না, তাঁদের নাকি সামাজিক মর্যাদাহানি হচ্ছিল সুনীতার জন্য। সমাজ শোষিত নিপীড়িত মেয়েগুলির মতোই সুনীতার জীবন থেকে হারিয়ে গিয়েছিল তাঁর পরিবার।
সুনীতা একা চলে গিয়েছিলেন হায়দ্রাবাদ। সেই সময় হায়দ্রাবাদের 'মেহবুব কি মেহেন্দি' নামের এক কুখ্যাত নিষিদ্ধপল্লী থেকে যৌনকর্মীদের উচ্ছেদ করা শুরু হয়েছিল। খুপরি ঘর থেকে খোলা আকাশের নীচে এসে দাঁড়ানো অসহায় নারীগুলি তখন তাঁদের শিশুদের নিয়ে জীবন সমুদ্রে হাবুডুবু খাচ্ছিলেন। পিতৃপরিচয়হীন শিশুগুলির পেট ভরারনোর জন্য দেহবিক্রি ছাড়া, অন্য কোনও পেশা তাঁদের জানা ছিল না। ফলে ভাগ্যের হাতে আগেই খুন হওয়া নারীগুলি শিশুগুলিকে নিয়ে প্রায় অনাহারে ছিলেন।(Inspiring journey)

কিন্তু, সব দুঃখের কাহিনীর শেষটা বুঝি একইভাবে লেখা হয় না। কোথা থেকে এসে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন সুনীতা কৃষ্ণণ। অসহায় নারীগুলির পাশে দাঁড়িয়ে পড়েছিলেন তাঁর সীমিত শক্তি নিয়ে। প্লাস্টিক আর বাঁশ দিয়ে ঘেরা ঘরে শুরু করেছিলেন যৌনকর্মীদের শিশুগুলির জন্য স্কুল এবং পেশা হারানো যৌনকর্মীদের জন্য হাতের কাজ শেখানোর ব্যবস্থা। সেই প্রথম চোখের সামনে 'মানুষ" বলার যোগ্য কোনও মানুষকে দেখেছিলেন যৌনকর্মীরা।
সমাজের নগ্ন চেহারাটা সামনে আনার জন্য, শুরু করেছিলেন অনলাইন ব্লগ, "Sunitha Krishnan: Anti-Trafficking Crusader"। সুনীতার ব্লগের পাতায় পাতায় উঠে এসেছিল জীবন থেকে হারিয়ে যাওয়া কত শত মেয়ের মর্মান্তিক উপাখ্যান। সুনীতা লিখেছিলেন (Online Blog) চার বছরের একটি মেয়ের কথা। যাকে নিয়মিত ধর্ষণ করত তারই বাবা, কাকা, দাদা, খুড়তুতো ভাই ও প্রতিবেশীরা। ডিজিটাল ইন্ডিয়ার পাখনা মেলে যখন আমাদের ভারত পৃথিবীর বুকে নিজে অর্থনৈতিক দৈত্য ভাবতে চলেছে, সেই সময়ে সুনীতার ব্লগের প্রতিটি পাতা আমাদের নগ্ন করে দিতে শুরু করেছিল।

ব্লগটির মাধ্যমে সুনীতা সমাজকে (Social Worker) জানিয়ে দিয়েছিলেন, কীভাবে নারীপাচারের (Woman Trafficking) নিত্যনতুন পদ্ধতি বার করছে পাচারকারীরা। কীভাবে ক্রীতদাসের চেয়েও খারাপ অবস্থায় রাখা হয় ফুঁসলে আনা মেয়েদের, কীভাবে তাদের সঙ্গে চলে নিয়মিত যৌনশোষণ ও শারীরিক ও মানসিক অত্যাচার, যতক্ষণ না মেয়েটি স্বেচ্ছায় গ্রাহকদের দেহ দিতে বাধ্য হয়। কীভাবে দিনের পর দিন অত্যাচার সয়ে সয়ে শারীরিক ও মানসিক দিক থেকে চুড়ান্তভাবে ক্ষতিগ্রস্থ হয় নিপীড়িতা মেয়েগুলি (Woman Trafficking)। কীভাবে বেশিরভাগ মেয়ের জীবন শেষ হয় এইডস দিয়ে। কীভাবে রাস্তার কুকুরের মৃত্যু জোটে তাদের, কোনও কানাগলির এঁদো নর্দমার পাশে শুয়ে।
তাঁর নিজের বলতে যা কিছু ছিল, সব বিক্রি করে সুনীতা তৈরি করেছিলেন তাঁর স্বপ্নের সংস্থা 'প্রজ্জ্বলা'। প্রজ্জ্বলা'র মাধ্যমে শুরু করেছিলেন পাচারকারীদের হাত থেকে নারী ও শিশুদের উদ্ধার করা। উদ্ধার করা মেয়েদের আশ্রয় ও পুনর্বাসনের ব্যবস্থাও শুরু করেছিলেন। হাতের কাজ শিখিয়ে তাদের সমাজের মূলস্রোতে ফিরিয়ে দেওয়া পর্যন্ত নিপিড়িত মহিলাদের পাশেই রইলেন সুনীতা। সব হারিয়ে ফেলা কিশোরী ও যুবতীদের জন্য সুনীতা তৈরি করে ফেললেন আবাসন থেকে শুরু করে কারখানা। আজও যেখানে কাঠের কাজ, ঝালাইয়ের কাজ, ছাপাখানার কাজ সহ আরও গোটা কুড়ি তথাকথিত পুরুষালি ট্রেডে ট্রেনিং দেওয়া হয় অসহায় নারীগুলিকে।
পাচার হওয়া, সমাজ থেকে তাড়িয়ে দেওয়া শত শত নারীর পায়ের নীচে থাকা নরম মাটিকে আজও শক্ত করে দেন সুনীতা। করে দেন চাকরির ব্যবস্থাও। দেন আইনি সহায়তা। এমনকি এই সব অসহায় মেয়েদের বিয়ের ব্যবস্থাও করে সুনীতার ‘প্রজ্জ্বলা’। এডস আক্রান্ত নারীদের চিকিৎসা ও আশ্রয়ের ব্যবস্থা করে সুনীতার 'প্রজ্জ্বলা'। এছাড়াও আর একটি কাজ করে 'প্রজ্জ্বলা'। এইডস বা শারীরিক নিগ্রহের কারণে মৃত্যুপথযাত্রী মেয়েগুলির শেষ ইচ্ছা পূরণ করে এই সংস্থা। এ জীবনে কিছুই না পাওয়া মেয়েগুলির জীবনের শেষ মুহূর্তেও পাশে থাকেন সুনীতা।(Social Worker)
আজ সুনীতার 'প্রজ্জ্বলা' পৃথিবীর সবচেয়ে বড় অ্যান্টি-ট্রাফিকিং শেল্টার। সংস্থাটিতে প্রায় ২০০ জন কর্মী আছেন। সবাই বেতন পান, একমাত্র সুনীতা কৃষ্ণণ ছাড়া। ছোট্টবেলার মতো এখনও তিনি পূর্ণ সময়ের স্বেচ্ছাসেবক (Volunteer) এবং সংস্থার অবৈতনিক কর্মী। 'প্রজ্জ্বলা' চালাতে চিত্র পরিচালক স্বামী রাজেশ টাচরিভারের অর্থও নেন না অনমনীয় সুনীতা। বই লিখে, বিভিন্ন সেমিনারে নারী পাচারের বিরুদ্ধে তাঁর বক্তব্য পেশ করে যেটুকু অর্থ মেলে, প্রায় সবটাই দান করে দেন তাঁর সংস্থায়। সুনীতার একটি স্লোগান সারা পৃথিবীকে কাঁপিয়ে দিয়েছিল। “Real Men Don’t Buy Sex” বা 'সত্যিকারের পুরুষরা যৌনতা কেনে না', এই স্লোগানটি সারা পৃথিবীতে আজ প্রায় প্রায় ২০০ কোটি মানুষের কাছে পৌঁছে গিয়েছে ।

বিভিন্ন বয়েসের প্রায় ১২০০০ নারীকে, পাচারকারীদের কবল থেকে এ পর্যন্ত উদ্ধার করেছেন সুনীতা কৃষ্ণণ। তাঁর চেষ্টায় কয়েক হাজার নারী পাচারকারীকে আজ জেলের ঘানি টানতে হচ্ছে। তবু আজও সমাজের বাধার সম্মুখীন হতে হয় তাঁকে। এখনও অবধি মোট ১৪ বার শারীরিক নিগ্রহের শিকার হয়েছেন সুনীতা। গাড়ি চাপা দিয়ে সুনীতাকে মেরে ফেলার চেষ্টা হয়েছে। তাঁর দিকে অ্যাসিডও ছোঁড়া হয়েছে। আজও ফোনে আসে খুনের হুমকি। মানুষপাচারের বিরুদ্ধে জেহাদ ঘোষণা করার পুরস্কার, সুনীতাকে এভাবেই ফিরিয়ে দিয়েছে সমাজ।
তবে সুনীতা জানেন, পথ তাঁর কঠিন। যে সমাজে ধর্ষণকারী বুক ফুলিয়ে বেড়ায়, আর ধর্ষিতা ঘরে মুখ লুকিয়ে থাকেন, অন্তত সেই সমাজে তাঁর জন্য কেউ লাল কার্পেট বিছিয়ে রাখবে না। কিন্ত, অন্যায় অনেকসময় আগ্নেয়গিরির উদ্গীরণের মতোই বের করে আনে ক্ষোভের লাভা। শুরু হয় রুদ্ধ্বশ্বাস প্রতিবাদ এবং প্রতিরোধ। কণ্ঠরোধ করতে এগিয়ে আসে কয়েকশো হাত। তবুও, সুনীতার শক্ত মেরুদন্ড আর নিষ্পলক ঠান্ডা চাউনি তাঁকে জিতিয়ে দেয় প্রতিটি যুদ্ধ।